দূর বরফের দেশেও আছে বাংলা মায়ের বোল। বাঙালির উৎসব এর প্রমাণ। তখন বাজতেই থাকে “ . . .সব ভুলে যাই তাও ভুলি না বাংলা মায়ের বোল . . .।” এ জাত বারো মাসে তের পার্বণের উৎসবে মাতে। আর অন্য যেকোনো উৎসবের চেয়ে বৈশাখের প্রখরতা ব্যাপক। তখন সীমান্ত, পাসপোর্ট, ভিসা- এসব কোনো বাধা হতে অক্ষম। বিশ্বজুড়ে বাঙালি এক সুতোয় নিবিড় হয় বৈশাখে।
ঋতুতে তারতম্য থাকে। কিন্তু উৎসবের সুর নিখাদ অটুট। বাংলায় যখন গনগনের সূর্যের তাপে চলে বর্ষবরণের প্রস্তুতি। সহস্রাধিক মাইল দূরের দেশ কানাডার মানিটোবায় তখন রাস্তায় জমাট বরফ। হিমাঙ্কের নিচের এ প্রতিকূল তাপমাত্রা দমাতে পারে না বাংলার মেয়ে অনন্তা চৌধুরীকে। কালবৈশাখী ঝড় তিনি টের পান অন্তরে। শুভ্র বরফের জমাট ঠাণ্ডাকে পাত্তা দেন না। গেয়ে ওঠেন,
“ . . .গত বছরের মায়া ভেঙে যাবে বলে
রাজপথ ভেসে গেছে অচেনা কাজলে”
সাধারণত এপ্রিলের এ সময়টায় কানাডার মানিটোবা প্রদেশ থেকে হিম যাই যাই করে। প্রকৃতি তার জবুথবু ভাব কাটিয়ে উঠতে থাকে। কিন্তু এবার ঘটেছে ভিন্ন ঘটনা।
গত ১৫ এপ্রিল মানিটোবায় শুরু হয় প্রবল বরফ ঝড় বা স্নো স্টর্ম। বছর দুয়েক ধরে এ শহরে পড়াশোনার জন্য থাকছেন অনন্তা চৌধুরী। তাই বরফ ঝড়কে পাশ কাটিয়ে তিনি গেয়ে উঠলেন, “….এসো হে বৈশাখ…এসো এসো…”।
কানাডার আবহাওয়ায় বাংলার বৈশাখের আভা ছিল না। তাতে দমে যাননি দেশ ও সংস্কৃতিকে ধারণ করা প্রবাসীরা। তারা নিজেদের মতো করে পালন করেন বাঙালির প্রাণের উৎসব নববর্ষ। একজন অনন্তা চৌধুরী এর ব্যতিক্রম নন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে স্নাতক শেষে ২০১৮ সালে স্নাতকোত্তর পড়তে মানিটোবায় পাড়ি জমান তিনি। সেখানেই পিএইচডি করছেন। গান করেন ছোটবেলা থেকে। ছায়ানট বিদ্যায়তনে শিখেছেন আট বছর। মাঝে পড়াশোনার চাপে সঙ্গীতচর্চায় সাময়িক বিরতি পড়ে তার। ফিরে আসেন আবার ২০২০ সালে কোভিড মহামারির সময় ঘরে থাকা দিনগুলোয়।
অনন্তা চৌধুরীর মতো মানিটোবার উইনিপেগে থাকা বাংলাদেশিরা গড়ে তুলেছেন কানাডিয়ান বাংলাদেশি অ্যাসোসিয়েশন (সিবিএ) নামের এক সংগঠন। ছোটবেলা থেকে সাংস্কৃতিক আবহে বেড়ে ওঠা অনন্তার। বর্তমানে তিনি সিবিএ’র অ্যাসিস্ট্যান্ট কালচারাল সেক্রেটারির দায়িত্বে সক্রিয়।
প্রবাস জীবন অনেকটা একাকী। থাকে ব্যস্ততা বহু রকমের। ভিন দেশে জীবন সংগ্রামে সময় বের করাই দূরহ। এ বাস্তবতায় অনন্তা চৌধুরী হাঁটছেন ভিন্ন পথে। আগ্রহী মানুষদের সাথে নিয়ে বাঙালি সংস্কৃতি চর্চায় তিনি নিমগ্ন। পড়াশোনার বাইরে বাকি সময় তার গানের জন্য। এবার নববর্ষ নিয়ে “অচেনা বৈশাখ” গানটি প্রকাশ করেছেন এ শিল্পী। বরফে ফুল ফোটাবার ব্রত তার। থাকতে চান দূর প্রবাসেও বাংলা গানের সঙ্গে। ইউটিউবে পাওয়া যাবে অনন্তার গাওয়া বেশ কয়েকটি গান। মোটেও বেসুরে গান না তিনি। তার কণ্ঠে আছে স্বকীয়তা। দেশের টান তার সুরের শিরায় শিরায়। ভিন দেশে তিনি যেন হয়ে উঠছেন লাল সবুজের পতাকার এক সাঙ্গীতিক দূত। “অচেনা বৈশাখ” গান যেন এরই প্রমাণ।



