Saturday, May 18, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

এবার কাঁঠাল থেকে তৈরি হবে দই-আইসক্রিম-চকলেট-চিজ

এর আগে কাঁঠাল দিয়ে চিপস, আচার, কাটলেট, জ্যাম, জেলিসহ প্রায় ২০টি পণ্যের উপকরণ ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে ব্যাপক সাফল্য এসেছিল

আপডেট : ০৫ ডিসেম্বর ২০২১, ১০:১৮ পিএম

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউটের (বারি) বিজ্ঞানীরা কাঁঠালের পাল্প দিয়ে দই, চকলেট, আইসক্রিম ও চিজ তৈরির প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন। কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় “পোস্টহারভেস্ট ম্যানেজমেন্ট প্রসেসিং অ্যান্ড মার্কেটিং অব জ্যাকফ্রুট” প্রকল্পের মাধ্যমে এ উদ্ভাবন করেন তারা। বিজ্ঞানীরা জানান, এই প্রযুক্তিতে উদ্ভাবিত খাবারগুলো হবে উন্নতমানের, সুস্বাদু ও অধিক পুষ্টিসমৃদ্ধ।

প্রকল্পের প্রধান গবেষক বারির পোস্টহারভেসট টেকনোলজি বিভাগের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. গোলাম ফেরদৌস। তাকে সহায়তা করেছেন চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্স ইউনিভার্সিটির ফুড সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের চার ছাত্র। 

সংশ্লিষ্টরা জানান, এর মাধ্যমে সারা বছর কাঁঠালের পাল্প থেকে খুব সহজেই যে কেউ দই, চকলেট, আইসক্রিম ও চিজ তৈরি করতে পারবে।

বারির পোস্টহারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগ জানায়, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণের অভাবে প্রতি বছর দেশে উৎপাদিত মোট কাঁঠালের ৪৩-৪৫% নষ্ট হয়। জাতীয় ফলের এ অপচয় রোধে কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশন হাতে নেয় উল্লিখিত গবেষণা প্রকল্প। এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা কাজ শুরু করেন কাঁঠালের বহুমুখী ব্যবহারের নানা উপকরণ ও প্রযুক্তি নিয়ে। যাতে উদ্যোক্তারা সারা বছরই বিভিন্ন পণ্য তৈরিতে কাঁঠাল ব্যবহার করতে পারেন। অপচয় রোধ, কৃষকদের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিতকরণ, উদ্যোক্তা তৈরি, বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাঁঠালের পণ্যের বড় ধরনের উৎপাদন কর্মের মাধ্যমে একে শিল্পের মর্যাদা দেওয়া, ব্যাপক কর্মক্ষেত্রের ব্যবস্থা, সর্বোপরি কাঁঠালের প্রক্রিয়াজাতকরণ পণ্য বিদেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখার লক্ষ্যে এই প্রকল্পের মাধ্যমে একের পর এক প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেন ড. মো. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরীর নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীরা। 

কাঁচা ও পাকা কাঁঠাল থেকে তাদের উদ্ভাবিত বেশ কিছু পণ্য দেশের বড় বড় সুপারশপে বিক্রি হচ্ছে বলে জানা যায়। ভোক্তা পর্যায়ে সেগুলো ব্যাপক সাড়া ফেলতেও সক্ষম হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীদের ধারণা, খুব স্বল্প মূলধন বিনিয়োগে উদ্যোক্তারা এসব পণ্য থেকে সহজেই বেশি লাভবান হতে পারবেন এবং সারা বছরই এসব পণ্যের উৎপাদন সম্ভব।

ড. ফেরদৌস বলেন, “কাঁঠাল দিয়ে বিভিন্ন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের পর এর পাল্প দিয়ে সারা বছর ব্যবহার করা যায় এমন কী পণ্য উৎপন্ন করা যায়, তা নিয়ে ভাবতে থাকি। প্রতি বছর পাকা কাঁঠালই বেশি নষ্ট হয়। কিন্তু সেগুলো থেকে পাল্প সংগ্রহ করে সারা বছর অতি সহজেই সংরক্ষণ করা যায়। এ চিন্তা থেকেই দই, আইসক্রিম, চকলেট এবং চিজ তৈরির পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয় এবং সাফল্যও আসে।”

তিনি আরও বলেন, “কাঁঠালের বহুমুখী ব্যবহারের প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ধারাবাহিকতায় এ বছর আমরা দই, পুষ্টিকর আইসক্রিম, চকলেট এবং চিজ তৈরির প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছি। এগুলো তৈরি করতে দুধের সঙ্গে শুধুমাত্র কাঁঠাল পাল্পের প্রয়োজন। এক্ষেত্রে যদি কোনো উদ্যোক্তা পাল্প সংরক্ষণ করেন, তবে সেগুলো দিয়ে সারা বছরই এসব পণ্য উৎপাদন করতে পারবেন। কাঁঠাল যেহেতু নানা পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ একটি ফল, কাজেই পাল্প দিয়ে তৈরি করা পণ্যও সাধারণ বাজারের পণ্য থেকে অধিক পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ ও স্বাস্থ্যসম্মত হবে। এখানে কোনো অতিরিক্ত বা কৃত্রিম রং অথবা ফ্লেভার ব্যবহার করা হয় না। পণ্যগুলো সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি এবং দেখতেও খুবই সুন্দর।”

এই বিজ্ঞানী জানান, দই তৈরিতে শতকরা ৩-৫%, আইসক্রিম তৈরিতে ৫-৮% এবং চিজ তৈরিতে ৫০-৬০% পাল্প ব্যবহার করা হয়। ফলে নিঃসন্দেহে ক্ষুধা নিবারণ ও পুষ্টির চাহিদা পূরণে এসব খাবার আদর্শ পণ্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এসব খাবার থেকে প্রচুর পরিমাণে ক্যালোরি পাওয়া যাবে।

ড. চৌধুরী আরও জানান, যে কেউ স্বল্প টাকা বিনিয়োগ করে এগুলো তৈরি করতে পারবেন। এসব তৈরিতে তেমন বড় ধরনের কোনো যন্ত্রপাতির দরকার নেই। একটি ডিপ ফ্রিজ, রেফ্রিজারেটর বা ছোটখাটো কিছু ঘরোয়া যন্ত্রপাতি দিয়ে খুব সহজেই এসব পণ্য তৈরি করা যাবে। যদি কোনো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ৮০০ টাকার কাঁচামাল ব্যবহার করেন, তাহলে তিনি খুব সহজেই ১৫০০ টাকার পণ্য তৈরি করতে পারবেন। অর্থাৎ বিনিয়োগের দ্বিগুণ লাভ করতে পারবেন। আর দেশের বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান যদি ব্যাপক পরিসরে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে এসব পণ্য তৈরি করে, তবে দেশে এসব পণ্যের ব্যাপক বাজার তৈরি হবে। পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি হবে।

তিনি আরও বলেন, “আমাদের এখানে চট্টগ্রামের ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্স ইউনিভার্সিটির ফুড সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের সমীক কর প্রান্ত, আবির হাসান রিজন, অভিক চাকমা ও আসম রাফসানজানি অ্যাকাডেমিক কোর্স শেষ করে ট্রেনিং করতে আসে। তাদের এ কাজে সম্পৃক্ত করি এবং সফলভাবে আমরা প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে সক্ষম হই। যেহেতু পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রচুর কাঁঠাল উৎপন্ন হয়, কাজেই তারা যদি এসব প্রযুক্তি ওই এলাকায় ছড়িয়ে দিতে পারেন, তাহলে সেখান থেকেও কাঁঠাল চাষি, উদ্যোক্তা বা স্থানীয় ব্যবসায়ীরা লাভবান হতে পারবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।”

এর আগে পোস্টহারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের বিজ্ঞানীরা কাঁঠাল দিয়ে চিপস, আচার, কাটলেট, জ্যাম, জেলিসহ প্রায় ২০টি পণ্যের উপকরণ ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছিলেন, যা তরুণ উদ্যোক্তাদের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ ও সাড়া জাগিয়েছিল। এসব পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করে অনেক উদ্যোক্তাই ইতোমধ্যে স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে শুরু করেছেন। শুধু ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাই নয়, বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানও এসব পণ্য উৎপাদন এবং বাজারজাতকরণ বা দেশের বাইরে রপ্তানি করতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে বলে জানা যায়।

বারির পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও বিভাগীয় প্রধান কৃষিবিদ  মো. হাফিজুল হক খান বলেন, “প্রতি বছর আমাদের দেশে বিপুল পরিমাণ কাঁঠাল নষ্ট হয়। অপচয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে কাঁঠালের বহুবিধ ব্যবহারের এসব প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ফলে আমরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারব। দই, আইসক্রিমসহ যেসব পণ্য উৎপন্ন করা হয়েছে তা পুষ্টিকর, স্বাস্থ্যসম্মত ও লাভজনক হবে। আমরা যদি এ সেক্টরে প্রশিক্ষিত লোকবল তৈরি করতে পারি, তাহলে এর ব্যাপক বাণিজ্যিক সম্ভাবনা তৈরি হবে যা কাঁঠালের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতেও বিরাট অবদান রাখবে এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পুষ্টি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা যায়।”

About

Popular Links