Thursday, June 04, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

কীভাবে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা নিচ্ছে রোহিঙ্গারা

  • নির্বিঘ্নে এসব কর্মকাণ্ড চলছে প্রকাশ্যেই
  • ক্যাম্পের বাসিন্দারা মিয়ানমার-বাংলাদেশ দুই দেশের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে
  • অবৈধ সিমকার্ডের কারণে তারা পেয়ে যায় ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট
  • কর্তৃপক্ষ জানে না কিছুই
আপডেট : ১০ মার্চ ২০২৪, ০৫:৪১ পিএম

কক্সবাজারে আশ্রিত রোহিঙ্গারা নির্বিঘ্নে মোবাইল ফোন ব্যবহার করছে। দোকানে গিয়ে সহজেই তারা কিনতে পারে সিম কার্ড। তবে অনেক রোহিঙ্গার দাবি, ব্যবহার করলেও এসব সিম কার নামে নিবন্ধিত, তা তারা জানে না। দায়িত্বশীলরা বিষয়টি জানলেও মুখ খোলে না। ১৩ লাখ রোহিঙ্গার হাতে কত সিম আছে, তারও কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই কারো কাছে।

তবে ঢাকা ট্রিবিউনের অনুসন্ধানে রোহিঙ্গা অপরাধী চক্রগুলোর বাংলাদেশি মোবাইল ব্যাংকিং সেবা ব্যবহারের বিষয়টি উঠে এলে কর্তৃপক্ষগুলো নড়েচড়ে বসেছে। অপরাধীরা এসব সিম দিয়ে নিবন্ধিত মোবাইল ব্যাংকিংয়ে লেনদেন করে মাদক ও মানবপাচারের কোটি কোটি টাকা। তাতেও কেউ বাধা দেয় না।

এর আগে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এবং একাধিক সরকারি সংস্থা ক্যাম্পে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের সিম অবৈধভাবে ব্যবহারের প্রমাণ পায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে রোহিঙ্গারা যাতে বৈধভাবে বাংলাদেশি মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করতে পারে, তার উপায় নির্ধারণে একটি কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু সেই উদ্যোগ থেমে যায় অজানা কারণে।

ক্যাম্পের বাসিন্দারা জানায়, চোরাই পণ্য বিক্রি হয় কক্সবাজারের এমন মার্কেটগুলো থেকে তারা ব্যবহৃত মোবাইল ফোন কেনে। কম দামে সেখানে সিম ও ফোন পাওয়া যায়। আবার মিয়ানমারের বাসিন্দাদের নামে নিবন্ধিত সিম ব্যবহার করায় ক্যাম্পে অবস্থানরত সন্ত্রাসীরা থেকে যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারির আড়ালে।

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দেশি-বিদেশি অপরাধী চক্রগুলো সক্রিয় শুরু থেকেই। বিশেষ করে অস্ত্র, মাদক ও মানবপাচারকারীদের তৎপরতা সবচেয়ে বেশি। এসব অপরাধী চক্র ছাড়াও ক্যাম্পের বেশিরভাগ লোকই মোবাইল ব্যবহারের ক্ষেত্রে মিয়ানমারের এবং বাংলাদেশ দুদেশের মোবাইল নেটওয়ার্কই ব্যবহার করে আসছে। শুধু তাই নয়, অবৈধ লেনদেনের জন্য বাংলাদেশের মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়ছে তারা।

শুক্র ও শনিবার দুদিন উখিয়া ও টেকনাফের কয়েকটি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ঘুরে দেখা গেছে, ক্যাম্পের ভেতরে বাজারে ছোট ছোট দোকান করেছেন রোহিঙ্গা তরুণরা। সেসব দোকানের কোনো কোনোটিতে প্রকাশ্যেই মোবাইল ফোন বিক্রি হয়। কোনটিতে সারানো হয়। কোনোটিতে ইলেক্ট্রিক যন্ত্রপাতিও সারানো হয়।

মরাগাছতলা ১১ নম্বর ক্যাম্পে ঢুকতেই চোখে পড়ে একটি মোবাইল ফোনের দোকান। সেখানেই পসরা সাজিয়ে বসেন মোহাম্মদ আসলাম। তার সঙ্গে কথা বলে ঢাকা ট্রিবিউন। পরিচয় গোপন করে কেমন বিক্রি হয় জানতে চাইলে, “ভালো হয়” ইঙ্গিত দেন তিনি। 

কথা প্রসঙ্গে আসলাম জানান, মূলত ওয়াল্টন, ম্যাক্সিমাস, নোকিয়ার পুরাতন বাটন ফোনগুলো এখানে বিক্রি হয়। টাকা দিলে তিনি সিমের ব্যবস্থাও করে দেবেন। শুধু সিমের জন্য তাকে দিতে হবে দুইশ টাকা।

তিনি আরও জানান, কম বেশি সব রোহিঙ্গা পরিবারেই মোবাইল ফোন আছে। বেশিরভাগ তরুণই স্মার্টফোন ব্যবহার করে থাকেন। এমনকি প্রয়োজনে সার্ভিসিং সেন্টারও আছে এখানে। অল্প টাকায় ফোনও সারানো যায়। দু-একজনকে অ্যাপলের আইফোন কিনতেও দেখেছেন বলে জানান আসলাম।

ক্যাম্পের ভেতরে মোবাইল ফোন ব্যবহার করছে রোহিঙ্গারা/এসকে শরিফউদ্দিন আহাদ/ঢাকা ট্রিবিউন

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু আসলাম না। সব ক্যাম্পেই বহুসংখ্যক মোবাইল ফোন ব্যবসায়ী আছেন। আবার মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। এর মূলে রয়েছে অবৈধ সিম।  অস্ত্র, মাদক ও মানবপাচারকারী সবক্ষেত্রেই লেনদেন হয়, এসব ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে। শুধু মাদক নয়, অস্ত্র ও মানবপাচারের সব টাকাও লেনদেন হয় এর মাধ্যমে।

কত সিম রোহিঙ্গাদের হাতে জানে না কেউ

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সিম বিক্রি নিষিদ্ধ থাকলেও হাতে হাতে মোবাইল ফোন। সিম বিক্রিতে বিটিআরসির স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা থাকলেও রোহিঙ্গারা অবাধে বাংলাদেশি মোবাইল ফোন সিম ব্যবহার করতে পারছে। তথ্য অনুযায়ী, ১৩ লাখ রোহিঙ্গার হাতে ঠিক কত সংখ্যক সিম রয়েছে তার সঠিক তথ্য কারো কাছে নেই। উখিয়া ও টেকনাফে আশ্রিত ১৩ লাখ রোহিঙ্গার কাছে ৮ থেকে ১০ লাখ বা তারও বেশি সিম চালু রয়েছে বলে ধারণা এই ব্যবসায় জড়িতদের।

সম্প্রতি ৭০টি সিমকার্ডসহ পুলিশের হাতে ধরা পড়েন রাজাপালং গ্রামের আবুল কাশেম (৩৫) ও কুতুপালং গ্রামের মো. হাসান (২৮)। এ দুজন মোবাইল কোম্পানির স্থানীয় এসআর। তারা অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন বলে জানান মামলার তদন্ত কর্মকর্তা।

উখিয়া সদর এলাকার মোবাইল ব্যবসায়ী আমিন সার্ভিস পয়েন্টের স্বত্বাধিকারী মো. নুরুল আমিন জানান, অনেক এজেন্ট বা দোকানের লোকজন কৌশলে গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিয়ে রাখেন। প্রতিজনের এনআইডি কার্ডের অনুকূলে পাঁচটি মোবাইল সিম নিবন্ধনের সুযোগ জালিয়াতি করে কাজে লাগাচ্ছে তারা। সেগুলোই রোহিঙ্গাদের কাছে অধিক মূল্যে বিক্রয় করছে বলে তিনি জানান। অন্যান্য জেলা থেকেও একইভাবে নিবন্ধিত সিম কার্ড সংগ্রহ করে সেগুলো রোহিঙ্গাদের কাছে চড়া দামে বিক্রিরও অভিযোগ রয়েছে।

জানা গেছে, ক্যাম্পের অনেক রোহিঙ্গা একাধিক মোবাইল ফোন সেট এবং একাধিক সিম ব্যবহার করে। ক্যাম্পগুলোর অবস্থান মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় সেখানে মিয়ানমারের মোবাইলের নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়। এ কারণে মিয়ানমারের বিভিন্ন কোম্পানির মোবাইল সিমও ব্যবহার করে তারা।

বায়োমেট্রিক নিবন্ধন ছাড়া এত সিম কার্ড রোহিঙ্গাদের হাতে কীভাবে গেল এ প্রশ্নের সঠিক জবাব কারও কাছে নেই। তবে ক্যাম্পে কাজ করা একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মীরা জানিয়েছেন, স্থানীয়রা নেটওয়ার্কের সমস্যায় থাকলেও রোহিঙ্গাদের মোবাইলে ২৪ ঘণ্টা নেটওয়ার্ক থাকে। তারা বলেন, রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীর ব্যবহৃত সিম যাদের নামে নিবন্ধিত তারা ঝুঁকিতে থাকবেন।

উখিয়া থানার পরিদর্শক (ওসি, তদন্ত) নুরুল ইসলাম ঢাকা ট্রিবিউনকে জানান, বিক্রয় প্রতিনিধি নামধারী একশ্রেণির প্রতারক স্থানীয়দের ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও আইডি কার্ড ব্যবহার করে, একাধিক সিম কার্ড তুলে তা চড়া দামে রোহিঙ্গাদের কাছে বিক্রি করছে। আটক ব্যক্তিরা এসব কথা স্বীকার করেছে।

শুক্র এবং শনিবার পর্যন্ত টেকনাফের লেদা, নয়াপাড়া, শালবাগান, জাদিমোরা, পুটিবুনিয়া এবং উখিয়ার কুতুপালং, বালুখালি, হাকিমপাড়া শিবির ঘুরে দেখেন ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদক। এ সময় পুরুষদের প্রায় সবার কাছে এবং নারীদের অনেকের হাতে মোবাইল ফোন দেখা যায়। তরুণ ও কিশোরদের হাতেও দামি ফোন দেখা গেছে। তারা ইউটিউব, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইমো, ভাইবার ব্যবহার করছেন।

রোহিঙ্গা তরুণদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা ক্যাম্পের মধ্যে থাকা দোকান থেকে সিমকার্ড কিনেছেন। তবে এসব সিম কার নামে নিবন্ধিত, সে বিষয়ে তাদের ধারণা নেই। ক্যাম্পগুলোতে সিম বিক্রির ছোট-বড় দোকান রয়েছে ৩০টির মতো।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী অফিসার আদনান চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গাদের ফোন ব্যবহারের বিষয়টি তারা অবগত। কিন্তু জাতীয় পরিচয়পত্র ছাড়া কীভাবে তারা সিম কিনছেন, সে বিষয়ে তাদের ধারণা নেই। বিষয়টি এখনই খতিয়ে দেখা দরকার বলে তারা মনে করেন।

ক্যাম্পের ভেতরে মোবাইল ফোন ব্যবহার করছে রোহিঙ্গারা/এসকে শরিফউদ্দিন আহাদ/ঢাকা ট্রিবিউনএ বিষয়ে জানতে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার মাহফুজুল ইসলামের মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে টেকনাফ থানা পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, এমন কোনো রোহিঙ্গা পরিবার নেই, যাদের হাতে মোবাইল ফোন নেই। কম হলেও সাড়ে পাঁচ লাখ রোহিঙ্গার হাতে মুঠোফোন থাকার তথ্য রয়েছে পুলিশের কাছে।

ক্যাম্পে চোরাই মোবাইলের মার্কেট, জড়িত বাংলাদেশিরা

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অবৈধ ফোনগুলো সাধারণত চোরাই মার্কেট থেকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মার্কেটে আসে। সেগুলোই রোহিঙ্গারা কম দামে ব্যবহার করে। বিভিন্ন এলাকা থেকে চোরাই মোবাইল ফোন কিনে বদলে ফেলা হয় আইএমএআই নম্বর। এরপর এসব ফোন বিক্রি করা হয় টেকনাফ ও উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। এভাবেই কক্সবাজারের চকোরিয়ায় চলছিল চোরাই মোবাইল ফোনের রমরমা ব্যবসা। সম্প্রতি আইনশঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে এই চক্রের পাঁচ সদস্য।

আটকরা হলেন- পেকুয়ার হাজিরঘোনা এলাকার আলমগীরের ছেলে মো. মোর্শেদ (২৯), চকরিয়া বিএমচড় এলাকার মৃত জামাল উদ্দীনের ছেলে মিজবা উদ্দীন (২৪), চকরিয়ার পহরচাঁদা এলাকার মৃত আব্দুল হামিদের ছেলে আমিনুল ইসলাম (২৬) এবং চকরিয়ার ফুলতলার মৃত আব্দুর রহিমের ছেলে শহীদুল ইসলাম (২৯)। তাদের কাছ থেকে ৫৫টি মোবাইল, ১১টি ডিভাইস উদ্ধার করা হয়।

চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) চন্দন কুমার চক্রবর্তী বলেন, “আটক আসামিরা বিভিন্ন মাধ্যম থেকে চোরাই মোবাইল সেট কিনে আইএমইআই নম্বর পরিবর্তন করে। এরপর তা ফের বিভিন্নজনের কাছে বিক্রি করে। এছাড়া তাদের বেশিরভাগ মোবাইল ফোন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বিভিন্ন অপরাধী ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত চক্রের কাছেও বিক্রি হয়ে আসছে। আমরা অপরাধীদের পেলেই গ্রেপ্তার করেছি।”

মোবাইল ব্যাংকিংয়ে লেনদেন হয় মাদকের টাকা

মোবাইল ব্যাংকিংয়ের জন্য অপারেটরের নিবন্ধিত সিম দরকার। সিমের সেই নিবন্ধন বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের কোনো নাগরিকের পাওয়ার কথা নয়। কিন্তু রোহিঙ্গা হয়েও ক্যাম্প এলাকায় অনেকেই শুরু করেছেন মোবাইল ব্যাংকিং। একাধিক কোম্পানির মাধ্যমেই লেনদেন করেন তারা। কীভাবে রোহিঙ্গারা মোবাইল ব্যাংকিং করছেন বা এর অনুমোদন পাচ্ছেন, তা অনুসন্ধান করেছে ঢাকা ট্রিবিউন।

লেনদেনের নেপথ্যেই বা কী- সেই অনুসন্ধান করতে গিয়ে বেরিয়ে আসে চমকপ্রদ সব তথ্য।

ঢাকা ট্রিবিউনের অনুসন্ধানে জানা গেছে, শফি আলম নামের এক ব্যক্তি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের বড় এজেন্ট। টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের মোচনীপাড়া এলাকার মোবাইল ব্যাংকিং করেন তিনি। গত কয়েক মাসে তার এজেন্ট নম্বরের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে অন্তত অর্ধকোটি টাকা। এজেন্টদের মধ্যে ওই এলাকায় তিনি বেশ প্রভাবশালী।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য বলছে, এই শফি বাংলাদেশের নাগরিকই নন। তিনি মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গা। দেশটি থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়ে টেকনাফে সস্ত্রীক আশ্রয় নিয়েছিলেন। এখন তিনি দুই সন্তানের বাবা। তাদের পুরো পরিবারই জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) শরণার্থী হিসেবে নিবন্ধিত।

কাগজপত্র অনুযায়ী শফি আলম পরিবার নিয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে থাকার কথা। কিন্তু তিনি এখন মোচনীপাড়ায় মোবাইল ব্যাংকিংয়ের বড় এজেন্ট।

পাহাড়-জঙ্গলের কক্সবাজারের সীমান্তবর্তী উপজেলা এই টেকনাফ। এই উপজেলার সীমান্তে জনবসতিও তুলনামূলক কম। বড় ব্যবসা-বাণিজ্যও নেই। তবুও টেকনাফে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে রেকর্ড পরিমাণ লেনদেনে আলোচনায় এই এলাকাটি।

অনুসন্ধানে উঠে আসে, টেকনাফের সীমান্ত এলাকায় এই মোবাইল ব্যাংকিংয়ের অস্বাভাবিক আর্থিক লেনদেনের নেপথ্যে মাদকের কারবারিরা। মাদকের অবৈধ টাকা লেনদেনে এই এলাকায় গড়ে উঠেছে শক্তিশালী মোবাইল ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক। এর প্রায় পুরো নিয়ন্ত্রণও রোহিঙ্গাদের হাতে।

ঝুলে আছে রোহিঙ্গাদের বৈধ সিম দেওয়ার প্রক্রিয়া

অবৈধ সিমগুলো মিয়ানমারের স্থানীয় ব্যক্তির নামে নিবন্ধিত হওয়ায় ক্যাম্পের অপরাধীরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারির বাইরে থেকে যাচ্ছে। সেজন্য ওই এলাকায় মিয়ানমারের নেটওয়ার্ক বন্ধ করে বাংলাদেশি অপারেটরের সিম ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বৈধভাবে যাতে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশি সিম ব্যবহার করতে পারে, তার উপায়ও খোঁজা হচ্ছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মোবাইল ফোনের ব্যবহার দেশের অন্যান্য এলাকার মতোই স্বাভাবিক ব্যাপার/এসকে শরিফউদ্দিন আহাদ/ঢাকা ট্রিবিউন

জানা গেছে, কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে বসবাসকারী রোহিঙ্গারা যাতে বাংলাদেশি মোবাইল ফোনের সিম বৈধভাবে ব্যবহার করতে পারে, সেই উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। এজন্য গত বছরের শেষদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একটি কমিটিও গঠন করে দেওয়া হয়েছিল। ওই কমিটিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ছাড়াও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ও সংস্থার সদস্যরা রয়েছেন।

কথা ছিল কমিটি রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো পরিদর্শন করে ক্যাম্প এলাকায় মিয়ানমারের মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ ও বাংলাদেশি নেটওয়ার্কের সিম ব্যবহারের উপায় নিয়ে মতামত দেবে। কিন্তু সেই কমিটির কার্যক্রমে খুব একটা অগ্রগতি হয়নি।

এদিকে, বিটিআরসিরও (বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন) একটি টিম ইতোমধ্যে সেখানে গিয়ে রোহিঙ্গাদের মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে দেখেছে। কেউ বাংলাদেশি সিম, কেউ মিয়ানমারের সিম ব্যবহার করছে বলে গোয়েন্দাদের কাছেও তথ্য রয়েছে। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে বলপ্রয়োগে বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকদের সমন্বয়, ব্যবস্থাপনা ও আইনশৃঙ্খলা সম্পর্কিত জাতীয় কমিটির এক সমন্বয় সভায় এসব বিষয়ে কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওই বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।

সেই বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানিয়েছিলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ বন্ধ করতে নানামুখী তৎপরতা চালানো হচ্ছে। তাছাড়া, রোহিঙ্গাদের বেশিরভাগই ক্যাম্প এলাকায় মিয়ানমারের মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করছে। এটা বন্ধ করতে কাজ চলছে। এজন্য একটি কমিটিও করে দেওয়া হয়েছে। রোহিঙ্গাদের কিভাবে বাংলাদেশি মোবাইল নেটওয়ার্কে নিয়ে আসা যায়- সেটা তারা খতিয়ে দেখবে। এছাড়া গোয়েন্দারা এ বিষয়ে নজরদারি বাড়িয়েছে। তারা শুধু অপরাধীদের নেটওয়ার্ক ঘিরে নজরদারি করবে।

বাংলাদেশি মোবাইল নেটওয়ার্ক জোরদার ও কবে নাগাদ মিয়ানমারের মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ করা হবে, তা জানতে বিটিআরসি মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খলিলুর রহমানের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি সাড়া দেননি।

রোহিঙ্গাদের সিম দেওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটবের মহাসচিব জুলফিকার। তিনি বলেন, “মোবাইল অপারেটররা সবসময়ই বিটিআরসির নির্দেশনা মেনে চলে। জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভাণ্ডারে সংরক্ষিত তথ্যের সঙ্গে আঙুলের ছাপ যাচাইয়ের পরেই সিম সক্রিয় করা যায়। রোহিঙ্গাদের এনআইডি কার্ড নেই। এনআইডি কার্ড না থাকলে সিম দেওয়ারও সুযোগ নেই।”

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কার্যালয়ের কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “বেশ কিছুদিন আগেই এ বিষয়ে একটি কমিটি করে দেওয়া হয়েছিল। সেই কমিটির বৈঠকে জননিরাপত্তা সচিবের উপস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের বর্তমান মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তবে পরে দেখা যায়, এতে হিতে বিপরীত হচ্ছে। তারা মিয়ানমারের সিম ব্যবহার করছে। এরপরে সরকারিভাবে বাংলাদেশি সিম দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তবে এখন পর্যন্ত এটা চালু হয়নি। এখন রোহিঙ্গারা যা ব্যবহার করছে তা অবৈধ।”

তিনি আরও বলেন, “মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অবৈধ লেনদেন করছে রোহিঙ্গারা, এমনটা আমরাও শুনেছি। বিষয়টি মনিটরিং করছে সংশ্লিষ্টরা।”

তবে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) নির্বাহী পরিচালক মাসুদ বিশ্বাস বলেন, “রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বড় অঙ্কের অবৈধ টাকা লেনদেন হচ্ছে- এ বিষয়ে আমরা অবগত নই। বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে সামনে এলে আমরা অবশ্যই তদন্ত করব।”

   

About

Popular Links

x