বাংলাদেশে ১৬ বছর পর আবারও শুরু হচ্ছ পঞ্চম এবং অষ্টম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা। এবার মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরাও এই পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে। প্রাথমিকের (পঞ্চম শ্রেণি) বৃত্তি পরীক্ষার সম্ভব্য সময় বলা হয়েছে চলতি বছরের ২১ থেকে ২৪ ডিসেম্বর। আর চলতি বছরের ২১, ২২, ২৩, ২৪ ও ২৮ ডিসেম্বর মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতে পারে।
প্রস্তুতির অংশ হিসেবে প্রাথমিকের বৃত্তি পরীক্ষার বিষয় এবং নম্বর বণ্টনও প্রকাশ করেছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। তাতে বলা হয়েছে, মোট চারটি বিষয়ে প্রাথমিকের বৃত্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। বিষয়গুলো হলো- বাংলা ,ইংরেজি, গণিত, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় এবং প্রাথমিক বিজ্ঞান। প্রতিটি বিষয়ে ১০০ নম্বর করে ৪০০ নম্বরের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। প্রতিটি বিষয়ে পরীক্ষার সময় হবে দুই ঘণ্টা ৩০ মিনিট।
এই পরীক্ষায় কেবল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পিটিআই সংলগ্ন পরীক্ষণ বিদ্যালয়, রেজিস্টারভুক্ত স্বতন্ত্র প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো অংশ নেবে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও পিটিআই-সংলগ্ন পরীক্ষণ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য পরীক্ষায় অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
বেসরকারি ও কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষার্থীরা অংশ নিতে পারবে না। আর যেসব বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অংশ নিতে পারবে তাদের সব শিক্ষার্থীর জন্যও এটা উন্মুক্ত নয়। পঞ্চম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত সার্বোচ্চ ৪০% শিক্ষার্থী মূল্যায়নের ভিত্তিতে এই পরীক্ষায় অংশ নিতে পরবে।
এদিকে বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন মাদ্রাসাগুলোর অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের এ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হবে পাঁচটি বিষয়ের ওপর। পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবে পঞ্চম শ্রেণির সর্বোচ্চ ৪০% শিক্ষার্থী। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের আদেশে কুরআন মাজিদ ও আকাইদ-ফিকহ, আরবি (প্রথম ও দ্বিতীয় পত্র), বাংলা, ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞান-এই পাঁচ বিষয়ে মোট ৫০০ নাম্বারের পরীক্ষার কথা বলা হয়েছে।
মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের বাইরে থাকা কোনো মাদ্রাসার শিক্ষার্থী এই পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন না।
১৬ বছর পর বৃত্তি পরীক্ষা চালু করতে সরকারের সিদ্ধান্তের বিষয়ে নানামুখী আলোচনা শুরু হয়েছে।
অভিভাবক এবং শিক্ষাবিদদের কেউ বলছেন, বৃত্তি পরীক্ষার মাধ্যমে প্রতিযোগিতা এবং মেধার মূল্যায়নের বিষয়টি শিক্ষার্থীদের মান উন্নয়নে সহায়ক হবে। তাছাড়া বৃত্তি পরীক্ষার মাধ্যমে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গুরুত্বও বাড়বে বলেও ধারণা করছেন তারা। অপরদিকে কেউ কেউ বলছেন, এ ধরনের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক চাপ তৈরি করবে।
এই বিষয়ে সরকারের বক্তব্য জানতে চেয়ে শনিবার প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে চেষ্টা করেও কথা বলা যায়নি।
এদিকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের বৃত্তি পরীক্ষার অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেওয়ার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন স্কুল ও কলেজ ঐক্য পরিষদ। দাবি আদায়ে ইতোমধ্যে সরকারের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন তারা।
উল্লেখ্য, তার আগে ২০২২ সালেও বৃত্তি পরীক্ষা ফিরিয়ে আনার একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সমালোচনার মুখে সেসময় তা আর করা হয়নি। তখন দেশের ২৯ জন বিশিষ্ট নাগরিক ও শিক্ষাবিদ এর বিরুদ্ধে বিবৃতি দেন। তারা বলেন, “এই বৃত্তি পরীক্ষার কার্যক্রমে বৈষম্য আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া এই পরীক্ষা চালুর মাধ্যমে কোচিং বাণিজ্য ও গাইড বইয়ের দৌরাত্ম্য বাড়ারও আশঙ্কা রয়েছে।”
‘মেধার মূল্যায়ন দরকার’
রাজধানী ঢাকার বাসিন্দা অভিভাবক জেসমিন লিপি মনে করেন, বৃত্তি পরীক্ষা শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতার মানসিকতা তৈরি করবে যা শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজন। এই অভিভাবক বলেন, “আসলে প্রতিযোগিতা থাকা দরকার। মেধার মূল্যায়ন দরকার। বৃত্তি পরীক্ষা সেই সুযোগ করে দেবে।”
তার মতে, যারা ভালো ফলাফল করবে তাদের সুযোগ দেওয়া এবং স্বীকৃতি দেওয়া উচিত।
বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির একজন নেতাও বৃত্তি পরীক্ষা আবার চালু করার পক্ষে মত দিয়েছেন। তার যুক্তি, এই পরীক্ষার মাধ্যমে প্রতিযোগিতার মনোভাব তৈরির পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মেধার বিকাশ ঘটবে।
বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ শাসুদ্দিন মাসুদ বলেন, “আসলে বৃত্তি পরীক্ষা ফিরিয়ে আনা একটি ভালো উদ্যোগ। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতার মনোভাব তৈরি হবে। তাদের মেধার বিকাশ ঘটবে।”
অবশ্য এই পরীক্ষা চালুর পক্ষে একটি অর্থনৈতিক বিষয়ও দেখছেন তিনি। তার মতে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যারা পড়ে, তারা অধিকাংশই অসচ্ছল পরিবারের। বৃত্তি দেওয়ার মাধ্যমে তাদের আর্থিকভাবে সহায়তাও করা যাবে।” তাছাড়া বৃত্তি পরীক্ষার মাধ্যমে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গুরুত্ব বাড়বে এবং এর ফলে অনেক শিক্ষার্থী আবার এই ধরনের বিদ্যালয়ে ফিরে আসবে বলেও মনে করেন তিনি।
এক্ষেত্রে কোনো বৈষম্য তৈরির হচ্ছে কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আগে যখন বৃত্তি পরীক্ষা ছিল তখনও তো সবাই পরীক্ষা দিত না। ক্লাসের ভালো শিক্ষার্থীরা বৃত্তি পরীক্ষা দিত। তখন তো বৈষম্য বা মানসিক দেয়ালের প্রশ্ন উঠেনি। তাহলে এখন কেন উঠবে। তবে সরকার চাইলে এটা প্রাথমিকের সব শিক্ষার্থীর জন্য উন্মুক্ত করে দিতে পারে। তবে তখন তো সেটা আবার একটা পাবলিক পরীক্ষার মতো হয়ে যাবে। সেটা একটা সমস্যা। আর বেসরকারি স্কুলে তো বিত্তশালীদের ছেলেমেয়েরা পড়ে। তাদের জন্য তো বৃত্তি দরকার নাই।”
বৈষম্য আর কোচিং সেন্টারের দৌরাত্ম বাড়ার আশঙ্কা
ঢাকার আরেক অভিভাবক আসিফ সুমিত বৃত্তি পরীক্ষা চালুর বিষয়ে বিরোধিতা করে বলেন, “আসলে এটা বৈষম্যমূলক। একই সঙ্গে শিশুদের মধ্যে বাড়তি চাপ তৈরি করবে। এটা নিয়ে আবার সামাজিকভাবেও শিশুরা নানা প্রশ্নের মুখে পড়বে। আর এমনিতেই কোচিং সেন্টার বন্ধ করা যাচ্ছে না। এর ফলে আরও বাড়বে।”
তার মতে, সরকারের উচিত হবে সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করা। তার জন্য যাদের আর্থিক সক্ষমতা কম তাদের নানা ধরনের সহায়তা করা যায় বলে মনে করেন তিনি। সরকার এখন যেমন বিনামূল্যে বই দেয়, সরকারি প্রাথমিক অবৈতনিক। আরও এমন সহায়তা করা যায় বলে মত দেন এই অভিভাবক।
এদিকে বৃত্তি পরীক্ষা চালু করার বিষয়টিকে “অহেতুক” বলে মনে করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান অবশ্য। তার মতে, বৃত্তির সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের বিষয় জড়িত থাকায় শিক্ষা প্রশাসনের কেউ কেউ কেউ বেশি আগ্রহী।
তিনি বলেন, “এই ধরনের বৃত্তি পরীক্ষার কোনো প্রয়োজন নাই। এটা অহেতুক করা হচ্ছে। প্রয়োজন হচ্ছে শিক্ষার মান উন্নয়ন করা। সেটার জন্য কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে এসব করা হচ্ছে। এর ভিতরে আর্থিক লেনদেনের বিষয় থাকায় শিক্ষা প্রশাসনের কেউ কেউ এটা নিয়ে অতি আগ্রহী।”
তার মতে, “এটা সরকারি বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষার মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি ছাড়াও শিশুদের মধ্যে নতুন মানসিক চাপ তৈরি করবে। একটা পার্থক্য তৈরি হবে। কারও মধ্যে হীনমন্যতা তৈরি হবে। শিশুদের এসবের বাইরে রেখে ভালো শিক্ষাব্যবস্থা করা দরকার।”
তিনি বলেন, “আবার সরকারি প্রাথমিকের মধ্যেও বৈষম্য হবে। এক গ্রুপ শিক্ষার্থী পরীক্ষাই দিতে পারবে না। আবার যারা দিতে পারবে তাদের সবাই বৃত্তি পাবে না। তাদের শিক্ষা জীবনের শুরুতেই একটা বিভাজনের মধ্যে ফেলে দেওয়া হবে।”
তার কথা, “পাবলিক পরীক্ষায় ফার্স্ট, সেকেন্ডের পদ্ধতি তুলে দিয়ে গ্রেডিং পদ্ধতি হয়েছে শিক্ষায় বৈষম্য দূর করতে। বৃত্তি পরীক্ষা ফিরিয়ে আনলে আবার আমরা ফার্স্ট সেকেন্ডের যুগে ফিরে যাব। এটা ঠিক বলে মনে করি না। সরকার গরিব শিক্ষার্থীদের সহায়তা করতে চাইলে তার তো পদ্ধতি আছে। মেধাবীদের স্বীকৃতি দেওয়ারও পদ্ধতি আছে। সেটা তো বৃত্তি পরীক্ষার মাধ্যমে করার দরকার নাই।”
আর এই ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা কোচিং সেন্টারের দৌরাত্ম্য আরও বাড়িয়ে দেবে বলে মনে করেন তিনি।
সরকারি-বেসরকারি সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বৃত্তি পরীক্ষা চালুর দাবি
বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্য বলছে, দেশের প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৯৭% বেসরকারি। সেই হিসেবে, বৃত্তি পরীক্ষা চালুর এই উদ্যোগ শতকরা ৩% স্কুলের শিক্ষার্থীদের সুযোগ করে দিচ্ছে। এর কারণে বেসরকারি স্কুলগুলোর পক্ষ থেকে এরইমধ্যে সরকারের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে।
তাদের দাবি, বৃত্তি পরীক্ষা সব ধরনের প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য করতে হবে। আর সম্ভব হলে শিক্ষার্থীর জন্য জন্য উন্মুক্ত করতে হবে। তা-না হলে চরম বৈষম্য সৃষ্টি হবে বলে আশঙ্কা তাদের।
বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টের স্কুল ও কলেজ ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি এম ইকবাল বাহার চৌধুরী বলেন, “বাংলাদেশে ৫০ হাজার কিন্ডারগার্টেনে এক কোটি শিশু পড়াশোনা করে। তাদের বৃত্তি পরীক্ষার বাইরে রাখার তৎপরতা নতুন করে বৈষম্য সৃষ্টি করবে। এটা যারা করছেন তাদের ভিন্ন উদ্দেশ্য আছে। এটা সব ধরনের প্রতিষ্ঠান এবং সব শিক্ষার্থীর জন্য উন্মুক্ত করার দাবি আমাদের।”
তার কথা, “বৃত্তি শুধু গরিব ও মেধাবীদের জন্য নয়। এটা সবার জন্য। এটা মেধা যাচাইয়ের একটি পদ্ধতি। গরিব শিক্ষার্থীদের জন্য তো উপবৃত্তি চালু আছে। সেটা নিয়ে আমরা কোনো কথা বলছি না। আমরা প্রাথমিক শিক্ষার মহাপরিচালককে স্মারকলিপি দিয়েছি। আমরা মানববন্ধন করেছি। প্রয়োজনে আরও বড় আন্দোলনে যাব। সেখানে কিন্তু শিশুরা মাঠে নামবে। কারণ তাদের মানবাধিকার লঙ্ঘর করা হয়েছে।”



