আদিবাসীদের ভাষা-সংস্কৃতি ও তাদের নিয়ে গড়ে ওঠা সামাজিক ধারণা এবং এসব ক্ষেত্রে কী ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছেন সেই গল্প শুনিয়েছেন লেখক ইয়াং ইয়াং ম্রো, উদ্যোক্তা প্রিয়াঙ্কা চাকমা, পরিচালক অং রাখাইন।
ঢাকা লিট ফেস্টের তৃতীয় দিনে শনিবার (৭ জানুয়ারি) দুপুরের সেশনে বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউজ প্রাঙ্গণে “কালচার কিপারস” সেশনে এলিজাবেথ ডি কস্টার সঞ্চালনায় এসব গল্প শোনান তারা।
সেশনের শুরুতে ইয়াং ইয়াং ম্রো তার ছাত্রজীবনের স্মৃতিচারণ করে বলেন, “স্কুলে যখন আসলাম শিক্ষকরা সবাই বাঙালি। আমরা তো বাংলা বুঝি না, শিক্ষকরা ম্রো বোঝেন না। একদিন এক শিক্ষক ক্লাসে কথা না বলার জন্য বললেন, আমরা নমস্কার বললাম। উনি বললেন, চুপ। আমরা বললাম নমস্কার। ম্রো ভাষায় বাংলার এই একটা শব্দই আছে, চুপ মানে ম্রোতে নমস্কার। আমি বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ ম্রোতে অনুবাদ করি। ম্রোরা বাংলা পড়তে জানে না। এখন অনেকেই এই ভাষণ সম্পর্কে জানে।”
তিনি তার কাজ নিয়ে বলেন, “লেখাপড়া শেষ করার পর ভাবলাম আমাকে কাজ করতে হবে সমাজ-সংস্কৃতির জন্য। তখন ম্রোদের ৪০০ রূপকথার গল্প সংগ্রহ করি। ম্রো ভাষার ডিকশনারি তৈরি করি। কাগজে জেল-পেনে লিখে, সেটা ফটোকপি করে ডিকশনারি গ্রামে গ্রামে বিক্রি করা শুরু করি। আমি ২৯টি বই লিখেছি, যার ১৯টি ম্রো ভাষায়, ১০ টি বাংলায়। প্রকাশকরা আমাদের বই ছাপাতে চান না, বলেন ওরা আদিবাসী ওদের বই কে পড়বে, ওদের লেখার মান নেই।”
আদিবাসী খাবারের দোকান হেবং-র শুরুর গল্প নিয়ে প্রিয়াঙ্কা চাকমা বলেন, “আমাদের খাবার নিয়ে যে ধরনের নেরেটিভ আছে জনসাধারণের মধ্যে তা ইতিবাচক না। আদিবাসীরা ব্যাঙ খায়, সাপ খায় এভাবে ধারণা করে। সেখানে ভিন্ন ধারণা দাঁড় করানো সহজ না। একদম ব্যতিক্রমী যে খাবার হয়তো ঢাকার অধিকাংশ মানুষই টেস্ট করার সুযোগ পায়নি। যখন ঢাকাতে একটা ফুড কালচার গড়ে উঠছে থাই কোরিয়ান ফুডের, সেখানে নিজের দেশের আবহে ওই খাবার খাচ্ছেন। আদিবাসীদের খাবারকে অন্য একটা টার্মে ফেলছি। তখন মনে হলো—আমি খাবারের মাধ্যমে শুরু করি ধারণাটা চেঞ্জ করার।”
নারীর প্রতিবন্ধকতা নিয়ে তিনি বলেন, “নারী হিসেবে কালচারটা রিপ্রেজেন্ট করার প্রবণতা সব গোষ্ঠীর আছে। আমি আজ এখানে থানি পরে এসেছি, যদি না পরে আসতাম প্রশ্ন করা হতো একজন চাকমা নারী হিসেবে কেন আমি থানি পরে আসিনি, কোনো পুরুষকে এই প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হতো না। এই ধারণার পরিবর্তন দরকার।”
অং রাখাইন তার সিনেমা সম্পর্কে বলেন, “আমি চেষ্টা করি, ভালো বা খারাপ কিছুর থেকে গুরুত্বপূর্ণ একটা সিনেমা বানানোর। ভালো-খারাপ দর্শক বিবেচনা করবেন। আমার আশেপাশের সমাজের ঘটনা, চরিত্র রিফ্লেকশনে আনার জন্য। প্রথম সিনেমা বানাতে আমার ১৩ বছর লেগেছে, যদিও সেটা আলোর মুখ দেখেনি। ম্রোদের ওপরে একটা সিনেমা বানাচ্ছি, ওদের ভাষা-সংস্কৃতি বুঝতেই আমার ১০ বছর লাগছে। আমার দম থাকবে, আমি সেলফ সেন্সরে বিশ্বাস করি না। সেলফ সেন্সর দিয়ে কাজ করলে আমাকে খুঁজে পাবেন না, ফেইক কাজ হবে। চেষ্টা করি- না বলা গল্প বলার, স্ক্রিনে আনার। যতই বাঁধা আসুক।”
তিনি আরও যুক্ত করেন, “প্রথমেই বলা হয়, ওরাতো মাইনরিটি, কোথা থেকে উঠে এসেছে, ওকে পাশের সিটে রাখি। যতদিন আমাদের এইভাবে দেখা হবে, ততদিনে আমরা আরও আরও ওপরে উঠে যাবো। প্রতিটা শিল্পে সমাজবাস্তবতার মধ্যে দিয়ে কাজ করা উচিত। সত্যটা সঠিকভাবেই দেখানো উচিত।”



