ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের ভর্তিতে মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-নাতনি কোটা, শিক্ষক-কর্মকর্তাদের সন্তানদের পোষ্য কোটা এবং খেলোয়াড় কোটা বাতিলের জন্য আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন), উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) ও রেজিস্ট্রারকে এই নোটিশ পাঠানো হয়েছে।
মঙ্গলবার (৫ নভেম্বর) সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সোলায়মান তুষারসহ চার আইনজীবী ই-মেইলে এ নোটিশ পাঠান। বাকি ব্যক্তিরা হলেন ব্যারিস্টার মাহদী জামান (বনি), অ্যাডভোকেট বায়েজীদ হোসাইন ও অ্যাডভোকেট শাহেদ সিদ্দিকী।
নোটিশ পাওয়ার ৫ দিনের মধ্যে বীর মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনাদের সন্তানদের জন্য ৫%, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ১% এবং শারীরিক প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের জন্য ১% বহাল রেখে বাকি সব কোটা বাতিল করতে বলা হয়েছে। ৫ দিনের মধ্যে ব্যবস্থা না নিলে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়।
নোটিশে বলা হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাঙালি জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, শিক্ষক ও কর্মকর্তারা সব গণতান্ত্রিক ও অধিকার রক্ষার আন্দোলনে অবদান রেখেছেন। সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের কোটা সংস্কার আন্দোলন ও স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সরকারের পতন আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়।
নোটিশে আরও বলা হয়, একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি প্রক্রিয়া অবশ্যই মেধার ভিত্তিতে হতে হবে এবং অন্য কোনো মানদণ্ডে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি প্রক্রিয়া সাধারণত বৈষম্যমূলক, স্বেচ্ছাচারী এবং অযৌক্তিক, কোনো বৈধ রাষ্ট্রীয় উদ্দেশ্যের সঙ্গে কোনো যৌক্তিক সম্পর্ক নেই। নাতি-নাতনি কোটা সংবিধান ও সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরিপন্থী।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রেও এই রায় প্রয়োগ করতে হবে উল্লেখ করে বলা হয়, দেশের সর্বোচ্চ আদালত মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনাদের সন্তানদের জন্য সরকারি, আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে চাকরিতে মাত্র ৫% কোটা নির্ধারণ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রেও এই রায় প্রয়োগ করতে হবে। মুক্তিযোদ্ধার নাতি-নাতনি কোটায় ভর্তির সুযোগ সৃষ্টি করা সংবিধান ও সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরিপন্থী।
পোষ্য কোটা বৈষম্যমূলক উল্লেখ করে বলা হয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮ (০৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নারী বা শিশুদের অনুকূলে বা নাগরিকদের যেকোনো অনগ্রসর অংশের উন্নতির জন্য বিশেষ বিধান করা যেতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মচারীদের ছেলে-মেয়েরা সেই মানদণ্ড পূরণ না করা। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলে-মেয়ে, শিক্ষক ও কর্মচারীদের ভর্তি প্রক্রিয়ায় ওয়ার্ড/পোষ্য কোটায় ১ শতাংশ সংরক্ষণ করা বৈষম্যমূলক, স্বেচ্ছাচারী ও অযৌক্তিক, যার সঙ্গে কোনো যৌক্তিক সম্পর্ক নেই।
খেলোয়াড় কোটা বাতিলের দাবি জানিয়ে নোটিশে বলা হয়, খেলোয়াড়দের কোটায় ভর্তিতে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া খেলোয়াড়দের কোটা সংবিধানে সংজ্ঞায়িত পশ্চাৎপদ বিভাগের অধীনে পড়ে না। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি প্রক্রিয়ায় ক্রীড়াবিদদের জন্য বিশেষ কোটাও সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরিপন্থী। এছাড়া খেলোয়াড় কোটায় স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির সুযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সোলায়মান তুষার বলেন, “মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-নাতনিদের কোটায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তিতে সুযোগ রাখাটা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ের পরিপন্থী। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের জন্য পোষ্য কোটা সংরক্ষণ রাখাটা সরাসরি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।”
তিনি আরও বলেন, “খোলোয়াড় কোটায় স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির সুযোগ রয়েছে। এজন্য এসব কোটা বাতিলের জন্য নোটিশ দেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা না নিলে হাইকোর্টে রিট দায়েরসহ অন্যান্য আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
নাতি-নাতনি কোটা বাতিলের সুপারিশ
এদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামের ভর্তিতে মুক্তিযোদ্ধার নাতি-নাতনি কোটা বাতিলের সুপারিশ করেছে কোটা রিভিউ কমিটি। কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, এ বছর থেকে শুধু মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কোটায় আবেদন করতে পারবেন। নির্ধারিত কোটায় আসন পূরণ না হলে মেধা তালিকা অনুযায়ী আসন পূরণ করা হবে।
সভায় সর্বসম্মতিক্রমে একাধিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়-
১। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কোটায় শুধুমাত্র মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদেরই বিবেচনা করা হবে। এই কোটার ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধার নাতি-নাতনিদের বিবেচনা করা হবে না।
২। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী যেকোনো নির্ধারিত কোটায় আসন পূরণ না হলে মূল মেধা তালিকার ক্রমানুযায়ী শূন্য আসন পূরণ করা হবে।
৩। সাধারণ ভর্তি কমিটির ২১ অক্টোবর ২০২৪ তারিখের সভার আলোচ্যসূচী ৫ এর সিদ্ধান্তের আলোকে প্রদত্ত ক্ষমতা অনুযায়ী এই সুপারিশসমূহ ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষ হতেই কার্যকর করা এবং তা কার্যকরকল্পে ভর্তি বিজ্ঞপ্তিতে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা হবে।
রিভিউ কমিটির আহ্বায়ক আইন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকরামুল হকের সভাপতিত্বে সভায় সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন রাশেদা ইরশাদ নাসির, মার্কেটিং বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এবিএম শহিদুল ইসলাম, অনলাইন ভর্তি কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড মোস্তাফিজুর রহমান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন উপদেষ্টা উপস্থিত ছিলেন।



