Wednesday, July 22, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

বাংলাদেশেই হচ্ছে ‘কোকোয়া’, বদলে যাবে চকলেট-প্রসাধনীর বাজার

  • দেশে কোকোয়ার বাজার এখন পর্যন্ত পুরোপুরি আমদানি-নির্ভর
  • দামি এই ফলটি চাষের জন্য উপযোগী দেশের মাটি। ছাদবাগানেও লাগানো যায় গাছ
  • পূর্ণবয়স্ক একটি কোকোয়া গাছ থেকে বছরে ৩৫ কেজি ফল পাওয়া যায়
আপডেট : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৫:০৯ পিএম

চকলেট। শিশু থেকে বুড়ো প্রায় সবার পছন্দের এক খাবার। খাবারটির মূল উপাদান হলো ‘‘কোকোয়া’’ নামে এক ধরনের ফল। দক্ষিণ আমেরিকার অ্যামাজন বনভূমি এর আদিনিবাস। তবে আফ্রিকা মহাদেশেও এটির চাষ হয় ব্যাপক পরিসরে। অ্যামাজন অথবা আফ্রিকা- সুদূর পথ ঘরে কোকোয়া আসে এ অঞ্চলে। ফলে দেশে চকলেটের বড় বাজার থাকলেও দাম সবার হাতের নাগালে নেই।

কারণ, দেশে কোকোয়ার বাজার পুরোপুরি আমদানি-নির্ভর। আশার কথা হলো পরীক্ষামূলকভাবে ফলটির চাষ শুরু হয়েছে বাংলাদেশে। মিলেছে ইতিবাচক ফলাফলও। দেশে এটির উৎপাদন বাড়লে আয়ের বড় পথ উন্মোচন হতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

মূলত অ্যাসিডিক বা অম্লীয় মাটিতেই ফলটির ফলন ভালো হয়। ঢাকার সাভার এবং পাহাড়ি অঞ্চলের পাশাপাশি বহু অঞ্চলে রয়েছে এমন মাটি। ২০১৪ সালে গবেষণার জন্য ভিয়েতনাম থেকে আনা হয়েছিল কয়েকটি কোকোয়া চারা। সাভারের রাজালাখ এলাকায় সরকারি হর্টিকালচার সেন্টারে রোপন করা হয় এর কয়েকটি। এর মধ্যে দুটি গাছ বেড়ে উঠেছে। দিচ্ছে ফলও। ফল থেকে চারাও উৎপাদন করেছে হর্টিকালচার সেন্টার।

দেশে এ চাষের উপযোগিতা থাকায় কৃষকরাও লাভবান হতে পারেন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগেও কোকোয়া ফলের অস্তিত্বের তথ্য পাওয়া যায়। অ্যামাজন থেকে পৃথিবীর নানা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এই ফল। আফ্রিকার আইভরি কোস্ট, ঘানা, নাইজেরিয়া ও ক্যামেরুনে ব্যাপকভাবে চাষ হয় কোকোয়া। সেখান থেকে বিশ্বজুড়ে রপ্তানি করা হয়। বর্তমানে এশিয়ার কিছু দেশেও এটি চাষ বাড়ছে। এসেছে বাংলাদেশেও।

দেশের কোথায় আছে কোকোয়া গাছ

সম্প্রতি সাভারের হর্টিকালচার সেন্টারে গিয়ে কোকোয়া ফলের দুটি পরিণত গাছ দেখতে পান ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদক। ঝোপালো ধরনের ৭-৮ মিটার উচ্চতার গাছ দুটিতে ধরে আছে ফুল থেকে শুরু করে পরিপক্ক অসংখ্য ফল।

এই ফলের ইতিহাস, রোপণ পদ্ধতি ও উপযোগিতাসহ নানা দিক ঢাকা ট্রিবিউনের কাছে তুলে ধরেন সংশ্লিষ্টরা।

সাভারের হর্টিকালচার সেন্টারের গাছে সদ্য ধরা কোকোয়া ফল/ঢাকা ট্রিবিউন

হর্টিকালচার সেন্টারের সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৪ সালে বাংলাদেশে এই ফলের চারা এনে রোপণ করা হয়। সাভারে দুটি গাছ রয়েছে। প্রায় ৩-৪ বছর ধরে গাছে ফুল ও ফল ধরছে।

চাষপদ্ধতি

কোকোয়া চাষের পদ্ধতির বিষয়ে হর্টিকালচার সেন্টারের উপ-সহকারী উদ্যান কর্মকর্তা দিলীপ চন্দ্র সরকার ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘কোকোয়া ফলের ভেতরে থাকা বীজ থেকে চারা উৎপাদন করা যায়। এছাড়া কলম পদ্ধতিতেও চারা করা যায়। রোপনের ৫-৬ বছর পর থেকে গাছে ফল ধরা শুরু করে। বছরে ৩-৪ বার ফলন হয়। ফলে সারা বছরই কমবেশি ফল পাওয়া যায়। এ ফলের গাছে তেমন কোনো রোগ হয় না বললেই চলে। দেশীয় ছাত্রাপোকা (মিলিবাগ) হলেও সেটি আপনা-আপনি প্রতিরোধ করে ফেলে।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘ফুল থেকে ফল হয়ে সেটি পাকতে সময় লাগে ৩-৪ মাস। পাকার পর কোনোটা ধূসর কোনোটা হলুদ রং ধারণ করে। ভেতরে ফল থাকে। খোসা ছাড়িয়ে ফল বের করতে হয়। পাকা ফল খাওয়া যায়। স্বাদ টকমিষ্টি। আবার ফল বের করে সেটিকে প্রক্রিয়াজাত করে চকলেটের পাউডার তৈরির জন্য প্রস্তুত করা যায়।’’

কোকোয়া থেকে কোকোবিন

কোকোয়া ফলের রং বাদামি। লম্বায় প্রায় ৩০ সেন্টিমিটার। পুরুত্ব ১০ সেন্টিমিটার, বাইরের আবরণ বেশ শক্ত। প্রতিটি ফলে ২০-৪০টি (ক্ষেত্রবিশেষে আরও বেশি) বীজ থাকে। বীজগুলো প্রথমে কলাপাতায় মুড়িয়ে গাঁজানো হয়। পরে তা রোদে শুকিয়ে সেদ্ধ করে খোসা ছাড়ালেই পরিষ্কার একটি শাঁস পাওয়া যায়। এই শাঁসকে বলা হয় কোকোবিন।

কোকোবিনের গুঁড়োই চকলেট পণ্য তৈরির কাজে ব্যবহৃত হয়। উৎকৃষ্টমানের চকলেট, মাখন, আইসক্রিম, রুটি, পুডিং, প্রসাধনী ও পানীয় তৈরিতে কোকোয়া ফল ব্যাপকহারে ব্যবহৃত হয়।

বদলে যেতে পারে বাজার

উপ-সহকারী উদ্যান কর্মকর্তা দিলীপ চন্দ্র সরকার আরও বলেন, ‘‘পূর্ণবয়স্ক একটি কোকোয়া গাছ থেকে বছরে ৩৫ কেজি ফল পাওয়া যায়। প্রক্রিয়াজাত করলে সেখান থেকে ৩০ কেজি চকলেট পাওয়া যাবে। প্রতি কেজি চকলেট পাউডারের দাম বর্তমানে প্রায় ৪০ ডলার। ওই হিসেবে একটি গাছ থেকে বছরে এক হাজার ডলারের বেশি আয় করা সম্ভব।’’

হর্টিকালচার সেন্টারের গাছে ধরে আছে ঝাঁকে ঝাঁকে পরিপক্ক কোকোয়া ফল/ঢাকা ট্রিবিউন

সাভারে এটি চাষ সম্ভব কীভাবে হলো জানতে চাইলে দিলীপ চন্দ্র বলেন, ‘‘চারা বেড়ে ওঠার জন্য অ্যাসিডিক বা অম্লীয় মাটির প্রয়োজন। সাভারের লাল মাটি এই গাছের চারা বেড়ে ওঠার উপযোগী। আমাদের এখানে গাছগুলো বেড়ে উঠেছে। এখন ফল দিচ্ছে। একইভাবে দেশের পাহাড়ি অঞ্চলের মাটিও উপযোগী। ছাদ বাগানেও কোকোয়া ফল চাষ করা যায়।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘দেশের পাহাড়ি অঞ্চলে অন্তত ৫-৭ লাখ হেক্টর অনাবাদী জমি রয়েছে। যেখানে এই গাছ চাষের উপযোগী মাটি রয়েছে। ভিটামিন ‘এ’, ‘বি’, ‘সি’, ‘ই’ এবং ‘কে’ সমৃদ্ধ এই ফলের চকলেট পাউডার শতভাগ বাংলাদেশকে বিদেশ থেকে আনতে হয়। দেশে এটির উৎপাদন বাড়লে আয়ের বড় পথ উন্মোচন হতে পারে।’’

এই ফলের চাষ বৃদ্ধিতে সরকারি উদ্যোগ রয়েছে কি-না জানতে চাইলে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘‘আমরা চারা উৎপাদন করছি। সেগুলো নামমাত্র মূল্যে ও বিনামূল্যে বিতরণ করা হচ্ছে। অনেকেই এটি চাষ করছেন। উৎসাহিত হচ্ছেন চাষে। এটির আরও প্রসারে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রকল্প প্রস্তাব জমা দেওয়া রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সবাই আন্তরিক।’’

   

About

Popular Links

x