Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

মিষ্টি চিনি কেন ঝাঁজালো হয়ে উঠছে

খুচরা বাজারে খোলা চিনি কিছুটা পাওয়া গেলেও প্যাকেটজাত চিনি একরকম হারিয়েই গেছে বলা যায়

আপডেট : ০৫ মে ২০২৩, ১১:৫৫ এএম

গত ৬ এপ্রিল সরকার চিনির সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে দেয়। তবে গত কয়েক মাস ধরেই দেশের চিনির বাজার অত্যন্ত অস্থিতিশীল। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তালিকায় থাকা চিনি বর্তমানে কেজিপ্রতি ১৪০-১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

খুচরা বাজারে চিনির তীব্র ঘাটতি রয়েছে। খোলা চিনি কিছুটা পাওয়া গেলেও প্যাকেটজাত চিনি বাজার থেকে হারিয়েই গেছে বলা যায়। এমনকি অনেক খুচরা বিক্রেতাও প্যাকেটজাত চিনি বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছে।

এর আগে, সরকার খোলা চিনির দাম কেজিপ্রতি ১০৭ টাকা থেকে ১০৪ টাকা এবং প্যাকেটজাত চিনির দাম কেজিতে ১১২ টাকা থেকে কমিয়ে ১০৯ টাকা নির্ধারণ করে। রমজানের আগে চিনির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে গত ফেব্রুয়ারিতে চিনি আমদানিতে ৫-২৫% শুল্ক কমানোর পর দামের সমন্বয় হয়েছিল।

আমদানি শুল্ক কমলেও চিনির বাজার এখনও অস্থিতিশীল রয়েছে। ঢাকার কারওয়ান বাজারে সরেজমিনে গিয়ে চিনির অপর্যাপ্ত সরবরাহের চিত্র দেখা যায়। খুব কমসংখ্যক দোকানে খোলা চিনি ছিল। আর প্যাকেটজাত চিনি দেখাই যায়নি।

চিনি না থাকার কারণ জানতে চাইলে কারওয়ান বাজারের মায়ের দোয়া ট্রেডার্সের বিক্রেতা বাবলু বলেন, “ডিলাররা চিনি দেয় না। তারা বলে মিল গেটে চিনি নেই। তবে তাদের মধ্যে কেউ কেউ টাকার রশিদ ছাড়াই খোলা চিনি দেয়।” 

ক্রয় রশিদ ছাড়া চিনি রাখা আরও বিপজ্জনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, “গণমাধ্যম বা ভোক্তা অধিকার কর্তৃপক্ষ চিনি কেনার প্রমাণ দেখতে চাইলে আমি দামের বিপরীতে কোনো বৈধ কাগজ দেখাতে পারি না। তাই আমি দোকানে চিনি রাখছি না।”

কারওয়ান বাজারের আল আমিন ট্রেডার্স, জব্বার ট্রেডার্স, চাঁদপুর ট্রেডার্স এবং সালমান ট্রেডার্সের কর্তৃপক্ষ জানায়, তারাও একই ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন।

জব্বার ট্রেডার্সের একজন বিক্রয়কর্মী বলেন, এক বস্তা চিনির (৫০ কেজি ব্যাগ) জন্য ৬,৪০০ থেকে ৬,৬০০ টাকা দিতে হয়। অর্থাৎ ক্রয় মূল্য দাঁড়ায় ১২৮-১৩২ টাকা, যেখানে সরকার নির্ধারিত মূল্য ১০৭ টাকা। এ পরিস্থিতি ঘন ঘন সমস্যা সৃষ্টি করছে। তাই আমরা একদমই চিনি বিক্রি করি না।

চিনির বাজারের অস্থিরতার পেছনে কী আছে?

খুচরা বিক্রেতারা জানান, দেশের চিনির বাজারে দাম নির্ধারণে বেসরকারি খাত প্রভাব বিস্তার করছে এবং তারা নতুন সংকট তৈরি করেছে। অন্যদিকে, পাইকারি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, পরিশোধনকারীরা চিনি মজুত করে দাম বাড়াচ্ছে।

মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি বশির উদ্দিন জানান, পাইকারি বিক্রেতাদের কাছে সরবরাহ খুবই সীমিত হওয়ায় চিনির বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে।

চিনি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মফিজুল হক ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, শোধনাগার থেকে ব্যবসায়ীদের ১২৮-১৩২ টাকায় চিনি কিনতে হচ্ছে। তাহলে আমরা কীভাবে কম দামে চিনি বিক্রি করব? এছাড়া, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির জন্য তিনি আন্তর্জাতিক বাজার ও বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকেও দায়ী করেন।

তবে খুচরা বিক্রেতাদের অভিযোগ অস্বীকার করে শোধনাকারীরা জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির সরবরাহ কমেছে এবং ভারত, ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার মতো বেশ কয়েকটি রপ্তানিকারক দেশে উৎপাদন কম হওয়ার আশঙ্কায় দামও ৪০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে।

এদিকে, বিশ্ববাজারে চিনির দামের প্রভাব পড়েছে দেশের বাজারেও। দেশবন্ধু গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বাংলাদেশ সুগার রিফাইনার অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব গোলাম রহমান মঙ্গলবার (২ মে) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠান।

তিনি বলেন, গত মাসে চিনির আন্তর্জাতিক মূল্য টনপ্রতি ৫২০ ডলার থেকে বেড়ে ৬৭৫ ডলারে উন্নীত হলেও দেশীয় বাজারে খোলা চিনির দাম আনুপাতিক হারে বাড়েনি। আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দাম রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে। এ কারণে ব্যবসায়ীরা চিনি আমদানি নিয়ে দ্বিধায় পড়েছেন। অ্যাসোসিয়েশন অপরিশোধিত চিনি আমদানিতে গুরুত্বারোপের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারের হিসেবে, এক টন চিনির (এক হাজার কেজি) দাম মোটামুটি ৭১,৬১৪ টাকা। অর্থাৎ কেজিপ্রতি চিনির দাম ৭১ টাকা ৬১ পয়সা। আরোপিত ভ্যাট, কর এবং অন্যান্য শুল্কের কারণে পরিশোধকদের আরও অতিরিক্ত ২৫-৩০ টাকা খরচ হয়। অর্থাৎ প্রতি কেজি চিনির মূল্য ১০১-১০২ টাকা।

মোজাম্মেল হক নামের এক বেসরকারি চাকরিজীবী ও কারওয়ান বাজারের ক্রেতা বলেন, “সরকার নির্ধারিত চিনির মূল্য যথাযথভাবে বাড়ানো উচিত। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম দিন দিন অসহনীয় হয়ে উঠছে।”

ইন্টারন্যাশনাল সুগার অর্গানাইজেশন (আইএসও) তথ্যমতে, নভেম্বরে বিশ্ববাজারে চিনির দাম কেজিপ্রতি ছিল ০.৫৩-০.৫৯ ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় ৫৬-৭৩ টাকা) ছিল। গত ২৭ এপ্রিল সেই দাম কেজিতে ০.৬৮-০.৭১ ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় ৭২-৭৫ টাকা) পর্যন্ত বেড়েছে। অর্থাৎ গত পাঁচ মাসে চিনির দাম ২২% বেড়েছে।

ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বরে বাংলাদেশে চিনির দাম কেজিপ্রতি ১০৫ টাকা ছিল। গত ৩ মে সেটি ১৪০-১৫০ টাকায় দাঁড়িয়েছে, যার অর্থ গত পাঁচ মাসে চিনির দাম ২৫-৪২% বেড়েছে। গত বছরের ৩ মে কেজিপ্রতি চিনির দাম ছিল ৭৮ টাকা। অর্থাৎ এক বছরে চিনির দাম কেজিতে ৭০% এর বেশি বেড়েছে।

বাংলাদেশে চিনির বার্ষিক চাহিদা প্রায় ২৫ লাখ টন এবং সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে বার্ষিক উৎপাদন প্রায় এক লাখ টন। একবার ১৫টি সরকারি চিনিকলে চিনির বার্ষিক অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ছিল প্রায় দেড় থেকে দুই লাখ টন। তবে গত দুই বছর ধরে পঞ্চগড়, সেতাবগঞ্জ, শ্যামপুর, রংপুর, পাবনা ও কুষ্টিয়ায় ছয়টি চিনিকল বন্ধ রয়েছে। এতে চিনির বার্ষিক উৎপাদন ২৫-৩০ হাজার টনে নেমে এসেছে।

   

About

Popular Links

x