প্রতিবছরই বিদেশে যাচ্ছে রাজশাহীর আম। জেলায় “কন্ট্রাক্ট ফার্মিং”-এর মাধ্যমেও হচ্ছে আম চাষ। আমের গুণগত মান ঠিক রেখে রপ্তানিযোগ্য করতে “ফ্রুট ব্যাগিং” পদ্ধতিরও ব্যবহার বাড়ছে।
রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসরণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০১৬ সাল থেকে রাজশাহীর আম বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। ২০২৩ সালে ৯.৯ মেট্রিক টন আম রপ্তানি করা হয়। ওই বছর প্রায় ৮ লাখ টাকা লাভ করেছেন কৃষকরা।
এবছর রপ্তানির জন্য প্রায় ৩,৪৯৭.৩৫ মেট্রিক টন আম উৎপাদন করা হয়েছে। গত বছর কন্ট্রাক্ট ফার্মিংয়ে চুক্তি করেন ৮০ জন চাষি। আর এ বছর চুক্তি করেছেন ১১৮ জন। এই চাষিরদের সবাই ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তির ব্যবহার করছেন।
কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, কন্ট্রাক্ট ফার্মিং পদ্ধতির মানদণ্ড হচ্ছে স্বাস্থ্যসম্মত উৎপাদন, নিরাপদ ও খাদ্যমান রক্ষা, পরিবেশ সুরক্ষা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, কৃষিকর্মীর স্বাস্থ্য ইত্যাদি মেনে চলা।
স্বাস্থ্যসম্মত উৎপাদনের মধ্যে রয়েছে সার, সেচ, বালাইনাশক প্রয়োগ ও ব্যবহারবিধি অনুসরণ, বীজ ও চারা রোপণ সামগ্রীর ব্যবহার, রাসায়নিকের পরিমিত ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনা অবলম্বনে উৎপাদন নিশ্চিত করা। নিরাপদ ও খাদ্যমান রক্ষার মধ্যে রয়েছে ফসল সংগ্রহের পর সংরক্ষণ ও পরিবহন ব্যবস্থাপনা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এক মৌসুমে আম সংগ্রহ করার পর থেকে পরের মৌসুমে আম সংগ্রহ করা পর্যন্ত ১৫-৬২ বার বালাইনাশকের ব্যবহার করে থাকেন চাষিরা। অথচ, গবেষণায় দেখা গেছে, ক্ষেত্র বিশেষে ২-৫ বার স্প্রে করলেই ভালো মানের আম সংগ্রহ করা সম্ভব।
তারা বলছেন, মাত্রাতিরিক্ত স্প্রে যেমন জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর তেমনি আমের উৎপাদনকেও ব্যয়বহুল করে তোলে। অতিরিক্ত স্প্রে করার ফলে উপকারী ও বন্ধু পোকার সংখ্যাও দিন দিন কমে যাচ্ছে। বালাইনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহারের পরিবেশবান্ধব সমাধানের অন্যতম উপায় এই ব্যাগিং পদ্ধতি। আর রপ্তানিযোগ্য আমের শর্ত পূরণে এ পদ্ধতি জনপ্রিয় হচ্ছে।
ফ্রুট ব্যাগিং কী?
ফ্রুট ব্যাগিং বলতে ফল গাছে থাকা অবস্থায় বিশেষ ধরনের ব্যাগ দ্বারা ফলকে আবৃত করাকে বোঝায়। ফল সংগ্রহ করা পর্যন্ত গাছেই লাগানো থাকে ব্যাগটি। এই ব্যাগ ফলের প্রকারভেদে ভিন্ন রং এবং আকারের হয়ে থাকে।
তবে আমের জন্য দুই ধরনের ব্যাগ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। রঙিন আমের জন্য সাদা রঙের এবং সবুজ আমের জন্য দুই আস্তরণের বাদামি ব্যাগের ব্যবহার হয়।
এ পদ্ধতিতে আমের পাশাপাশি পেয়ারা ও ডালিমেও ব্যাপক সফলতা এসেছে। কলা ও কাঁঠালের মতো অন্যান্য ফলেও এ প্রযুক্তি সুফল আনছে। এতে বরেন্দ্রের ফল বাগানগুলোতে দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁয় বাণিজ্যিক বাগানগুলোতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে ফ্রুট ব্যাগিং। চাঁপাইনবাবগঞ্জের আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের (আরএইচআরসি) বিজ্ঞানীরা কৃষি গবেষণার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জনের পর প্রায় সাত থেকে আট বছর আগে চাষিদের মধ্যে প্রযুক্তিটি প্রকাশ করেন।
এরই মধ্যে অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্রতিটি ব্যাগ ৩ থেকে ৪ টাকায় কৃষকদের কাছে সরবরাহ করছে। যেগুলো বিদেশ থেকে আনা হচ্ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ আম গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মুখলেসুর রহমান তার গবেষণার ফলাফলের উল্লেখ করে বলেন, “ব্যাগযুক্ত ফল নন-ব্যাগযুক্ত ফলগুলির তুলনায় অনেক ভালো। এ প্রযুক্তি পোকামাকড় এবং রোগের ক্ষতি কমাতে এবং আমের ফলের গুণমান ত্রুটিগুলি হ্রাস করতে সহায়তা করে। ফল ব্যাগিং পদ্ধতি ফল ও গাছের সুরক্ষার জন্য একটি কার্যকর পদ্ধতি।”
রাজশাহীর ফল গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. শফিকুল ইসলাম বলেন, “আম এই অঞ্চলের বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ফল ফসলের মধ্যে একটি। তবে গুরুত্বপূর্ণ ফসলটি বিকাশের সব পর্যায়ে কীটপতঙ্গ এবং রোগের আক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছে। এক্ষেত্রে প্রযুক্তিটি আতঙ্ক দূর করার জন্য চাষি এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে একটি উচ্চ আশা তৈরি করেছে।”
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক মোছা. উম্মে ছালমা বলেন, “কন্ট্রাক্ট ফার্মিং দিন দিন বাড়ছে। যেখানে নিরাপদ আম উৎপাদনের তাগিদে ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতির ব্যবহার বাড়ছে।”
তিনি বলেন, “এতে নিরাপদ আমের উৎপাদন বেড়েছে। সব আম যে বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে তা কিন্তু নয়। ২০২২ সালে সারাদেশের ১৭০০ মেট্রিক টন আম বিদেশে রপ্তানি হয়েছে। গত বছর ৩৫০০ মেট্রিক টনের বেশি হয়েছে। আমাদের আম রপ্তানির প্রকল্প আছে। দেশে কিন্তু আম রপ্তানি বাড়ছে। শুধু বিদেশে নয়, দেশেও বিভিন্ন সুপার শপে চাহিদা আছে নিরাপদ আমের।
এ মৌসুমে রাজশাহীর বাঘা উপজেলার কলিগ্রামের কৃষক শফিকুল ইসলামের সাদি এন্টারপ্রাইজ থেকে ১,৮০০ কেজি এবং বিদ্যুৎ হোসেনের বাগান থেকে ২০০ কেজি আম রপ্তানি করা হয়েছে। শফিকুল ইসলাম বলেন, “আমরা এবার বেশ ভালো প্রস্তুতি নিয়েছি। কন্ট্রাক্ট ফার্মিং-এর চাহিদা বাড়ছে। এর মাধ্যমেই আম বিদেশে পাঠানো হয়। করণ এর মাধ্যমে জবাবদিহিতা আছে। এ কারণেই ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতিও জনপ্রিয় হচ্ছে।”
তিনি বলেন, “আমি যখন শুরু করি; তখন ৫০ বিঘা জমিতে আম চাষ করতাম। এখন ৩০০ বিঘায় চাষ করি। কন্ট্রাক্ট ফার্মিংয়ে চাষিদের আগ্রহ বাড়ছে। শুরুতে ১৪ থেকে ১৫ জন ছিল। এখন ২০-২৫ জন করছে। প্রতিটি ইউনিয়নেই হচ্ছে। এতে বাড়ছে ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতির ব্যবহার।”
রাজশাহী ফুড প্রডিউসার সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাফিজুর রহমান খান বলেন, “রাজশাহীতে কন্ট্রাক্ট ফার্মিং বাড়ছে। বিদেশেও চাহিদা আছে। এবার উৎপাদন বেশি। আর আমের গুণগত মান অর্জনের জন্য ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতির ব্যবহার বাড়ছে।”
তিনি বলেন, “সরকারের কাছে যে সার্পোটটা আমাদের দরকার; সেটি পাচ্ছি না। পাশের দেশের চেয়ে আমাদের দেশে কার্গো ভাড়া বেড়েছে অনেক। প্রতি বছরই কোনো না কোনো সমস্যা থাকে। আমরা লিখিতভাবেও বেশকিছু সমস্যা জানিয়েছি। কিছু সমাধান হয়েছে। কিন্তু পুরোপুরি সমাধান হয়নি।”
বাঘা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শফিউল্লাহ সুলতান বলেন, “উত্তম কৃষিচর্চার মাধ্যমে চাষ করা আম দেখে-শুনে একটি প্রত্যয়নপত্র দিচ্ছি। তারপর ঢাকার শ্যামপুর প্যাকিং হাউজ অ্যান্ড কোয়ারেন্টিন সেন্টার থেকে আরেকটি প্রত্যয়নপত্র দেওয়া হয়। এরপর এই আম বিদেশে চলে যাবে। এ লক্ষ্যে কৃষকদের নিয়ে কাজ করছি। প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও তদারকির কাজও করা হচ্ছে। যেখানে ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতি খুবই কার্যকর ভূমিকা রাখছে।”



আমের জাতভেদে কি পুষ্টিগুণ আলাদা হয়?
কোন জাতের আম স্বাদে সেরা?
পাকা আমের রেসিপিতে রঙিন করুন মুখ!
আমের পায়েস রান্না করবেন যেভাবে
রূপচর্চায় আমের খোসা
আম্রপালি আমের নামকরণ যেভাবে হলো
দামি এসব জাতের আম খেয়েছেন কখনো?