বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবনের তৃতীয় বাঘ জরিপের ফলাফল গত ৮ অক্টোবর ঘোষণা করা হয়। এতে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ১২৫টি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়াও ২১টি বাঘের বাচ্চা (বাঘ শাবক) থাকলেও তা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ঘোষণার আওতায় আনা হয়নি। ২০১৮ সালের দ্বিতীয় জরিপে বাঘের সংখ্যা ছিল ১১৪টি। ২০১৮ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সুন্দরবনের ভেতর থেকে ৯টি মৃত বাঘ উদ্ধার হয়েছে এবং ২টি বাঘের চামড়া উদ্ধার করা হয়েছে। তবে কতটি বাঘের জন্ম হয়েছে, তার পরিসংখ্যান পাওয়া কঠিন।
তৃতীয় বাঘ জরিপের তথ্য নিয়ে প্রকাশিত স্ট্যাটাস অব টাইগার ইন দ্য সুন্দরবন অব বাংলাদেশ প্রকাশনা থেকে জানা যায়, ৬০৫টি ক্যামেরা ব্যবহার করে তিন ভাগে ৩১৮ দিনে স্যাম্পল সংগ্রহ করা হয়েছে। সংগৃহীত ৩১১৪৮টি ছবির মধ্যে বাঘের ছবি ৭২৯৭টি। বাঘের ছবি ৩৬৮টি ক্যামেরা স্টেশন থেকে পাওয়া গেছে। এতে দেখা গেছে পূর্ণ বয়সী বাঘের সংখ্যা ৮৪টি, যার মধ্যে পুরুষ ২১টি, মহিলা ৬২টি এবং জেন্ডার শনাক্তহীন ১টি। সর্বাধিক ৫০টি বাঘ চাঁদপাই ও শরনখোলা এলাকায় রয়েছে। খুলনায় ১৩টি এবং সাতক্ষীরায় ২১টি বাঘ শনাক্ত হয়েছে। বাঘের বাচ্চা ১৯টি, একটি কিশোর বাঘ এবং একটি প্রায় প্রাপ্তবয়স্ক রয়েছে। এছাড়া খাল জরিপের মাধ্যমে আরও ৪১টি পূর্ণ বয়সী বাঘ পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে এই জরিপে বাঘের সংখ্যা ১২৫টি।
ক্যামেরা ট্রাপিংয়ের স্যাম্পল এলাকা ২০১৫ সালের জরিপে ছিল ১২৬৫ কিলোমিটার, ২০১৮ সালের জরিপে ১৬৫৬ কিলোমিটার এবং ২০২৪ সালে ২২৪০ কিলোমিটার। ২০২৪ সালে উচ্চমানের ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়েছে, ফলে স্বাভাবিক রেঞ্জ ২২৪০ কিলোমিটার হলেও এর প্রভাব এলাকা ছিল ৩৭৭৪ কিলোমিটার।
২০১৮ সালের জরিপে বাঘ ছিল ১১৪টি। ৬ বছরে ৯টি মৃত বাঘ উদ্ধার ও ২টি বাঘের চামড়া উদ্ধার করা হয়েছে। সব মিলিয়ে ১১টি বাঘের মৃত্যু ঘটেছে। ১১৪ থেকে ১১ কমে বাঘের সংখ্যা দাঁড়ায় ১০৩টি। আর ২০২৪ সালের জরিপে বাঘের সংখ্যা ১২৫টি পাওয়া গেছে। এ হিসেবে বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ২২টি। ২০১৮ সালের জরিপের পর জন্ম নেয়া এডাল্ট বাঘ গণনায় আসছে, তবে পূর্ণ বয়সী মৃত বাঘের পরিসংখ্যান হিসেবে গ্রহণ করা হয়নি।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বাঘ জরিপের জন্য সুন্দরবনে গাছের সঙ্গে মাটি থেকে ৫০ সেন্টিমিটার ওপরে ক্যামেরা স্থাপন করা হয়। ক্যামেরার সামনে দিয়ে কোনো বাঘ বা অন্য যেকোনো প্রাণী গেলে ক্যামেরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেটির ছবি ও ১০ সেকেন্ডের ভিডিও ধারণ করে। এরপর ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ে পাওয়া ছবি বন অধিদপ্তরের রিসোর্স ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ইউনিটে বিশ্লেষণ করে বাঘের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়। সুন্দরবনের খালে সাধারণত সব বাঘ পানি খেতে আসে, এতে খালের পাড়ে বাঘের পায়ের ছাপ পড়ে। বাঘের ধরন অনুযায়ী ওই ছাপ ভিন্ন হয়, ফলে পায়ের ছাপ দেখেও বাঘের সংখ্যা গণনা করা যায়।
বন বিভাগের তথ্যে জানা যায়, সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশের আয়তন ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে বনভূমি ৪ হাজার ৮৩২ এবং জলাভূমি ১ হাজার ১৮৫ বর্গকিলোমিটার। ২০১৫ সালের বাঘশুমারির অনুযায়ী, সুন্দরবনে বাঘ ছিল ১০৬টি এবং ২০১৮ সালের শুমারির তথ্য অনুযায়ী, বাঘের সংখ্যা ছিল ১১৪।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৩০ এপ্রিল বিকেলে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের জোংড়া খাল থেকে একটি বাঘের মরদেহ উদ্ধার হয়। ২০২৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি রাতে শরণখোলা রেঞ্জের কচিখালী টাইগার পয়েন্ট এলাকার একটি খালপাড়ে শ্বাসমূলের মাঝে পড়ে থাকা একটি বাঘের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুরুষ ওই বাঘটি ছিল ৯ ফুট দৈর্ঘ্যের এবং ২৫৫ কেজি ওজনের, বয়স আনুমানিক ১৫ বছর।
সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, “কয়েক বছর ধরে সুন্দরবনে বাঘের দেখা বেশি মিলছে। বনে আগের তুলনায় বাঘের প্রজনন বেড়েছে, সেই সঙ্গে মৃত্যুর সংখ্যাও কমেছে।”
সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. আবু নাসের মোহসীন হোসেন বলেন, “ক্যামেরায় একেকটি বাঘের শতাধিক ছবিও ওঠে। সেসব ছবি সংগ্রহের পর কম্পিউটারের সফটওয়্যারে প্রতিটি বাঘের আলাদা করে তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করেই জানা যায়, সুন্দরবনে ঠিক কতগুলো বাঘ আছে। ”
খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক (সিএফ) মিহির কুমার দে বলেন, “সামগ্রিক সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনার কারণে সুন্দরবনে আগের তুলনায় বাঘের সংখ্যা বেড়েছে। জরিপে দেখা গেছে, বনে বাঘের প্রধান শিকার চিত্রা হরিণ ও বন্য শূকরের সংখ্যাও বেড়েছে। খাবারের সংকট না থাকায় বাঘের লোকালয়ে হানা দেওয়া কমেছে। এছাড়া ঝড়, বন্যা ও জলোচ্ছ্বাস থেকে বাঘকে রক্ষার জন্য বাঘের কেল্লা নির্মাণ করা হচ্ছে সুন্দরবনে।”
স্বাধীনতার পর ১৯৭৫ সালের জরিপে সুন্দরবনে বাঘ ছিল ৩৫০টি। এরপর ১৯৮২ সালে জরিপে ৪২৫টি বাঘ ছির। ১৯৮৪ সালে সুন্দরবন দক্ষিণ বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের ১১০ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় জরপি চালিয়ে ৪৩০ থেকে ৪৫০টি বাঘ থাকার কথা জানানো হয়। ১৯৯২ সালে ৩৫৯টি বাঘ থাকার তথ্য জানায় বন বিভাগ। ১৯৯৩ সালে সুন্দরবনরে ৩৫০ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় প্যাগমার্ক পদ্ধতিতে জরিপ চালিয়ে ধন বাহাদুর তামাং ৩৬২টি বাঘ রয়েছে বলে জানান। ২০০৪ সালে জরিপে বাঘরে সংখ্যা বলা হয় ৪৪০টি। ১৯৯৬-৯৭ সালের জরিপে বাঘের সংখ্যা উল্লেখ করা হয় ৩৫০টি থেকে ৪০০টি। ওই সময়ে বাঘের পায়ের ছাপ পদ্ধতিতে গণনা করা হয়। ২০১৫ সালের প্রথম ক্যামেরা ট্রাপিং জরিপে সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে বাঘের সংখ্যা দাড়ায় ১০৬টি। ২০১৮ সালের ২য় ক্যামেরা ট্রাপিং হয়। এ বাঘ জরিপে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ১১৪টি। সুন্দরবন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ৫০টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে স্বাভাবিকভাবে মারা গেছে ১০টি। ১৪টি বাঘ পিটিয়ে মেরেছে স্থানীয় জনতা। একটি মারা গেছে ২০০৭ সালের সুপার সাইক্লোন সিডরে। বাকী ২৫ বাঘ হত্যা করেছে শিকারীরা।



৬ বছরে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বেড়েছে ১১টি