Sunday, July 19, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

নিরাপদ মাতৃত্বে ‘বড় বাধা’ সিজারিয়ান পদ্ধতি

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সন্তান জন্মদানের ক্ষেত্রে সিজারিয়ান পদ্ধতি নিরাপদ মাতৃত্বের পথে প্রধান বাধা

আপডেট : ২৯ মে ২০২২, ১১:২৫ এএম

বাংলাদেশের হাসপাতালে এখন শতকরা ৫০%-এর বেশি শিশু অস্ত্রোপচার অর্থাৎ সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে জন্ম নিচ্ছে যা বেসরকারি হাসপাতালের ব্যবসার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। অনেক নারীর জন্য এমন পদ্ধতি ফ্যাশনেও পরিণত হয়েছে বলেও জানান সংশ্লিষ্টরা।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সন্তান জন্মদানের ক্ষেত্রে সিজারিয়ান পদ্ধতি নিরাপদ মাতৃত্বের পথে প্রধান বাধা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ হিসেবে বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোতে শতকরা ৫১% শিশু সিজারের মাধ্যমে জন্ম নিচ্ছে। এরমধ্যে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে সিজারের হার ৮৩%, সরকারি হাসপাতালে ৩৫% আর এনজিও পরিচালিত হাসপাতালে এ সংখ্যা ৩৯%।

স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, মাতৃত্বকালীন নানা জটিলতার কারণে সর্বোচ্চ ১০% থেকে ১৫% শিশুর জন্ম সিজারিয়ান পদ্ধতিতে হতে পারে। এই সংখ্যা এর বেশি হওয়া উচিত নয়।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গাইনী ও প্রসূতি বিভাগের চিকিৎসক ডা. আছমা খাতুন অরোরা বলেন, “বাস্তবে ১৫% থেকে ২০%-এর বেশি সিজারিয়ান পদ্ধতির দরকার নেই। কিন্তু এখন ঢাকার বাইরেও সিজারের প্রবণতা বাড়ছে।”

এর কারণ হিসেবে তিনি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর ব্যবসায়িক মনোবৃত্তিকে দায়ী করেন। “এটা করলে হাসপাতালগুলোর আয় বেশি হয়। এটাই আয়ের প্রধান খাতে পরিণত হচ্ছে।”

সেই সঙ্গে অনেক পরিবারের দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়টি উল্লেখ করেন এই চিকিৎসক। তিনি বলেন, “গর্ভবতী মা ও পরিবারের মধ্যে এক ধরনের মনোভাব তৈরি হয়েছে যে সিজারিয়ান পদ্ধতি নিরাপদ। কিন্তু অপ্রয়োজনে সিজার মায়ের মৃত্যুঝুঁকি এবং নানা ধরনের শারীরিক জটিলতার আশঙ্কা অনেক বাড়িয়ে দেয়।”

কীভাবে সিজারিয়ান পদ্ধতি শারীরিক জটিলতার আশঙ্কা বাড়ায় সে বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এই বিশেষজ্ঞ বলেন, “এটি শুধু একটি অপারেশন নয়। রোগীকে অজ্ঞান করতে হয়। ফলে তার ঝুঁকি বেড়ে যায়। একবার সিজার করলে পরবর্তীতেও সিজার করতে হয়। অনেক সময় জরায়ু কেটে ফেলে দিতে হয়। প্রস্রাবের থলিও ফেটে যায়। অনেক সময় এত রক্তপাত হয় যে মাকে আর রক্ষা করা যায় না।”

তিনি বলেন, “সিজার কমাতে হলে সবাইকে সচেতন করতে হবে। আর এই সচেতনতা রোগী ও চিকিৎসক সবার মাঝেই তৈরি হতে হবে।”

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজধানীতে ৯০% শিশুরই জন্ম হয় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে। কিছু কিছু ক্লিনিকের মূল ব্যবসাই এটি। তাদের আয়ের ৯৫% আসে সন্তান জন্মদানের জন্য অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে।

এদিকে সন্তান প্রসবের ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় সিজার রোধ করতে একটি নীতিমালা তৈরির নির্দেশনা দিয়েছিল হাইকোর্ট। কিন্তু বাস্তবে তার কোনো ফল দেখা যাচ্ছে না।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলাম বলেন, “সিজার বাড়ার পেছনে হাসপাতাল ও ক্লিনিকের ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি ছাড়াও এটা এখন অনেকের কাছে একটা ফ্যাশন হয়ে গেছে। তারা মনে করছে স্বাভাবিক প্রসবের চেয়ে সিজার মায়ের শরীর এবং অন্যান্য বিষয়ের জন্য ভালো। এই ভুল ধারণা দূর করতে হবে।”

তিনি বলেন, “নিরাপদ মাতৃত্ব শুধু সন্তান প্রসবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মায়ের গর্ভধারণ থেকে শুরু করে সন্তান প্রসব এবং প্রসব পরবর্তী স্বাস্থ্যসেবা- এই সবকিছুই এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। মায়ের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নিশ্চিতের ওপরই নির্ভর করে নবজাতকের স্বাস্থ্য এবং পুষ্টি।”

বাংলাদেশে এখনো শতকরা ৪৬.৪% প্রসব হয় বাড়িতে। এদের বড় একটি অংশ চিকিৎসকের পরামর্শ নেন না। এই প্রবণতা গ্রামে বেশি। আর এখনো শতকরা ২০% প্রসব হয় অদক্ষদের হাতে। এটা নিরাপদ মাতৃত্বকে বাধাগ্রস্ত করে।

ডা. কামরুল ইসলাম বলেন, “বিশেষ করে গ্রামে আর্থিক সংকট এবং স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র পর্যাপ্ত না থাকায় এটা হচ্ছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও অনেকে অসচেতনতার অভাবে এটাকে গুরুত্ব দেন না। আর প্রশিক্ষিত ধাত্রীরও সংকট আছে বাংলাদেশে।”

স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সন্তান প্রসবকে সবচেয়ে নিরাপদ বিবেচনা করা হয়। তাই এবারের নিরাপদ মাতৃত্ব দিবসের প্রতিপাদ্য “মা ও শিশুর জীবন বাঁচাতে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হবে যেতে”।

ডা. কামরুল ইসলাম মনে করেন, “স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রসবের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হলে সেবাকেন্দ্রের সংখ্যা বাড়াতে হবে। আর সেবাকেন্দ্রে মায়েরা যাতে যান তার জন্য ব্যাপক প্রচার চালাতে হবে।”

বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যুর হার এখন শতকরা ১.৬৩%। গ্রামে এই হার বেশি, শতকরা ১.৭৮%। আর শিশুমৃত্যু প্রতি হাজারে ১৫টি।

ডা. কামরুল ইসলাম বলেন, “পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে কিন্তু আরও উন্নতি করতে হলে মানসিকতা ও স্বাস্থ্যসুবিধা আরও সহজলভ্য করতে হবে। কিছু প্রচলিত ভুল ধারণা দূর করতে হবে। আর মায়ের খাদ্য, পুষ্টি, নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা এগুলোর ওপর জোর দিতে হবে।”

আর ডা. আছমা খাতুন আরও বলেন, “অপ্রয়োজনীয় সিজার কমাতে সরকারি হাসপাতালগুলোতে আমরা প্রচার চালাচ্ছি। সচেতনতাও কিছুটা বাড়ছে। কিন্তু এরপরও রোগী ও তার পরিবারের সিদ্ধান্তের বাইরে আমাদের যাওয়ার তো সুযোগ নেই। আমরা বুঝাতে পারি কিন্তু বাধ্য করতে পারি না।”

   

About

Popular Links

x