তাসফিয়ার বাবা-মা দুজনই চাকরিজীবী। বাড়িতে ছোট্ট তাসফিয়াকে দেখাশোনার মতো আর কেউ নেই।
তাই ২০১৯ সালের নভেম্বরে তাসফিয়ার মা-বাবা মেয়েকে একটি শিশু যত্ন কেন্দ্রে (ডে কেয়ার সেন্টার) দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু, দুর্ভাগ্যবশত কয়েক মাস পরেই প্রতিষ্ঠানটি করোনাভাইরাস মহামারির কারণে সেই অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে যায়।
মহামারির কারণে সরকারঘোষিত লকডাউনের সময় তাসফিয়ার মা শাহিদা বাড়ি থেকে কাজ করতেন এবং মেয়ের যত্ন নিতেন। কিন্তু অফিস আবারও চালু হয়ে যাওয়ায় তাসফিয়াকে আবারও ডে-কেয়ারে দিতে হয়েছে।
লকডাউনে আর্থিক ক্ষতির কারণে ডে কেয়ার সেন্টারটি স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেলে শাহিদার সমস্যা আরও বাড়ে । তাই এখন প্রতিদিন কাজে যাওয়ার আগে মেয়েকে বোনের বাসায় রেখে আসেন তিনি।
শাহিদা বলেন, “তাসফিয়ার জন্য একটা ভালো ডে-কেয়ার না পাওয়া পর্যন্ত আমাদের এভাবেই চলতে হবে।”
তবে শুধুমাত্র তাসফিয়ার ডে-কেয়ার সেন্টারটিই নয়, এ ধরনের আরও অনেক প্রতিষ্ঠানটি মহামারির কারণে বন্ধ হয়ে গেছে।
অনেক বাবা-মায়ের তাদের সন্তানদের ডে-কেয়ারে রাখার প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও, অস্থায়ী শাটডাউনের কারণে এ ধরনের বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানকেই মারাত্মক প্রভাবিত করেছিল। অনেকেই গত দুই বছরে ভাড়া এবং অন্যান্য খরচের কারণে তাদের কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।
টিকে থাকা খুবই কঠিন
চাইল্ড কেয়ার সেন্টার এমন একটি জায়গা যেখানে শিশুরা তাদের বয়স অনুযায়ী বেড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় যত্ন এবং সহায়তা পায়। রাজধানীতে প্রায় এক হাজার বাণিজ্যিক ডে কেয়ার সেন্টার রয়েছে। এছাড়াও ৪৩টি পাবলিক চাইল্ড কেয়ার সেন্টারসহ ২০টি সরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
ঢাকার ডিসি চাইল্ড কেয়ার অ্যান্ড এডুকেশন সেন্টারের অধ্যক্ষ ডালিয়া রড্রিগেজ বলেন, “কর্মজীবী নারীর সংখ্যা বাড়ার কারণে, শহরগুলোতেও ডে-কেয়ার সেন্টার অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। এই সেক্টর সম্পর্কে মানুষের ধারণা ধীরে ধীরে উন্নত হচ্ছে। যদিও পাঁচ-সাত বছর আগেও এমনটা ছিল না।”
খ্রিস্টান কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়নের অধীনে পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানে বাবা-মায়েরা সন্তানকে নিশ্চিন্তে রেখে যেতে পারেন।
২০১৭ সালে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি মাত্র দুই বছরের মাথায় যখন সুনাম অর্জন করতে শুরু করেছিল ঠিক তখনই মহামারি আঘাত হেনেছিল।
“মহামারি আমাদের অগ্রগতি থামিয়ে দিয়েছে। এই সেক্টরের প্রধান দিকই হচ্ছে সরাসরি সেবা দেওয়া। তাই আমাদেরও সকল কার্যক্রম বন্ধ করতে হয়েছিল। তারপর আর কেউ কেন তাদের সন্তানদের এখানে ভর্তি করবে?" ডালিয়া প্রশ্ন করে বলেন।
অস্থায়ী বন্ধের কারণে কেন্দ্রগুলো তাদের কর্মীদের বেতন, ভাড়া এবং অন্যান্য বিল পরিশোধ করতে লড়াই শুরু করে।
ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন- “চাইল্ড চিয়ার”, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। অন্যদিকে, অভিভাবক বা অন্যান্য সংস্থার মাধ্যমে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান- “ডিসি চাইল্ড কেয়ার” বা “দ্য লিটল ডাকলিংস” কোনোভাবে টিকে আছে।
২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর, “দ্য লিটল ডাকলিংকস” প্রথম ছয় মাসের মধ্যে বেশ ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পেয়েছিল। মহামারির কারণে প্রতিষ্ঠানটি তাদের শিশু যত্ন এবং প্রাক-বিদ্যালয় কার্যক্রম বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়।
পরবর্তীতে ২০২০ সালের শেষের দিকে ডাক্তার, ব্যাংকার এবং পুলিশের মতো জরুরি পরিষেবার সঙ্গে জড়িত অনেক অভিভাবকদের সহায়তায় প্রতিষ্ঠানটি তাদের কার্যক্রম আবারও শুরু করেছিল।
সুমাইয়া আমিন নামে একজন কর্মজীবী মা বলেন, “আমার সন্তানদের ডে কেয়ারে রাখা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। তাই আমি তাদের দেখাশোনার জন্য কেন্দ্রটিকে অনুরোধ করেছিলাম।”
খরচ যেন পাহাড়সম
২০২০ সালের আগস্ট মাসে স্বাস্থ্যবিধি মেনে বেশ কিছু ডে-কেয়ার সেন্টার সীমিত পরিসরে আবার খোলা হয়েছিল।
চাইল্ড চিয়ারের ফারহানা রশিদ বলেন, “গত তিন মাসে আমরা লাভের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যয়ের পরিমাণ বেশি লক্ষ্য করছি। করোনাভাইরাসের ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টের আবির্ভাবে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যেখানে আমরা আবারও শূন্যের কোঠায় ফিরে যাচ্ছি।”
অনেক ডে-কেয়ারে প্রি-স্কুল সিস্টেম থাকে। প্রাক-বিদ্যালয়গুলো শুধুমাত্র শিশুদেরকে অল্প বয়সে শিক্ষাই দেয় না বরং প্রতিষ্ঠানগুলোকে আর্থিকভাবেও সাহায্য করে।
দ্য লিটল ডাকলিংস- ডে কেয়ার, প্রি-স্কুল এবং প্লে-জোন-এর প্রোগ্রাম ম্যানেজার সামিয়া তাসমিন বলেন, “বাংলাদেশে ডে কেয়ার লাভজনক নয় এবং মহামারি পরিস্থিতি একে আরও খারাপ করে তুলেছে। বেশিরভাগ অর্থই আসে স্কুলিং এবং প্রি-স্কুলিং থেকে। কিন্তু, কোভিডের সংক্রমণ বৃদ্ধির কারণে সবকিছু থমকে গেছে।”
ডে-কেয়ার সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি সঠিক এবং কাঠামোবদ্ধ চাইল্ড কেয়ার সেন্টারের জন্য বিশাল বিনিয়োগের প্রয়োজন।
অনেক ডে কেয়ারকে শিশুদের অভাবের কারণে স্থায়ীভাবে কার্যক্রম বন্ধ করতে হয়েছে। এমনই একটি ডে কেয়ার উত্তরার “হ্যাটস ডে কেয়ার”।
শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় তৈরি করা আতিকা মুনমুনের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল। সেই স্বপ্ন থেকেই ২০১৬ সালে হ্যাটস ডে কেয়ারের যাত্রা।
আতিকা মুনমুন গত বছরের জুন মাস পর্যন্ত প্রতি মাসে ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে সেন্টারের জায়গাটি ধরে রেখেছিলেন এই ভেবে যে, আবারও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে চালু করবেন।
কিন্তু, করোনাভাইরাসের নিত্যনতুন ভ্যারিয়েন্টের উত্থানের পাশাপাশি সংক্রমণ এবং মৃত্যু বেড়ে যাওয়ায় তার পক্ষে আর এতো টাকা ভাড়া দিয়ে সেন্টারটি ধরে রাখা সম্ভব হয়নি।
“হ্যাটসের চালু হওয়ার আর কোনো সম্ভাবনা নেই। এখন তো আসবাবপত্র এবং অন্যান্য জিনিসপত্র আরও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় কেউ সেগুলো কিনতে রাজি হচ্ছে না,” আতিকা বলছিলেন।



