Wednesday, May 22, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

১৪ জন চিকিৎসকেই চলছে কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালের চিকিৎসা

২৫০ শয্যা বিশিষ্ট কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে মাত্র একজন চিকিৎসক দিয়ে চলছে জরুরি বিভাগ

আপডেট : ২৪ জানুয়ারি ২০১৯, ১১:১৬ এএম

কুড়িগ্রামে চিকিৎসকদের দায়িত্ব পালনে অনীহার কারণে জেলার স্বাস্থ্য সেবার চরম দুরাবস্থা বিরাজ করছে। জেলা সদরের ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালসহ ৯টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক সংকটে মানসম্পন্ন চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে জেলার বিশ লক্ষাধিক মানুষ। বার বার ঊর্ধ্বতন কর্তপক্ষকে অবহিত করার পরও চিকিৎসক সংকট সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন জেলার স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্বশীলরা।

চিকিৎসক আর জনবল সংকটে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে (সদর হাসপাতাল) স্বাস্থ্য সেবার চরম দুরাবস্থা বিরাজ করছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকবিহীন এ চিকিৎসা কেন্দ্রে মাত্র একজন চিকিৎসক দিয়ে চলছে জরুরি বিভাগ। আর বহির্বিভাগে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার করে রোগী চিকিৎসা সেবা নিতে আসলেও পর্যাপ্ত চিকিৎসকের অভাবে চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন স্বাস্থ্য সেবা গ্রহীতারা।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রতিনিয়ত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিকিৎসক সংকট নিয়ে লিখিত আবেদন জানালেও কার্যকর কোনও ফল পাওয়া যাচ্ছে না। এমতাবস্থায় জেলার ৯ উপজেলার মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের চিকিৎসাসেবার একমাত্র আশ্রয়স্থল এ হাসপাতালে রোগীরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে,  ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ৪২ জন চিকিৎসকের পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১৪ জন চিকিৎসক। এর মধ্যে মাত্র একজন চিকিৎসক জরুরি বিভাগের দায়িত্বে রয়েছেন। আর প্রতিদিন বহির্বিভাগে প্রায় সহস্রাধিক রোগী চিকিৎসা নিতে আসলেও সেখানে দায়িত্বরত রয়েছেন মাত্র ৮ জন চিকিৎসক। ফলে কাঙ্খিত চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা।

কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ভর্তি রোগী ছাড়াও বহির্বিভাগে রোগীদের উপচে পড়া ভিড়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রতিদিন গড়ে প্রায় দুই শতাধিক রোগী হাসপাতালটিতে ভর্তি থাকলেও চিকিৎসক সংকটে তারা মানসম্মত চিকিৎসা সেবা পাচ্ছেন না। আর জরুরি বিভাগে একজন মাত্র মেডিকেল অফিসার থাকায় বেশির ভাগ সময় উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার (সেকমো) দিয়ে জরুরি স্বাস্থ্য সেবা দেওয়া হচ্ছে। ফলে চিকিৎসা সেবার মান নিয়েও রোগীদের মাঝে সন্দেহের সৃষ্টি হচ্ছে।

এদিকে প্রায় এক বছর আগে হাসপাতালে একটি ডিজিটাল এক্স-রে মেশিন স্থাপন করা হলেও প্রিন্টার মেশিন সেটআপ দেওয়ার অভাবে এটি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির জনবল সংকটও রয়েছে হাসপাতালটিতে। ফলে হাসপাতালের দাপ্তরিক কাজসহ পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।

কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক (আরএমও) ডা. শাহীনুর রহমান সরদার চিকিসক সংকটের কথা স্বীকার করে বলেন, ‘চিকিৎসক সংকটে সদর হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা দিতে আমরা হিমশিম খাচ্ছি। বিশেষ করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও জরুরি বিভাগসহ আউটডোর সেবায় চিকিৎসক সংকট থাকায় চিকিৎসা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।’

এক্স-রে মেশিন বিকলের বিষয়ে আবাসিক এ চিকিৎসক বলেন, ‘এক বছর আগে হাসপাতালে একটিনতুন ডিজিটাল এক্স-রে মেশিন বসানো হলেও সেটি চালু না থাকায় এর সেবা থেকে রোগীরা বঞ্চিত হচ্ছেন। এ বিষয়ে একাধিকবার সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্তদের অবহিত করা হলেও কোনও ফল পাওয়া যায়নি।’

তিনি আরও জানান, ‘কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসকদের ৪২টি পদের বিপরীতে ২৮ টি পদই শূন্য রয়েছে। আর মেডিসিন বিভাগে কোনও চিকিৎসক না থাকায় নিয়মিত স্বাস্থ্য সেবা ব্যহত হচ্ছে।এতো স্বল্প সংখ্যক চিকিৎসক দিয়ে ২৫০ শয্যার একটি হাসপাতালে মানসম্পন্ন চিকিৎসা সেবা দেওয়া সম্ভব নয়। কর্তৃপক্ষ চিকিৎসক বরাদ্দ না দিলে আামাদের কিছুই করার নেই।’

কুড়িগ্রামে চিকিৎসকদের অবস্থানে অনীহার কথা জানিয়ে হাসপাতালটির তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. আনোয়ারুল হক প্রামাণিক জানান, ‘অনেক সময় কিছু চিকিৎসকের পোস্টিং দিলেও তারা অল্প সময়ের মধ্যে আবারও বদলি নিয়ে চলে যান। প্রত্যন্ত এলাকা এবং এ এলাকার বেশিরভাগ মানুষ দরিদ্র হওয়ায় এখানে চিকিৎসকরা থাকতে চান না। হয়তো তারা জীবনযাত্রার উচ্চাকাঙ্খার জন্য তারা কুড়িগ্রাম ত্যাগ করেন।’

এদিকে চিকিৎসক সংকটে জেলার ৯ উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতেও চিকিৎসা সেবায় চরম দুরাবস্থা বিরাজ করছে। ৯ উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে ১৫৯ টি পদের বিপরীতে মাত্র ৪২ জন চিকিৎসক কর্মরত রয়েছেন। প্রায় দুই তৃতীয়াংশ পদশূন্য থাকায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোয় ঠিকমতো সেবা পাচ্ছেন না রোগীরা।

স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্র জানায়, বিভিন্ন সময় চিকিৎসকদের পোস্টিং দেওয়া হলেও এ জেলায় চিকিৎসকরা থাকতে চান না। প্রাইভেট প্র্যাকটিসে রোজগারের স্বল্পতার কারণে বিভিন্ন ট্রেইনিং, উচ্চ শিক্ষা কিংবা অন্য কোনও অজুহাতে বেশিরভাগ চিকিৎসক জেলা ত্যাগ করে পছন্দের জায়গায় পোস্টিং নিয়ে চলে যান। ফলে কাঙ্খিত স্বাস্থ্য সেবা থেকে বঞ্চিত হয় সাধারণ মানুষ।

জেলায় চিকিৎসকদের অবস্থানে অনীহার বিষয়টি স্বীকার করে কুড়িগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘ জেলার জেনারেল হাসপাতাল ছাড়াও৯টি উপজেলায় প্রায় ৭১ শতাংশ চিকিৎসক পদ শূন্য। প্রয়োজনের তুলনায় কম চিকিৎসক দিয়ে কোনও রকমে চিকিৎসা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। আরও চিকিৎসক চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছি।’



About

Popular Links