আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হুঁশিয়ারি-বিধিনিষেধ, ফায়ার সার্ভিস, নেটিজেন এবং প্রাণী সংরক্ষণবাদীদের অনুরোধ ও প্রচারণা সত্ত্বেও নতুন বছরের প্রাক্কালে ফেটেছে আতশবাজি, উড়েছে ফানুস। শুধু ঢাকায় নয় দেশের অন্য সব বড় শহরগুলোতেও উচ্চস্বরে লাউডস্পিকারে গান-বাজানো ও শব্দদূষণ কমানো সম্ভব হয়নি।
উচ্চস্বরে লাউডস্পিকারে গান-বাজনা ও শব্দদূষণ সংক্রান্ত সারাদেশে ৯৭১টি কলের বিপরীতে সেবা দিয়েছে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯। যার মধ্যে শুধু ঢাকা মহানগর এলাকায় ২৩৭টি কলের বিপরীতে সেবা দেওয়া হয়েছে।
থার্টিফার্স্ট উপলক্ষে গান বাজাতে সাউন্ড বক্সে বিদ্যুৎ সংযোগ দিতে গিয়ে মিরাজ হোসেন (১৭) নামের এক কিশোরের মৃত্যু হয়েছে। রবিবার রাত ৯টার দিকে গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার চুয়ারিয়াখোলা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহাতাব উদ্দিন বলেন, “সাউন্ড বক্সে বিদ্যুতের সংযোগ দিতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয় মিরাজ হোসেন। তাকে উদ্ধার করে কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।”
কালীগঞ্জ থানার উপ-পরিদর্শক মো. কামাল হোসেন বলেন, “স্বজনদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিনা ময়নাতদন্তে লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে।”
অন্যদিকে ঢাকার কামরাঙ্গীচরে নতুন বছরকে বরণ করতে গিয়ে আগুনে দগ্ধ হয়েছে তিনজন। তাদের একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
দগ্ধরা হলো- মো. সিয়াম (১৪), রাকিব হোসেন (১৭) ও তার ভাই রায়হান (১৭)। এদের মধ্যে সিয়াম মুখে কেরোসিন নিয়ে আগুনের ফুলকি তুলতে গিয়ে অগ্নিদগ্ধ হয়। অন্যরা ফানুসের আগুনে ঝলসে গেছে।
সিয়ামকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়েছে।
ইনস্টিটিউটের আবাসিক চিকিৎসক তরিকুল ইসলাম ঢাকা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, সিয়ামের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তার শরীরের ৮৮% পুড়ে গেছে। অন্য দুজনের মধ্যে রাকিব ৬% আর রায়হানের শরীরের ২% পুড়েছে আগুনে।
এছাড়াও ৩১ ডিসেম্বর দিবাগত রাত ১২টা ৩৩ মিনিটের দিকে ঢাকার নাজিরাবাজার একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে আগুন লাগে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
এ বিষয়ে ফায়ার সার্ভিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (মিডিয়া) শাজাহান শিকদার বলেন, “পুরান ঢাকার নাজিরাবাজারে বিউটি লাচ্ছির পাশে এক দোকানে আগুন লাগে। রাত ১২টা ৪২ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।”

বন্ধ করার চেষ্টা
থার্টিফার্স্ট উদযাপন উপলক্ষে উন্মুক্ত স্থানে কোনো ধরনের অনুষ্ঠান, সমাবেশ, নাচ, গান ও কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করা যাবে না বলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। এছাড়াও কোথাও কোনো ধরনের আতশবাজি, পটকা ফোটানো ও ফানুস ওড়ানো বা কেনাবেচাতেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।
৩১ ডিসেম্বর ডিএমপি জানিয়েছিল, এসব বিধিনিষেধ না মেনে যদি কেউ ফানুস ওড়ায় বা আতশবাজি ফোটানো অবস্থায় হাতেনাতে ধরা পড়ে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ প্রসঙ্গে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ও গোয়েন্দা প্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ তখন বলেছিলেন, “মানুষ যদি আইনের তোয়াক্কা না করে... তাহলে তাদের বিরুদ্ধে অ্যাকশন নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। থার্টিফার্স্ট নাইটকে ঘিরে কেউ যদি ফানুস, আতশবাজি, পটকা বা গুলি ছোড়ে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞার পরও যদি কেউ ফানুস ওড়ায়, আতশবাজি ফোটায় বা অস্ত্র দিয়ে গুলি ছোড়ে তাদের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক আইনে মামলা দায়ের করা হবে।”
থার্টিফার্স্ট নাইটে রাজধানীর সার্বিক নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার স্বার্থে ফানুস না ওড়ানো এবং আতশবাজি না ফোটানোর আহ্বান জানিয়েছিল ফায়ার সার্ভিস। সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ফায়ার সার্ভিস নিজেদের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে একাধিক পোস্টার এবং ভিডিও পোস্ট করে।
২৯ ডিসেম্বর বিকেলে “আতশবাজি বন্ধ করুন-আতশবাজি হাজারও মৃত্যুর কারণ” শিরোনামে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এক মানববন্ধনের আয়োজন করে প্রাণী অধিকার কর্মীরা। মানববন্ধনে অংশ নেয় পিপল ফর অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন (পি' ফাউন্ডেশন), সেভ দ্য নেচার অব বাংলাদেশ, ওয়াইল্ড ওয়াচ, স্টেলা ফাউন্ডেশন, সেভ ফিউচার বাংলাদেশের নেতাকর্মী ও সচেতন নাগরিকরা।
তারা আতশবাজি পোড়ানো এবং আকাশ ফানুস ওড়ানো থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।

ফের ক্ষতিগ্রস্ত মেট্রোরেল
গত বছরের মত এবারও খ্রিষ্টীয় বর্ষবরণের ফানুসে আক্রান্ত হয়েছে মেট্রোরেল। পুরোপুরি বিদ্যুৎ-চালিত এই গণপরিবহনটি যেন কোনো ক্ষতির মুখে না পড়ে বা চলাচল বাধাগ্রস্ত না হয় সে জন্য “ফানুস” ওড়ানো নিয়ে সতর্ক করেছিল কর্তৃপক্ষ। তবে তাদের সেই সতর্কবার্তাতেও আটকানো গেল না ফানুস আক্রমণ।
ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার (অপারেশন) মোহাম্মদ ইফতেখার হোসেন বলেন, “গত বছর মেট্রোরেলে ফানুস আটকানোটা আমাদের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা ছিল। ওই সময় বৈদ্যুতিক তারে ফানুস আটকে যাওয়ায় মেট্রোরেল চলাচলও বিঘ্নিত হয়েছিল। তাই এ বছর আমরা আগে থেকেই প্রস্তুতি রেখেছিলাম। রাতেই কর্মীরা বিভিন্ন স্টেশন ও লাইন ঘুরে ঘুরে মেট্রোরেলের তারে আটকে থাকা ফানুস অপসারণ করেছে। আমার কাছে আসা তথ্য মতে প্রায় ৪০টি ফানুস অপসারণ করা হয়েছে। যা গত রাতে মেট্রোরেলের বিভিন্ন স্থানে আটকে ছিল।”
রাতের মধ্যেই সব ফানুস অপসারণ করায় সকালে মেট্রোরেল চলাচলে কোনো বিলম্ব বা বিঘ্ন ঘটেনি বলেও জানান মোহাম্মদ ইফতেখার হোসেন।
গত ২৮ ডিসেম্বর ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএএন সিদ্দিক ইংরেজি নববর্ষ উদযাপনের সময় মেট্রোরেলের এক কিলোমিটার এলাকার মধ্যে ফানুস ওড়ানো বা আতশবাজি না পোড়াতে নগরবাসীর প্রতি অনুরোধ জানিয়েছিলেন। এ বিষয়ে পুলিশের সহায়তা চেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠিও দিয়েছিল ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড।
গত বছর থার্টিফার্স্ট নাইট উদযাপন করতে গিয়ে ওড়ানো ফানুস বৈদ্যুতিক তারের ওপর পড়ায় দুই ঘণ্টা বন্ধ ছিল মেট্রোরেল চলাচল। তখনও বাজি-পটকা এবং ফানুসের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল ডিএমপি।
গত বছর নবাবপুর রোডের কাপ্তানবাজার, লালবাগ ও সদরঘাট হকার্স মার্কেটে ফানুস পড়ে আগুনের খবর পায় ফায়ার সার্ভিস। এর মধ্যে সদরঘাট হকার্স মার্কেটে ফানুস থেকে সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ডে বিদ্যুতের তার পুড়ে যায়। লালবাগেও অগ্নিকাণ্ড ঘটে বিদ্যুতের তারে ফানুস পড়ে। এছাড়া আদাবরেও বিদ্যুতের তারে ফানুস পড়ার খবর পাওয়া যায়। তার পুড়ে যাওয়ায় লালবাগ ও আদাবরের কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

আকুতি জানিয়ে ৯৯৯-এ কল
নববর্ষের প্রথম প্রহরে আতঙ্কিত মানুষেরর প্রচুর ফোনকল পেয়েছে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯। পটকার শব্দ থেকে রক্ষার আকুতি জানিয়ে সারাদেশে ৯৭১টি কলের বিপরীতে সেবা দিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশের এই জরুরি সেবা। এর মধ্যে শুধু ঢাকা মহানগর এলাকায় ২৩৭টি কলের বিপরীতে সেবা দিয়েছে সংস্থাটি।
পুলিশ পরিদর্শক (গণমাধ্যম ও জনসংযোগ কর্মকর্তা) আনোয়ার সাত্তার জানান, রবিবার রাত ১২টা পর্যন্ত ৯৯৯-এ শব্দদূষণ সংক্রান্ত ৫২৬টি ফোনকল আসে। যাদের মধ্যে শুধু ঢাকা মহানগর এলাকা থেকে সেবাপ্রত্যাশী ছিলেন ১০৭ জন। রাত ১২টা ১ মিনিট থেকে সোমবার দুপুর ১টা পর্যন্ত শব্দদূষণ সংক্রান্ত ৪৪৫টি কল এসেছে। এর মধ্যে শুধু ঢাকা মহানগর এলাকা থেকে সেবাপ্রত্যাশী ছিলেন ১৩০ জন।
ক্ষয়ক্ষতি জানমালের
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, ২০২২ সালে থার্টিফার্স্ট নাইটে আতশবাজি ফোটানো ও ফানুস ওড়ানোর কারণে প্রায় ১০০টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে আনুমানিক ১৯ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ক্ষতি হয়। ২০২১ সালে আতশবাজি ও ফানুস থেকে অগ্নিকাণ্ড ঘটে ১৬টি। ক্ষতি হয় প্রায় চার লাখ পাঁচ হাজার টাকা। আতশবাজির উচ্চশব্দে তানজিম উমায়ের ওরফে মাহমুদুল হাসান নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়।
এতে আরও জানানো হয়, আতশবাজি ও ফানুস থেকে ২০২০ সালে ৫০টি অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ১৪ লাখ ৩৫ হাজার টাকা, ২০১৯ সালে ৭২টি অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ১৪ লাখ ৪৭ হাজার টাকা এবং ২০১৮ সালে ৪২টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ৫৬ লাখ ৬ হাজার টাকার ক্ষতি হয়। এসব অগ্নিকাণ্ডে অংশগ্রহণ করে ফায়ার সার্ভিস ৩ কোটি ৬৯ লাখ ৯৫ হাজার টাকার সম্পদ উদ্ধার করে।



