Thursday, June 04, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

মরিচঝাঁপির গণহত্যা আর চঞ্চল-ইমরানকে ছাপিয়ে যাওয়া দুই তরুণে অনবদ্য ‘ফেউ’

দণ্ডকারণ্য থেকে মরিচঝাঁপিতে আশ্রয় নিয়েছিলেন দেশভাগের পরে ভারতে যাওয়া শরণার্থীরা

আপডেট : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১১:৪৬ এএম

সমকালীন বাংলাদেশে ভার্সেটাইল অভিনেতাদের তালিকা করলে নিঃসন্দেহে চঞ্চল চৌধুরী এবং মোস্তাফিজুর নুর ইমরানের নাম শীর্ষেই থাকবে। এই দুই তারকা যখন একসঙ্গে পর্দায় হাজির হন তখন পার্শ্ব অভিনেতা-অভিনেত্রীরা তাদের ছায়ায় ঢাকা পড়ে যাবেন এমনটাই স্বাভাবিক। আর তাদের সঙ্গে যদি থাকেন আরেক শক্তিমান অভিনেতা তারিক আনাম খান। তাহলে অন্যদের নিয়ে আলোচনা হওয়াটা যেন আরও বেশি অস্বাভাবিক। তবে সেই অস্বাভাবিক কাজটিই করে দেখিয়েছেন দুই তরুণ অভিনেতা তানভীর অপূর্ব এবং হোসাইন জীবন।

সম্প্রতি ওটিটি প্ল্যাটফর্ম চরকিতে মুক্তি পাওয়া ওয়েব সিরিজ “ফেউ”-তে বড় বড় তারকাদের ছাপিয়ে সবটুকু আলো নিজেদের দিকে টেনে নিয়েছেন তারা দুজন।

তবে শুধু অভিনয়শৈলী নয়; গল্প আর নির্মাণেও অনবদ্য “ফেউ”। যেখানে উঠে এসেছে ইতিহাসের নির্মম এক অধ্যায়ও। পাশাপাশি তুলে ধরা হয়েছে সুন্দরবনের জীবিকানির্ভর মানুষের জীবনযাত্রা।

“ফেউ” ওয়েব সিরিজটি নির্মাণ করেছেন সুকর্ন সাহেদ ধীমান। সত্য ঘটনার ছায়া অবলম্বনে ওয়েব সিরিজটি নির্মাণ করেছেন তিনি।

আর সেই সত্য ঘটনা হলো মরিচঝাঁপির গণহত্যা। মরিচঝাঁপি মূলত পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ পরগণা জেলার সুন্দরবন সংলগ্ন একটি দ্বীপ। আর এটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে শরণার্থী বাঙালিদের নিপীড়িত হওয়ার এক করুণ ইতিহাস।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর অসংখ্য দলিত ও নিম্নবর্ণের হিন্দু উদ্বাস্তু পূর্ব পাকিস্তান অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশ থেকে ভারতে চলে যান। তাদের একটা বড় অংশকে রাখা হয় দণ্ডকারণ্য শরণার্থী শিবিরে। কিন্তু পাহাড়ি অঞ্চল দণ্ডকারণ্য ছিল অনেকটাই বসবাসের অনুপযোগী। একপর্যায়ে এসব শরণার্থীরা হয়ে পড়েন ভারতীয় রাজনীতির ঘুঁটি। ১৯৭৫ সালে সিপিএম নেতা জ্যোতি বসু ঘোষণা দেন তারা ক্ষমতায় এলে এসব শরণার্থীদের পুনর্বাসন করা হবে। ১৯৭৭ সালে পশ্চিমবঙ্গে বাম ফ্রন্ট ক্ষমতায় আসার পর একটুখানি ভালো থাকার আশায় ১৯৭৮ সালের মার্চ মাসে দণ্ডকারণ্য থেকে পশ্চিমবঙ্গে রওনা হন অসংখ্য শরণার্থী। তবে কথা রাখেনি বাম ফ্রন্ট। এরপর মরিচঝাঁপি দ্বীপে আশ্রয় নেন কয়েক হাজার শরণার্থী। সেখানে বসবাস শুরু করেন তারা। তবে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষার নামে তাদের উৎখাতের সিদ্ধান্ত নেয় ভারত সরকার। মরিচঝাঁপির শরণার্থীদের ওপর নেমে আসে নির্মম নির্যাতন। ১৯৭১ সালের জানুয়ারি থেকে শরণার্থীদের উৎখাতে নানা কর্মকাণ্ড শুরু করে ভারত সরকার। খাবার পানিতে বিষ মেশানো, বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া, হত্যা, ধর্ষণের মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটে সেখানে। এরপর ১৯৭৯ সালের ১৬ মে মরিচঝাঁপি উদ্বাস্তু শূন্য হয়। সরকারি হিসেবে সেখানে নিহতের সংখ্যা মাত্র দুজন হলেও কারো কারো মতে মরিচঝাঁপি হত্যাকাণ্ডের শিকার হাজারের বেশি মানুষ।

ইতিহাসের এই কালো অধ্যায়ের ছায়া অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে ওয়েব সিরিজ “ফেউ”। তবে ওয়েব সিরিজটিতে মরিচঝাঁপির বদলে ডুমুরঝাঁপি নামটি ব্যবহার করেছেন সুকর্ন সাহেদ ধীমান। আর ওয়েব সিরিজটিতে একই সমান্তরালে তুলে ধরেছেন দুই সময়ের গল্প। একটি ১৯৭৯ সালের ডুমুরঝাঁপি, আর অন্যটি ২০০২ সালে বর্তমান বাগেরহাট জেলার অন্তর্গত মোংলার সুন্দরবনঘেঁষা অঞ্চল।

গল্পে দেখা যায়, ১৯৭৯ সালে ডুমুরঝাঁপিতে যাতায়াত ছিল মোংলার চার্চের ব্রাদার সুনিলের। শরণার্থীদের দুর্দশা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তুলে ধরার জন্য সেখানকার ছবি তুলে তিনি পাঠাতেন এক বিদেশি সাংবাদিকের কাছে। অন্যদিকে, সুনিলের কাছের বন্ধু মার্শাল। সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন তিনি। তবে ঘটনার পরিক্রমায় দস্যুতার সঙ্গে জড়িয়ে যান মার্শাল। তৈরি করেন নিজের বাহিনী। এদিকে ডুমুরঝাঁপি ম্যাসাকারের একপর্যায়ে সুনিলের মৃত্যুর খবর আসে। মোংলার চার্চে সমাধিস্থ করা হয় সুনিলকে। শরণার্থী শিবির থেকে মোংলার চার্চে এসে ধর্মান্তরিত হওয়া সুনিতার কাছে বেড়ে ওঠে সুনিলের ছেলে ড্যানিয়েল।

তবে ঘটনায় নাটকীয় মোড় নেয় যখন ২০০২ সালে সুনিলের বিদেশি পেনফ্রেন্ড ফাদার ফ্রান্সিসকো মোংলায় এসে দাবি করেন সুনিল এখনও বেঁছে আছেন। এমনকি উদ্ধারের জন্য সুনিল তার কাছে চিঠিও পাঠিয়েছেন। ড্যানিয়েল ও তার বন্ধু সোহলেকে নিয়ে সুনিলের খোঁজে নামেন ফ্রান্সিসকো। আর এই খোঁজাখুজি করতে গিয়ে ফের প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেন মার্শাল। একপর্যায়ে ফিরে যেতে হয় ফ্রান্সিসকোকে। তারপর একাই বাবার সন্ধানে ছুটে চলে ড্যানিয়েল।

“ফেউ” ওয়েব সিরিজে সুনিল চরিত্রে অভিনয় করেছেন চঞ্চল চৌধুরী, মার্শাল চরিত্রে অভিনয় করেছেন মোস্তাফিজুর নুর ইমরান। কাজী নামের একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন তারিক আনাম খান। এছাড়া বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন আরও বেশ কয়েকজন চেনা-অচেনা মুখ। তারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ চরিত্রে ছিলেন প্রাণবন্ত। সবার অভিনয় ছিল প্রশংসনীয় আর আঞ্চলিক ভাষায় ব্যবহারে সবাই ছিলেন বেশ সাবলীল।

তবে সবার অভিনয়কে ছাপিয়ে আলাদাভাবে নজর করেছেন ড্যানিয়েল চরিত্রে অভিনয় করা তানভীর অপূর্ব আর সোহেল চরিত্রের হোসাইন জীবন। আঞ্চলিক ভাষা, অভিব্যক্তি, চরিত্রকে নিজেদের মধ্যে ধারণ সবকিছুতে অনবদ্য ছিলেন এই দুই তরুণ তুর্কি। পুরো ওয়েব সিরিজটিতে ড্যানিয়েল-সোহেলের বন্ধুত্ব-খুনশুঁটি ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে।

তবে শুধু অভিনয় নয়; সিনেমাটোগ্রাফি, সংলাপ, আবহ সবকিছুতেই “ফেউ” একেবারে দশে দশ।

ওয়েব সিরিজটিতে নির্মাতা সুনিপুণভাবে তুলে ধরেছেন সুন্দরবনঘেঁষা মানুষের জীবনযাপন ও সংস্কৃতি। পাশাপাশি জীবন্ত হয়ে উঠেছে শরণার্থীদের দুর্দশার চিত্র। তবে ১৯৭৮-৭৯ সালের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় অভিনয় শিল্পীদের কস্টিউমের ক্ষেত্রে আরেকটু সতর্ক হওয়ার সুয়োগ ছিল। এছাড়া ওয়েব সিরিজটির সংলাপও দুর্দান্ত।

সবমিলিয়ে “ফেউ” ওয়েব সিরিজের সব অভিনয় শিল্পী, নির্মাতা সুকর্ন এবং তার বাকি দুই সংলাপ রচয়িতা রোমেল রহমান, সিদ্দিক আহম্মেদসহ সংশ্লিষ্ট কলাকুশলিরা সবাই টুপি খোলা অভিবাদনের দাবিদার।

এখন অপেক্ষা ড্যানিয়েলের বাবাকে খুঁজে পাওয়া আর ইতিহাসের গোপন এক অধ্যায়ের সত্য উন্মোচনের। যেখানে সুনিলের সঙ্গে লুকিয়ে আছে ভূ-রাজনীতি আর আন্তর্জাতিক রাজনীতি। সেটি জানার জন্য অবশ্য দর্শকদের অপেক্ষা করতে হবে “ফেউ” এর দ্বিতীয় সিজনের।

   

About

Popular Links

x