Sunday, June 21, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

ঐতিহাসিক মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্সে দুর্বৃত্তদের তাণ্ডব

ভাঙা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজরিত ৬০০টি ছোট-বড় ভাস্কর্য

আপডেট : ১১ আগস্ট ২০২৪, ০৪:২২ পিএম

প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে সোমবার দেশ ছেড়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। টানা চারবার ক্ষমতায় আসার পরও ছাত্র আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করতে হয় তাকে।

প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশ ছাড়ার খবরের পর দেশের বিভিন্ন জায়গায় থানা, সরকারি অফিস ভবন, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বাসভবন ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগের খবর আসতে থাকে। এসব ঘটনায় পুলিশ সদস্য ও আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন। প্রাণ হারিয়েছেন সাধারণ মানুষও।

দুবৃ্র্ত্তরা ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ করে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজরিত বিভিন্ন স্থাপনা ও ভাস্কর্যে। হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর করা হয় শিল্প-সংস্কৃতি চর্চার বিভিন্ন স্থাপনাতেও।

শেখ হাসিনার পদত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়লে দুর্বৃত্তর হানা দেয় মেহেরপুরের ঐতিহাসিক মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্সে। এ সময় তারা কমপ্লেক্সে ছোট-বড় ৬০০টি মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ভেঙে ফেলে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম প্রথম আলো।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ৫ আগস্ট বিকেল পাঁচটার দিকে শতাধিক লোক রড, বাঁশ ও হাতুড়ি নিয়ে স্মৃতি কমপ্লেক্সে প্রবেশ করে। প্রথম তারা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের মাথা ভেঙে ফেলে। একই সময়ে এলোপাতাড়িভাবে আঘাত করে “১৭ এপ্রিলের গার্ড অব অনার” ভাস্কর্যটিতে। আরেকটি একটি দল ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানের আত্মসমর্থনের ভাস্কর্যগুলোতে আঘাত করে। এরপর কমপ্লেক্সের মধ্যে দেশের মানচিত্রের আদলে তৈরি করা মুক্তিযুদ্ধের ১১টি সেক্টরে যুদ্ধের বর্ণনা সংবলিত ছোট ভাস্কর্যগুলো ভেঙে ফেলে।

এ বিষয়ে মুজিবনগর কমপ্লেক্সের দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্য হ‌ুমায়ূন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, “৬০০টি ছোট-বড় ভাস্কর্য ভেঙে ফেলা হয়েছে। পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ ছিল ভাস্কর্যগুলো। প্রতিদিন কয়েক হাজার দর্শনার্থী এখানে আসতেন। কমপ্লেক্সের সব ভাস্কর্য ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। কমপ্লেক্সজুড়ে চালিয়েছে লুটপাট।”

মুজিবনগর কমপ্লেক্সের দায়িত্বরত টুরিস্ট পুলিশের সদস্য আবজাল শেখ জানান, কয়েক দফায় রাত ১২টা পর্যন্ত সেখানে দুর্বৃত্তরা ভাঙচুর চালায়। সব শেষে আনসার ক্যাম্পে এসে আক্রমণ করে অফিস ভাঙচুর করে এবং কন্ট্রোল রুম থেকে সিসিটিভি ক্যামেরার হার্ডডিস্কটি খুলে নিয়ে যায়।

মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্সে স্থাপিত আনসার ক্যাম্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবেদার রবিউল ইসলাম বলেন, “যখন দুর্বৃত্তরা এখানে হামলা শুরু করে, তখন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মুঠোফোনে নির্দেশনা চাওয়া হয়েছিল। তিনি কোনো নির্দেশনা দিতে পারেননি। এ কারণে আনসার সদস্যরা নিজেদের জীবন ও অস্ত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যারাকে অবস্থান নেন।”

উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বর গণহত্যা চালায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠনের লক্ষ্যে ১৭ এপ্রিল আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় সমবেত হন। বৈদ্যনাথতলা ছিল মূলত একটি আমবাগান। আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠনের পর এটির নাম পরিবর্তন করে মুজিবনগর রাখা হয়। অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করার জন্য গঠিত সংগ্রাম কমিটি, প্রতিবেশী দেশ ভারতের নিরাপত্তা বাহিনীর সহযোগিতায় শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে দেশি-বিদেশি সাংবাদিকেরা উপস্থিত ছিলেন। সে কারণে বাঙালি জাতির জন্য মুজিবনগর আম্রকানন অতি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থান। সেই সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপরাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে মুজিবনগর সরকার গঠন করা হয়। এম এ জি ওসমানীকে সরকারের প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করা হয়। মুজিবনগরে তৎকালীন সাবডিভিশনাল পুলিশ কর্মকর্তা মাহবুব উদ্দিন আহমদ, বীর বিক্রমের নেতৃত্বে ১২ জন আনসার সদস্য বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন। এই অস্থায়ী সরকারের নেতৃত্বে ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জিত হয়।

১৯৮৭ সালের ১৭ এপ্রিল উদ্বোধন করা হয় মুজিবনগর স্মৃতিসৌধের। ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এ স্থানকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলতে ১৯৯৬ সালে ওই স্থানে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্স স্থাপন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। স্মৃতি কমপ্লেক্সে একটি মানচিত্রের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন সেক্টরকে দেখানো হয়েছিল। কমপ্লেক্সে মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাবলির স্মারক ম্যুরাল স্থাপন করা হয়েছিল।

প্রসঙ্গত, সরকার পতনের দিন ঢাকায় দুবৃর্ত্তরা আগুন দিয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িতে। পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে জনপ্রিয় গায়ক রাহুল আনন্দ’র বাড়ি। ধ্বংস করা হয়েছে তার সব বাদ্যযন্ত্র। ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর করা হয়েছে বিভিন্ন ভাস্কর্য। রাজশাহীতে ভাঙচুর করা হয়েছে “স্টার সিনেপ্লেক্স”র একটি শাখা। ঢাকায় বিভিন্ন নাট্যদলের স্থাপনায় হামলা হয়েছে, ভাঙচুর করা হয়েছে ময়মনসিংহের ঐতিহ্যবাহী শশীলজ। বাংলাদেশ শিশু একাডেমিতে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করার হয়েছে। হামলা চালানো হয়েছে দেশের ২২টি শিল্পকলা একাডেমিতে। ময়মনসিংহে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের আবক্ষ ভাস্কর্য ভাঙচুর করা হয়েছে।

   

About

Popular Links

x