Saturday, June 15, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

রাজশাহীতে লাগামহীন আমের বাজার

  • ফলন কম
  • তাপদাহে আমের গুটি ঝরে পড়ে
  • রিমালের কারণেও আম ঝড়ে পড়ে
আপডেট : ০৯ জুন ২০২৪, ১০:৩৩ এএম

রাজশাহীতে বাগানের গাছ থেকে আম পাড়া ও বিক্রির সময়সূচী বা “ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার” অনুযায়ী, বাজারে এখন পাওয়া যাচ্ছে গোপালভোগ, লক্ষণা, ক্ষীরশাপাত ও গুটি আম। আমের রাজধানী খ্যাত এ অঞ্চলে মৌসুমের এই সময়ে দাম সবসময় কম থাকে, তবে এবার চিত্র ভিন্ন। ফলন কমের অজুহাতে লাগামহীনভাবে বাড়ছে আমের দাম। গত বছরের তুলনায় এবার জাতভেদে আমের দাম বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ।

রাজশাহীর পাইকারি ও খুচরা আমের বাজারগুলো ঘুরে দেখা যায়, হাঁকডাকে জমে উঠছে আমের বাজার। দাম বেশি হওয়ায় নিম্নমধ্যবিত্তের মুখে আমের স্বাদ নেওয়া কষ্টকর হয়ে পড়েছে, বলছেন ক্রেতারা।

আমের পাইকারি বাজারের মোকাম রাজশাহীর বানেশ্বর বাজার ঘুরে দেখা যায়, বাজারে গোপালভোগ আম ৩,৭০০ থেকে ৩,৮০০ টাকা, ক্ষীরশাপাত ৪,০০০ থেকে ৩,০০০ টাকা, লক্ষণা ১,৭০০ থেকে ১,৮০০ টাকা ও গুটি আম ১,২০০ থেকে ২,০০০ টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে।

একই বাজারে দুই দিন আগে গোপালভোগ ২,৮০০ থেকে ৩,৪০০ টাকা, ক্ষীরশাপাত ২,৮০০ থেকে ৩,২০০ টাকা, লক্ষণা ১,৪০০ থেকে ১,৬০০ টাকা ও গুটি আম ১,২০০ থেকে ২,০০০ টাকা মণ দরে বিক্রি হয়েছে।

পুঠিয়া উপজেলার বানেশ্বর এলাকার আমিনুল ইসলাম নামে আমের ব্যবসায়ী ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “গত বছর এ সময় গোপালভোগ আম ১,৮০০ থেকে ২,০০০ টাকা মণ ছিল, সেটি এবার সাড়ে ৩ হাজারের নিচে পাওয়া যাচ্ছে না। গুটি আম ৮০০ টাকা থেকে ১,০০০ টাকা মণ ছিল, সেই আম এবার ১,৫০০ থেকে ২,০০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ক্ষীরশাপাত আমও গতবার ১,৮০০ থেকে ২,০০০ ছিল, এবার ৩,০০০ থেকে ৪,০০০ টাকা মণে বিক্রি হচ্ছে।”

বাজারে আম কম আমদানির কারণে দাম বেশি বলে জানান ওই ব্যবসায়ী।

গত বছরের তুলনায় এবার জাতভেদে আমের দাম বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ/ঢাকা ট্রিবিউন

রাজশাহীর বাঘার আমচাষী শফিকুল ইসলাম সানা গত বছর প্রায় এক কোটি টাকার আম বিক্রি করেছিলেন। তার মধ্যে ২৬ মেট্রিক টন আম বিদেশেই রপ্তানি করেন। শফিকুল ইসলাম এ বছরও ৩০০ বিঘা জমিতে আমের চাষ করছেন। এ বছর গাছে অর্ধেকেরও কম আম এসেছে বলে জানান। তবে বাঘার অন্য চাষিদের তুলনায় তার অবস্থা কিছুটা ভালো। পরিচর্যা বেশি নেওয়ায় আমের আকারও ভালো হয়েছে।

শফিকুল ইসলাম সানা বলেন, “ঘূর্ণিঝড় রিমালে ৫০%-এর মতো আম পড়ে গেছে। তারপরও আমার বাগানে ৪০%-এর মতো আম আছে। তবে অন্য চাষিদের অবস্থা আরও খারাপ। ২০%-এর কম আম এসেছে।”

তিনি জানান, গত বৃহস্পতিবার ৩০০ কেজি গোপালভোগ বিক্রি করেছেন আর শুক্রবারে ৫০০ কেজি। এক্সপোর্ট সাইজ গোপালভোগ ৪ হাজার টাকা মণ বিক্রি করেছেন, যেগুলোর প্রতিটি আমের ওজন ২০০ গ্রামের ওপরে।

রাজশাহী অঞ্চলে এ বছর গাছে দেরিতে মুকুল এসেছে। মুকুলও কম এসেছিল। মুকুল আসার কিছুদিন পর শিলাবৃষ্টিতে কিছু ঝরেও পড়ে। এরপর এপ্রিল মাসেই তীব্র তাপদাহ বয়ে যায়। তাতেও আমের গুটি ঝরে পড়ে। শেষে ঘূর্ণিঝড় রিমালের কারণেও রাজশাহীর আম ঝড়ে পড়ে। গত বৃহস্পতিবারও (৬ জুন) ঝটিকা ঝড়ে অনেক আম পড়েছে। 

চারঘাট উপজেলার আমচাষী ডাবলুর ২০ বিঘা আমের বাগান। বিভিন্ন জাতের আমের চাষ করেছেন তিনি। তিনি ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করেই আমকে টিকে থাকতে হয়। তবে আমের যারা পরিচর্যা নেন তাদের গাছে আম ভালো থাকে। গতবারের চেয়ে কিছুটা কম এলেও আমার সব গাছেই মোটামুটি আম আছে।” পরিচর্যার কারণেই এমনটা হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (অবসরপ্রাপ্ত) ড. আলীম উদ্দিন ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “আবহাওয়াগত কারণে আমের ফলনে অনেকটা তারতম্য ঘটে। আবার এক বছর আমের ফলন ভালো হলে পরের বছর স্বাভাবিকভাবে গাছে কম আম আসে। এবার শীতকাল দীর্ঘ সময় থাকায় গাছে মুকুল কম এসেছে। আবার তাপদাহের কারণেও আমার ফলনে তারতম্য হয়েছে। সবমিলিয়ে এবার আমের অফসিজন। তারপরও এখন যেহেতু নানা জাতের আমের চাষ হয়, তাই এই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।”

দাম ও ফলন মিলিয়ে কিছু চাষি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন/ঢাকা ট্রিবিউন

তিনি আরও বলেন, “একটা আমের ফলন ভালো না হলে অন্য আমের ফলন ভালো হচ্ছে। এবার গোপালভোগ, ক্ষীরশাপাত, হিমসাগর ও লক্ষণা আমের ফলন কম হলেও বারি আম-৩, বারি আম-৪ ও বারি আম-১১ এর ফলন ভালো হয়েছে। এই আম বিক্রি করে সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে।”

রাজশাহী নগরীর বহরামপুর এলাকার শিক্ষক ওয়াসিম আকরাম ওরফে আবিব জানান, এবার আমের বাজার চড়া। তাই অল্প করে কিনছে বেশিরভাগ মানুষ।

নগরীর অটোরিকশাচালক মনিরুল ইসলাম বলেন, “এই মৌসুমে এখনও আমের দিকে নজর দেওয়া হয়নি। কারণ একদিন কিনতে গিয়ে দেখি দাম গতবারের তুলনায় বেশি। তাই সুবিধা অনুযায়ী সংসারের খরচ বাঁচিয়ে মৌসুমের ফল পরিবার নিয়ে খাব।”

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৯৩,২২৪ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১২ লাখ ১৯ হাজার ৯১০ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আম চাষ হয়েছে বারি আম-৩ বা আম্রপালি, ২৪,০১১ হেক্টর জমিতে। এরপর রয়েছে যথাক্রমে আশ্বিনা ১৩,৭৩০ হেক্টর, ফজলি ১১,৯৭৭ হেক্টর, লক্ষণভোগ ৯,৬৬৯ হেক্টর, ক্ষীরশাপাত ৯,০২১, ল্যাংড়া ৬,৭১৫ এবং বারি আম-৪ চাষাবাদ হয়েছে ৩,৬৬২ হেক্টর জমিতে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রাজশাহী অঞ্চলের উপ-পরিচালক ড. মো. মোতালেব হোসেন ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল ও গোমস্তাপুর এবং নওগাঁর নিয়ামতপুর, পোরশা, সাপাহার ও পত্নীতলার উঁচু বরেন্দ্রভূমিতে কৃষি উদ্যোক্তারা নতুন বাগান করেছেন। এসব বাগানে বারি আম-৩ বা আম্রপালি, বারি আম-৪, কাটিমন, গৌড়মতিসহ নতুন জাতের আমগুলো ‘অফইয়ার’, ‘অনইয়ার’ মেইনটেইন করে না। এসব জাতের গাছে প্রতি বছরই আম ধরে। এসব গাছে আম ভালো ধরে। অন্যদিকে গোপালভোগ, ল্যাংড়া, ক্ষীরশাপাত জাতের কমন আমগুলোতে একবছর বেশি আম এলে সাধারণত পরের বছর কিছুটা কম আম আসে। এই আমগুলো রাজশাহীর চারঘাট ও বাঘা এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে বেশি হয়। এসব গাছে এবার কম আম এসেছে। এছাড়া দীর্ঘ তাপপ্রবাহের কারণেও আমের ফলন কম হয়েছে। এরপরও দাম ও ফলন মিলিয়ে কিছু চাষি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। আবার অনেক চাষি লাভবান হতে পারেন।”

About

Popular Links