Friday, November 06, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

শ্রমিক অসন্তোষে চাপে সাভার-আশুলিয়ার পোশাকশিল্প, শিপমেন্ট নিয়ে শঙ্কা

সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা হারাতে পারে

আপডেট : ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ১০:০০ এএম

সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষ ও বিক্ষোভের জেরে কয়েক দিন ধরে ব্যাহত হয়েছে পোশাক কারখানার উৎপাদন। এতে একদিকে আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে নির্ধারিত সময়ে রপ্তানি পণ্য পাঠানো নিয়েও অনিশ্চয়তায় পড়েছেন শিল্পমালিকরা। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা হারানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

৩১ অক্টোবর থেকে ৫ নভেম্বর পর্যন্ত সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্তি ও ছাঁটাই বন্ধের দাবিতে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও রাবার বুলেট ব্যবহার করে।

শ্রমিক অসন্তোষের কারণে ৩১ অক্টোবর অন্তত ২৫টি কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। ২ নভেম্বর শিল্প পুলিশের হিসাবে প্রায় ৪০টি কারখানা বন্ধ ছিল। পরদিন ৩ নভেম্বর শতাধিক এবং ৪ নভেম্বর দুই শতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। ৫ নভেম্বর অধিকাংশ কারখানায় উৎপাদন শুরু হলেও এদিনও অন্তত ৭০টি পোশাক কারখানায় ছুটি ছিল।

সংঘর্ষে পুলিশের অন্তত ৫০ সদস্য আহত হন। আহতদের মধ্যে সহকারী পুলিশ সুপার শোয়েব আহম্মেদ ও সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রয়েছেন। শ্রমিকেরাও আহত হয়েছেন। এ ছাড়া ৪ নভেম্বর হেমায়েতপুরে সংবাদ সংগ্রহের সময় পাঁচ সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী হামলার শিকার হন।

কারখানায় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও হামলার ঘটনায় আশুলিয়া থানা ও সাভার মডেল থানায় মোট আটটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় অজ্ঞাতনামা সহস্রাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ৫ নভেম্বর শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার কথা জানায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে শ্রমিকদের মজুরি, নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশ নিয়ে অসন্তোষ এখনো রয়ে গেছে।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু মনে করেন, কয়েক দিনের উৎপাদন বন্ধ থাকায় রপ্তানি পণ্য নির্ধারিত সময়ে পাঠানো নিয়ে চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ডিসেম্বরের বড়দিন সামনে রেখে অক্টোবর ও নভেম্বরের মধ্যে অধিকাংশ রপ্তানি কার্যক্রম শেষ করার কথা থাকায় এ পরিস্থিতি মালিকদের জন্য বাড়তি উদ্বেগ তৈরি করেছে।

তিনি বলেন, “কারখানাগুলোতে কার্যকর ট্রেড ইউনিয়ন থাকলে শ্রমিকদের দাবি ও মজুরি বোর্ডের কার্যক্রম নিয়ে আগে থেকেই আলোচনা করা সম্ভব হতো। এতে শ্রমিকদের অসন্তোষ সহিংস পর্যায়ে যাওয়ার আগেই সমাধানের সুযোগ তৈরি হতো।” তার মতে, অবাধ ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার না থাকা, মালিকপক্ষ, শ্রমিকপক্ষ ও প্রশাসনের ব্যর্থতার কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়েছে।

খাইরুল মামুন মিন্টু আরও বলেন, “বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে ক্রয়াদেশ কমে আসা এবং দেশে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের মতো সমস্যার মধ্যে উৎপাদন ও শিপমেন্ট ব্যাহত হওয়ায় পোশাকশিল্পের সংকট আরও বাড়ছে। সময়মতো পণ্য রপ্তানি করতে না পারলে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি বিদেশি ক্রেতাদের আস্থাও কমতে পারে। তাই শ্রমিকদের দাবি আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করে শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক উৎপাদন পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।”

বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি রফিকুল ইসলাম সুজন শ্রমিক অসন্তোষের পেছনে শ্রম আইন বাস্তবায়ন না হওয়া এবং মজুরি বোর্ড গঠনে বিলম্বকে দায়ী করেছেন। তার অভিযোগ, মালিকদের রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি উপেক্ষিত হচ্ছে।

তিনি বলেন, “শ্রমিকেরা নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আন্দোলন চালানোর পরও দাবি আদায় না হওয়ায় মাঠে নামতে বাধ্য হয়েছেন। তবে আন্দোলনের মধ্যে কিছু সুবিধাবাদী ও স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি ভাঙচুর ও নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছেন।” এসব কর্মকাণ্ড শ্রমিকদের নয় বলে দাবি করেন তিনি।

রফিকুল ইসলাম সুজন জানান, ৩৫টি শ্রমিক ফেডারেশন মিলে মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০০ ডলার বা প্রায় ৩৬ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি জানিয়েছে। সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামোর বিষয়টিও তাদের দাবির ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

সাভারের ওডিসি ক্রাফট প্রাইভেট লিমিটেডের পরিচালক আবু বকর সিদ্দিক খান মনে করেন, শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্ব দিতে হবে। বাড়িভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে থাকলে বেতন বৃদ্ধির সুফল শ্রমিকেরা পুরোপুরি পাবেন না।

তিনি বলেন, “একজন নতুন শ্রমিকের মূল বেতন সাড়ে সাত হাজার টাকা হলেও বাধ্যতামূলক দুই ঘণ্টা ওভারটাইমসহ মাস শেষে তিনি ১৭ থেকে ১৮ হাজার টাকা পান। এর সঙ্গে হাজিরা বোনাসও যুক্ত হয়।” তবে শ্রমিকদের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

আবু বকর সিদ্দিক খান আরও বলেন, “কারখানা বন্ধ থাকলে উৎপাদন না হলেও শ্রমিকদের বেতনসহ অন্যান্য খরচ বহন করতে হয়। সাধারণত ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর ৯০ দিনের মধ্যে পণ্য তৈরি ও রপ্তানির চাপ থাকে। এর মধ্যে আট দিন কারখানা বন্ধ থাকলে উৎপাদন ও শিপমেন্টের সময়সূচিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়। এতে ব্যবসায়িক ক্ষতির পাশাপাশি ক্রেতাদের আস্থা কমে যাওয়ার ঝুঁকিও থাকে।”

আশুলিয়ার প্রিজন সোয়েটারের পরিচালক গোলাম মুর্তুজা মনে করেন, শ্রমিক অসন্তোষের কারণে উৎপাদন বন্ধ থাকলে নির্ধারিত সময়ে পণ্য পাঠানো কঠিন হয়ে পড়ে। কোনো পণ্য আকাশপথে পাঠাতে না পারলে কিংবা ক্রয়াদেশ বাতিল হলে বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি হতে পারে। তার ভাষ্য, একটি পণ্য এয়ার শিপমেন্ট করতে না পারলে কিংবা অর্ডার বাতিল হলে ন্যূনতম দুই কোটি টাকার ক্ষতি হতে পারে।

অন্যদিকে, বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, “উৎপাদন বন্ধ থাকার ক্ষতি শুধু দৈনিক উৎপাদন বা রপ্তানির অঙ্ক দিয়ে বিবেচনা করা যথেষ্ট নয়। এর প্রভাব পড়ে সরবরাহব্যবস্থা, ক্রয়াদেশ এবং পণ্য সরবরাহের সময়সূচিতে। দেরিতে পণ্য পাঠাতে হলে অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতাদের ছাড় দিতে হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে শিল্পের জন্য নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করতে পারে।”

সব মিলিয়ে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি পূরণ, জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং স্বাভাবিক উৎপাদন পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সরকার, মালিক ও শ্রমিক সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

   

About

Popular Links

x