Tuesday, July 07, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

এক কোডেই সব পেমেন্ট: ‘বাংলা কিউআর’ বাস্তবায়নে নানা চ্যালেঞ্জ

ভবিষ্যতে সব ধরনের সরকারি পেমেন্ট সেবাকেও এই কিউআর কোডের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে

আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২৬, ০৪:০৭ পিএম

পহেলা জুলাই থেকে দেশের সব বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও মার্চেন্ট পয়েন্টে পুরোনো সব কিউআর কোড সরিয়ে কেবল একটি সর্বজনীন ‘বাংলা কিউআর’ প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

আগে যেখানে একটা দোকানের ক্যাশ কাউন্টারে চার-পাঁচটা কিউআর কোড ঝুলে থাকতো যেমন: বিকাশের আলাদা, নগদের আলাদা, রকেটের কিংবা নির্দিষ্ট কোনো ব্যাংকের আলাদা - সেখানে এখন থাকবে কেবল একটিই কোড। আপনার ফোনে যে ব্যাংকের বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের অ্যাপই থাক না কেন, এই একটি কোড স্ক্যান করেই পেমেন্ট করা যাবে।

বিবিসির প্রতিবেদনে এ সংক্রান্ত বিশ্লেষণমূলক তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। 

সহজ ও আধুনিক এই ব্যবস্থার পেছনে এখন সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি ‘১% ফি’। সাধারণ গ্রাহক থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী - সবার মনেই প্রশ্ন: ডিজিটাল লেনদেনের এই খরচ শেষ পর্যন্ত কার পকেট থেকে যাবে?

১ শতাংশের হিসাব

ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা পরিচালনা ও এর সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ব্যাংকগুলো একটি পরিচালনা খরচ চার্জ করে, যাকে আর্থিক ভাষায় বলা হয় ‘মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট’ বা এমডিআর ।

২০২৪ সালে যখন প্রথম এই বাংলা কিউআর চালুর পরিকল্পনা করা হয়, তখন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কথা চিন্তা করে কার্ডের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ০.৫০% এবং এমএফএস-এর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ০.৮০% ফি নির্ধারণের কথা ভাবা হয়েছিল। কিন্তু ১লা জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংকের চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপনে এই ‘ঊর্ধ্বসীমা’ তুলে দিয়ে সর্বনিম্ন হার ১% বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এর মানে, প্রতি ১,০০০ টাকার কেনাকাটায় নিয়ম অনুযায়ী একজন ব্যবসায়ী ব্যাংককে কমপক্ষে ১০ টাকা ফি দেবেন।

গ্রাহকদের মনে প্রশ্ন - ১,০০০ টাকার জিনিস কিনলে কি তবে ১,০১০ টাকা কাটবে? 

বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে - না। এই ফি সম্পূর্ণভাবে ব্যাংক এবং ব্যবসায়ীর মধ্যকার বিষয়। গ্রাহকের পকেট থেকে এই ১% বা বাড়তি কোনো টাকা নেওয়ার আইনগত কোনো সুযোগই নেই।

অবশ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক্ষেত্রে কিছুটা নমনীয়তার সুযোগও রেখেছে। ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো চাইলে নিজেদের প্রচারণার স্বার্থে এই ফি আংশিক কমাতে পারে বা সম্পূর্ণ মওকুফ করে নিজেরা বহন করতে পারে। তবে সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, এই ব্যয়ের দায় পুরোটাই মার্চেন্ট বা বিক্রেতার।

অর্থনীতিবিদদের শঙ্কা: পরোক্ষ প্রভাব পড়বে কি ক্রেতার ওপর?

কাগজে-কলমে গ্রাহক সুরক্ষিত হলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র এবং মানুষের মনস্তত্ত্ব কিছুটা ভিন্ন। অনেক ছোট ব্যবসায়ী বা অনলাইন পেজে কেনাকাটার ক্ষেত্রে ক্রেডিট কার্ডে পেমেন্ট করতে গেলে এখনো ২ থেকে ৩% বাড়তি চার্জ দাবি করার অভিযোগ রয়েছে।

এই ১% ফি-র কারণে ছোট ব্যবসায়ীরা চাপ অনুভব করতে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ - এর গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বিবিসি বাংলাকে বলেন, “শুরুতেই একে রাজস্ব আয়ের উৎস হিসেবে না ভেবে সবাইকে ডিজিটাল লেনদেনে উৎসাহিত করা প্রয়োজন ছিল।” তার মতে:

“এমডিআর এক শতাংশের জায়গায় দশমিক পাঁচ শতাংশ (০.৫%) করা যেতে পারে। তার মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের আকৃষ্ট করা গেলে সেটি করা উচিত। রাজস্ব কালেকশনের থেকেও আসলে ইন্টিগ্রেশনটা (সবাইকে এই ব্যবস্থায় যুক্ত করা) বেশি জরুরি।” 

অর্থনীতিবিদদের বড় ভয় হলো, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা যদি নিজেদের লাভ থেকে এই ১% ছাড়তে না চান, তবে তারা ডিজিটাল পেমেন্ট নিতে অনীহা দেখাবেন এবং গ্রাহককে নগদ টাকায় লেনদেন করতে বাধ্য করবেন। অথবা, তারা পণ্যের দামই ১% বাড়িয়ে দিয়ে খরচটি পরোক্ষভাবে সাধারণ ক্রেতার কাঁধেই চাপিয়ে দেবেন।

মাঠপর্যায়ের আরও কিছু বড় চ্যালেঞ্জ

শুধু ফি-র ব্যবস্থাপনাই নয়, বাংলা কিউআর পুরোপুরি সফল করতে মাঠপর্যায়ে বেশ কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জ রয়েছে:

ইন্টারনেট ও প্রযুক্তিগত নির্ভরশীলতা: কিউআর কোড ব্যবহারের জন্য নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ জরুরি। যদিও সরকার ইন্টারনেট ছাড়াও এই লেনদেন করা যায় কি না তা নিয়ে কাজ করছে, তবে বর্তমানে এটি একটি বড় বাধা।

ক্যাশিং বা টাকা তোলার জটিলতা: বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির নেতা হেলাল উদ্দিন বিবিসি বাংলাকে জানান, একদম ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য কিউআর কোডের মাধ্যমে টাকা নেওয়ার পর সেই উপার্জিত অর্থ দ্রুত হাতে বা ক্যাশে পাওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা জটিলতা রয়েছে। এই প্রক্রিয়া সহজ না হলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা আগ্রহ হারাবেন।

করের ভয়: অনেক ব্যবসায়ীর মনে শঙ্কা রয়েছে যে, সব লেনদেন ডিজিটাল এবং ডকুমেন্টেড হয়ে গেলে পরবর্তীতে তাদের ওপর সরকারের করের বোঝা চেপে বসতে পারে।

ব্যাংক খাতে আস্থা সংকট: দেশের ব্যাংকিং খাতে বিদ্যমান নানা জটিলতা ও আস্থা সংকট দূর করা না গেলে সাধারণ মানুষকে পুরোপুরি ডিজিটাল ব্যবস্থায় আনা কঠিন হবে।

চ্যালেঞ্জ থাকলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মানুষের অভ্যাস পরিবর্তনে কিছুটা সময় লাগলেও দিনশেষে এই ব্যবস্থা সবার জন্যই কল্যাণ বয়ে আনবে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক ড. শাহ মো. আহসান হাবীবের মতে, একটা সময় মানুষ ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারেও ভয় পেত, ব্যবসায়ীরা নিতে চাইত না। কিন্তু আজ ক্রেডিট কার্ডে পেমেন্ট করলে উল্টো ডিসকাউন্ট বা অফার পাওয়া যায়।

ডিজিটাল ট্রানজেকশনের ক্ষেত্রে বেশ কিছু যুক্তি দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা:

বিক্রি বৃদ্ধি: ডিজিটাল পেমেন্ট সহজ হলে দোকানে বিক্রি বাড়ে। আর বিক্রি বাড়লে ১% খরচকে ব্যবসায়ীদের কাছে বড় মনে হবে না।

পরিচালন খরচ ও ঝুঁকি হ্রাস: নগদ টাকা গোনা, ছেঁড়া বা জাল নোটের ভয় এবং দিনশেষে দোকান থেকে বাড়ি ফেরার পথে টাকা ছিনতাই বা চুরির ঝুঁকি একবারে শূন্য হয়ে যাবে।

সহজে লোন পাওয়ার সুযোগ: বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, কিউআর কোডের মাধ্যমে লেনদেন করলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের একটি ‘ডিজিটাল আর্থিক পরিচিতি’ বা প্রোফাইল তৈরি হবে। এর ওপর ভিত্তি করে ভবিষ্যতে কোনো জামানত ছাড়াই ব্যাংক থেকে সহজেই ঋণ পাবেন তারা।

লক্ষ্য ২০২৭: ক্যাশলেস ভবিষ্যতের দিকে

সরকারের লক্ষ্য ২০২৭ সালের মধ্যে দেশের মোট লেনদেনের ৭৫% ডিজিটাল বা ক্যাশলেস করা। ভবিষ্যতে সব ধরনের সরকারি পেমেন্ট সেবাকেও এই কিউআর কোডের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

‘বাংলা কিউআর’ নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আধুনিক ও গতিশীল করার একটি চমৎকার উদ্যোগ। তবে এর পূর্ণাঙ্গ সাফল্য নির্ভর করছে কঠোর নজরদারির ওপর - যাতে ব্যাংকের বেঁধে দেওয়া ১% - এর বোঝা কোনোভাবেই সাধারণ ক্রেতার পকেটকে হালকা করতে না পারে।

   

About

Popular Links

x