ময়মনসিংহে নিজেদের নামাজ আদায়ের জন্য মসজিদ নির্মাণ করেছে হিজড়া সম্প্রদায়। সম্প্রতি জেলা শহরে নামাজ পড়তে গেলে সেখান থেকে তাদের বের করে দেওয়া হয়। এরপরই একটি বরাদ্দ পাওয়া সরকারি একটি জমিতে নিজেদের অর্থায়নে মসজিদ নির্মাণ করে তারা।
দক্ষিণ এশিয়ার হিজড়ারা নিজেদের মতো দলবদ্ধ হয়ে বসবাস করেন। তাদের মসজিদে নামাজ পড়তে বাধা দেওয়া হয়।
ছোট বেলায় কোরআন তেলাওয়াত করতে পারতেন, পড়েছেন মক্তবেও, পরবর্তীতে হিজড়া সম্প্রদায়ে যোগ দেওয়ায় জীবনে মসজিদে নামাজ পড়তে পারবেন এমন আশা ছেড়েই দিয়েছিলেন ৪২ বছর বয়সী সোনিয়া। তিনি বলেন, “আমি স্বপ্নেও ভাবিনি, জীবদ্দশায় আবারও একটি মসজিদে নামাজ পড়তে পারব।”
২০২১ সালে একটি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে বিজয়ী হন তৃতীয় লিঙ্গের এক ব্যক্তি। এরপর আরও কয়েকজন রাজনীতিতেও অংশ নেওয়া শুরু করেছেন।
তবে এখনও তারা মৌলিক স্বীকৃতি ও সমাজে তাল মিলিয়ে চলার জন্য সংগ্রাম করছেন। তারা সম্পত্তি ও বিবাহের অধিকার পান না।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও তারা বৈষম্যের শিকার। এছাড়া গড় বাংলাদেশিদের তুলনায় হিংসাত্মক অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ও দারিদ্র্যের শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন তারা।
কট্টরপন্থী ইসলামি গোষ্ঠীগুলো স্কুলের পাঠ্যপুস্তকে হিজড়াদের স্বীকৃতির তীব্র সমালোচনা করেছে। হিজরাদের বিষয়ে পাঠ্যবইয়ে থাকা লেখা সরিয়ে দিতে ঢাকায় সমাবেশও করেছে তারা।
হিজড়াদের দাতব্য সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা মুফতি আবদুর রহমান আজাদ এএফপিকে বলেন, “নতুন মসজিদটি দেশের মধ্যে প্রথম।”
“গত মাসে অন্য একটি এলাকায় একইভাবে মসজিদ নির্মাণের চেষ্টা করা হলেও স্থানীয়দের বাধার মুখে তা বন্ধ হয়ে যায়,” যোগ করেন তিনি।
এরপরই স্থানীয় কয়েকজন হিজড়া নিজেরা অর্থ দিয়ে দক্ষিণ চর কালীবাড়ি মসজিদ নির্মাণ করেন। যা এ মাসেই চালু করা হয়েছে।
২০২৩ সালে একটি স্থানীয় কবরস্থানে এক হিজড়া তরুণীর মরদেহ দাফন করতে গেলে স্থানীয়রা বাধা দেয়। এরপর তারা একটি কবরস্থানও তৈরি করেন।
মসজিদটিতে ইমামতি করছেন ৬৫ বছর বয়সী আব্দুল মোতালেব। তার মতে, তার ধর্মীয় বিশ্বাস ইসলামের নীতির পরিপন্থি।
তিনি এএফপিকে বলেন, “তারা আল্লাহর সৃষ্ট অন্যান্য মানুষের মতো।”
‘কাউকে অস্বীকার করা যাবে না’
“আমরা সবাই মানুষ। হয়তো কেউ পুরুষ, কেউ নারী, কিন্তু সবাই মানুষ। আল্লাহ পবিত্র কোরআন সবার জন্য নাজিল করেছেন, তাই প্রত্যেকের প্রার্থনা করার অধিকার আছে, কাউকে অস্বীকার করা যাবে না।”
মোতালেব বলেন, “হিজড়াদের বিশ্বাস ও শক্তি থেকে অন্যান্য বাংলাদেশিরাও শিক্ষা নিতে পারে।”
তিনি বলেন, “আমি যেহেতু এই মসজিদে এসেছি, আমি তাদের চরিত্র ও কাজ দেখে মুগ্ধ।”
নতুন মসজিদটি এরইমধ্যে কুসংস্কার মোকাবেলা করছে। টানা দ্বিতীয় সপ্তাহ সেখানে জুমার নামাজ আদায় করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা তোফাজ্জল হোসেন (৫৩)।
তিনি বলেন, “হিজড়া সম্প্রদায়ের সাথে বসবাস এবং প্রার্থনা তাদের সম্পর্কে তার ’ভুল ধারণা’ পরিবর্তন করেছে।”
তিনি এএফপিকে বলেন, “যখন তারা আমাদের সাথে থাকতে শুরু করে, তখন অনেকেই অনেক কথা বলেছিল।”
“কিন্তু আমরা বুঝতে পেরেছি যে লোকেরা যা বলে তা সঠিক নয়। তারা অন্যান্য মুসলমানদের মতো ন্যায়পরায়ণ জীবনযাপন করে।”
তিনি আশা করছেন, “মসজিদটি আরও বেশি বড় হবে। সবাই সেখানে নামাজ পড়তে পারবে। আল্লাহ চাইলে আমরা তাড়াতাড়িই এটি করতে পারব।”
তিনি আরও বলেন, “শতশত লোক একসঙ্গে এখানে যাতে নামাজ পড়তে পারে সেই প্রত্যাশা করছি।”
হিজড়া জনগোষ্ঠীর নেতা জ্যোতিকা তনু বলেন, ‘‘এখন থেকে কেউ আর হিজড়াদের এই মসজিদে নামাজ পড়তে বাধা দিতে পারবে না। কেউ আর আমাদের নিয়ে উপহাসও করতে পারবে না।’’



