ঘূর্ণিঝড় হামুনের তাণ্ডবের দুই দিন পার হয়ে গেলেও এখনও কক্সবাজারে মোবাইল ফেনের নেটওয়ার্ক ও বিদ্যুৎ বিপর্যয় কাটেনি। জেলার বেশিরভাগ এলাকায় দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট। এছাড়াও দুর্গত এলাকায় পর্যাপ্ত পরিমাণ ত্রাণ না পৌঁছানোয় দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ। বাড়িঘর বিধ্বস্ত হওয়ায় অনেকেই খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাচ্ছেন।
মঙ্গলবার (২৬ অক্টোবর) রাতে কক্সবাজারে তাণ্ডব চালায় ঘূর্ণিঝড় “হামুন”। মাত্র ৯০ মিনিটের ব্যবধানে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় কক্সবাজার শহর, মহেশখালী, কুতুবদিয়া ও চকরিয়াসহ আশপাশের এলাকা। অসংখ্য গাছপালা ও বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে পড়ে সড়কে। ফলে বিপর্যয়ের মুখে পড়ে বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক।
এদিকে, বিদ্যুৎ না থাকায় তীব্র বিশুদ্ধ পানির সংকটে পড়েছেন শহরের বাসিন্দারা। পর্যাপ্ত সহযোগিতা না পাওয়ায় খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছেন বাড়িঘর হারানো মানুষ।
কক্সবাজার শহরের কুতুবদিয়াপাড়া এলাকার পারভেজ আলম ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “ঘূর্ণিঝড় চলে যাওয়ার তিন দিন হলেও এখনও বিদ্যুৎ আসেনি। যার ফলে বাসা-বাড়িতে খাওয়ার জন্য পানি উত্তোলন বন্ধ রয়েছে। এতে করে আমরা সীমাহীন দুর্ভোগে আছি।”
এদিকে দুই দিন ধরে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঢেউটিন, চাল ও নগদ টাকা দুর্গতদের মাঝে বিতরণ করা হচ্ছে, তবে তা অপর্যাপ্ত বলছেন ভুক্তভোগীরা।
শহরের সমিতিপাড়া এলাকার শাহেনা আক্তার ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “ঘূর্ণিঝড়ের সময় আমার বাসার ওপর গাছ পড়েছে। ঘরটি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। কিন্তু কোনো ধরণের সহায়তা এখনও পাইনি। ঢেউটিন দেওয়ার কথা শুনেছি কিন্তু চোখে দেখেনি। এমনকি এক মুঠো চালও পাইনি।”
একই এলাকার ফাতেমা বেগম বলেন, “কোনো ধরনের মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই। ফলে দুর্ঘটনার সংবাদ, মৃত্যুর সংবাদ বা অন্য সব ধরনের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। এখন পর্যন্ত এলাকা অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্ন। যত্রতত্র ময়লা আবর্জনার স্তূপ পড়ে রয়েছে।”
কক্সবাজার শহরের ১ নম্বর ওয়ার্ডের পৌর কাউন্সিলর আক্তার কামাল বলেন, “ঘূর্ণিঝড়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আমার এলাকা। প্রায় সাড়ে তিন হাজার ঘর ভেঙে গেছে। খোলা আকাশের নিচে অনেকে। খুব দ্রুত সময়ে ত্রাণ পৌঁছানোর দরকার। যতটুক ত্রাণ পৌঁছেছে তা পর্যাপ্ত নয়।”
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মুহম্মদ শাহীন ইমরান ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “ঘূর্ণিঝড় হামুনের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কক্সবাজার জেলার ৭১টি ইউনিয়ন ও কক্সবাজার, মহেশখালীসহ দুটি পৌরসভা। হামুনের তাণ্ডবে পল্লী বিদ্যুতের ৩৫৪টি বৈদ্যুতিক খুঁটি ভেঙে গেছে। বিকল হয়েছে ২৩টি ট্রান্সফরমার। ৪৯৬ স্থানে বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে গেছে। ৮০০টি স্থানে গাছ পড়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ে জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ৪,৭৬,৫৪৯ জন।”
বৃহস্পতিবার ঘূর্ণিঝড়কবলিত এলাকা পরিদর্শনে আসেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. এনামুল হক। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “যেভাবে গাছ ও বৈদ্যুতিক খুঁটি রাস্তার ওপর উপড়ে পড়ে আছে, তা স্বাভাবিক হতে একটু সময় লাগবে। খুব দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আনতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে সরকার।”
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, “ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষ যাতে কষ্ট না পায়, সেজন্য দ্রুত ত্রাণ সহায়তা দিতে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। ইতোমধ্যে ত্রাণ মন্ত্রণালয় দুর্গত এলাকার মানুষের জন্য ত্রাণ সহায়তা দিচ্ছে। জরুরী ভিত্তিতে ২০ লাখ টাকা, ৫০ মেট্রিক টন চাল, পাঁচ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও বিধ্বস্ত বাড়িঘর পুনর্নির্মাণ করার ১,০০০ বান্ডিল ঢেউ টিন, ৩০ লাখ টাকা ও শিশুখাদ্যেও জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।”
উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার রাত ৭টার দিকে ঘূর্ণিঝড় “হামুন” আঘাত হানে কক্সবাজার। ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবে মৃত্যু হয় তিনজনের। ক্ষতিগ্রস্ত হয় অন্তত ৩৭ হাজার বাড়িঘর।



