Monday, May 20, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

কাঁঠাল থেকে তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন খাবার, অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা

বাংলাদেশে তৈরি হচ্ছে কাঁঠালের জ্যাম, আচার, চাটনি, চিপস, কাটলেট, আইসক্রিম, কাঁঠালস্বত্ব, রেডি টু কুক কাঁঠাল, ফ্রেশকাট (ভেজিটেবল মিট), কাঁঠালের পাউডারসহ বিভিন্ন ধরনের প্যাকেটজাত পণ্য

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০২৩, ০৬:৫১ পিএম

বাংলাদেশের জাতীয় ফল কাঁঠাল। আর বিশ্বে কাঁঠাল উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় ভারতের পরই বাংলাদেশের স্থান। তবে আমাদের দেশে প্রতিবছর যে পরিমাণ কাঁঠাল উৎপন্ন হয়, তার প্রায় অর্ধেকাংশই নষ্ট হয়ে যায়। যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বছরে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। 

কাঁঠালের এই অপচয়ের পেছনে শুধুমাত্র এটিকে পাকা ফল হিসেবে খাওয়ার প্রবণতাকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, কাঁঠালকে শুধুমাত্র পাকা ফল হিসেবে খাওয়ার কারণে এটি যখন পাকতে শুরু করে তখন একসঙ্গে বেশিরভাগ কাঁঠালই পেকে যায়। ফলে অধিকাংশ কাঁঠাল নষ্ট হয়ে যায়। আর কাঁঠালের মৌসুমে দেশের বাজারে আম, জামের মতো বেশকিছু দেশীয় ফলও পাওয়া যায়। যেটিও সেই সময়ে কাঁঠালের প্রতি আগ্রহ কম থাকার একটি বড় কারণ। 

তবে কাঁঠালের বহু্বিধ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি রোধের পাশাপাশি সারাবছরই “সুপারফুড” হিসেবে খ্যাত এই ফলটি খাওয়া সম্ভব। যা দেশের পুষ্টির চাহিদা মেটাতেও গুরুত্বপূর্ণ। 

এক্ষেত্রে আশার কথা হলো, ইতোমধ্যে বাংলাদেশে কাঁঠাল থেকে বিভিন্ন প্রকার মুখরোচক খাবার তৈরি হচ্ছে। যার মধ্যে রয়েছে- কাঁঠালের জ্যাম, আচার, চাটনি, চিপস, কাটলেট, আইসক্রিম, দই, ভর্তা, কাঁঠালস্বত্ব, রেডি টু কুক কাঁঠাল, ফ্রেশকাট (ভেজিটেবল মিট), কাঁঠালের পাউডারসহ আরও বিভিন্ন ধরনের প্যাকেটজাত পণ্য। বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো এসব পণ্য উদ্ভাবন করেছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট। 



কাঁঠালের অপচয় রোধে এর বহুবিধ ব্যবহার নিশ্চিত করতে কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের (কেজিএফ) অর্থায়নে এবং নিউভিশন সলিউশন্স লিমিটেডের সহযোগিতায় ২০১৯ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত “কাঁঠালের সংগ্রহত্তোর ক্ষতি প্রশমন ও বাজারজাতকরণ কৌশল” শীর্ষক তিন বছর মেয়াদি একটি গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট। 

এই গবেষণা প্রকল্পের নেতৃত্ব দেন কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের পোস্ট-হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী। 

তিনি ঢাকা ট্রিবিউনকে জানান, প্রকল্পের আওতায় সেই সময়ে তারা কাঁঠালের চিপস, আচার, ফ্রেশকাট ও ড্রাইড-প্রোডাক্ট এই চারটি পণ্য নিয়ে গবেষণা শুরু করলেও তারা কাঁঠাল থেকে আরও অনেক বেশি পণ্য উৎপাদনের সম্ভাবনা দেখতে পান। তার মতে, কাঁঠাল থেকে ৩০টিরও বেশি পণ্য উৎপাদন সম্ভব। 

প্রকল্পের আওতায় সেই সময়ে উৎপাদন থেকে বিপণন প্রক্রিয়া পর্যন্ত ৭০০-৮০০ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় বলে জানান তিনি। কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়া এসব ব্যক্তিরা বর্তমানে কাঁঠাল থেকে বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করছেন। এছাড়া, এখনও তারা আগ্রহী ব্যক্তিদের বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। তাদের উৎপাদিত পণ্য দেশের বিভিন্ন সুপারশপসহ খুচরা বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। আর এসব পণ্য ভোক্তাদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে বলেও উল্লেখ করেন ড. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী। 

তবে বিপুল পরিমাণ অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও পুষ্টিগুণ থাকার পরও এই খাতটি বাজার হারাচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। এর পেছনে এই খাতে বিনিয়োগের ঘাটতিকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন এই গবেষক। 

তিনি ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “এখন পর্যন্ত যেসব উদ্যোক্তারা আমাদের দেশে কাঁঠাল থেকে বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করছেন, তার বেশিরভাগই অল্প পুঁজির উদ্যোক্তা। কিন্তু দেশের এবং আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁঠালের পণ্যের চাহিদা ব্যাপক। দেশের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি রপ্তানির বাজার ধরতে হলে এই খাতে বিনিয়োগ প্রয়োজন।” 

“এছাড়া, বর্তমানে দেশের উদ্যোক্তারা কাঁঠাল থেকে তাদের উৎপাদিত পণ্য বিপণনের ক্ষেত্রেও কিছু প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছেন। তাদের সবারই পুঁজি খুব কম, কিন্তু যখন তারা কাঁঠাল থেকে উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে যাচ্ছেন, তখন সেটি প্যাকেটজাত করতে হচ্ছে। যেটি খুব ব্যয় সাপেক্ষ। এসব উদ্যোক্তাদের পুঁজি কম থাকায় তারা প্যাকেটের পেছনে এতো ব্যয় করতে পারছেন না। ফলে এই খাত থেকে অনেকে আগ্রহ হারাচ্ছেন। আবার সুপারশপগুলোতে পণ্য সরবরাহ করতে গেলে বিসিটিআই অনুমোদন না থাকলে তারা বাধার মুখে পড়ছেন। বিসিটিআই অনুমোদনের খরচটিও এসব উদ্যোক্তাদের জন্য কষ্টসাধ্য”, উল্লেখ করে এসব উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও বিসিটিআই অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ এবং হলিডে মার্কেটগুলোতে তাদের জন্য খাজনা সহজ করার দাবি জানান গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী। 

সেই সঙ্গে কাঁঠাল থেকে উৎপাদিত পণ্যের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে সরকারিভাবে প্রচারণা চালানোরও আহ্বান জানান এই গবেষক। 

ড. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী

কাঁঠালের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে তিনি বলেন, “কাঁঠালে আছে অধিক পরিমাণে আমিষ, শর্করা ও বিভিন্ন ভিটামিন যা মানবদেহের জন্য বিশেষ প্রয়োজন। প্রতি ১০০ গ্রাম পাকা কাঁঠালে ১.৮ গ্রাম, কাঁচা কাঁঠালে ২০৬ গ্রাম ও কাঁঠালের বীজে ৬.৬ গ্রাম আমিষ পাওয়া যায়। কাঁচা কাঁঠাল রোগ ব্যাধি উপশমে যেমন কার্যকর, অন্যদিকে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বাড়িয়ে দেয় অনেকগুণ। এটি ক্যান্সারের মোকাবিলায়ও সাহায্য করে। এতে আছে বিপুল পরিমাণে খনিজ উপাদান যা হাড়ের গঠন ও হাড় শক্তিশালীকরণে এবং রক্তে শর্করা বা চিনির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। কাঁঠালে আছে শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট যা আমাদের দেহকে ক্ষতিকর ফ্রি-রেডিকেলস থেকে রক্ষা করে। এছাড়াও সর্দি-কাশি রোগের সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে। কাঁঠালে বিদ্যমান ফাইটোনিউট্রিয়েন্টস- আলসার, উচ্চ রক্তচাপ এবং বার্ধক্য প্রতিরোধে সক্ষম। এই ফলে রয়েছে আয়রন যা দেহের রক্তাল্পতা ও এটি আঁশালো হওয়ায় কোষ্ঠকাঠিন্যও দূর করে। ” 

গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী বলেন, “তেলে ভাজা সাধারণ চিপসে ক্যান্সারের উপাদান থাকে। কিন্তু কাঁঠালের চিপসে সেটি নেই। এটি অত্যন্ত স্বাস্থ্যসম্মত। এছাড়া কাঁঠালের পাউডারের জুস এবং আটা-ময়দার সঙ্গে এই পাউডার মিশিয়ে তৈরি করা রুটি ডায়াবেটিস রোগীর জন্যও খুব উপকারী।” 



দেশের বাজারে বাজারে এখন কাঁঠালের অন্যান্য পণ্যের চেয়ে ফ্রেশকাট অর্থাৎ এঁচোড়ের চাহিদা বেশি বলে উল্লেখ করেন তিনি। তার মতে, এক্ষেত্রে কৃষকের লাভও অনেক বেশি। সাধারণত একটি কাঁঠাল ৬০-৭০ টাকায় বিক্রি করা গেলেও। ফ্রেশকাট হিসেবে একটি কাঁঠাল ২০০-২৫০ টাকায় বিক্রি করা সম্ভব বলে জানান তিনি। 

এছাড়া, কাঁচা কাঁঠালের ভেজিটেবল রোল, কাটলেট, সিঙ্গাড়া, সমুচা ছাড়াও পাকা কাঁঠালের রস দিয়ে আইসক্রিম বা কেকের মত খাবার তৈরি হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। 

তার ভাষ্য, “একটা সময় কাঁঠালের আমস্বত্ব অবাস্তব মনে হলেও এখন পাকা কাঁঠালের রস দিয়ে দেশে কাঁঠালস্বত্বও তৈরি হচ্ছে।” 

ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, ভিয়েতনামসহ দক্ষিণ এশিয়ার বেশকিছু দেশে এবং ইউরোপের অনেক দেশে কাঁঠাল দিয়ে তৈরি নানা ধরনের প্রক্রিয়াজাত খাদ্যদ্রব্যের জনপ্রিয়তা রয়েছে। সেসব দেশে কাঁঠালজাত পণ্য রপ্তানিতে জোর দিলে দেশের অর্থনীতিতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা যুক্ত হবে বলে প্রত্যাশা তার। 

প্রকল্প চলাকালে গবেষণাগারে ড. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী

এক্ষেত্রে বাণিজ্য মন্ত্রণালায়কে ধন্যবাদ জানান তিনি। বাণিজ্য মন্ত্রণালায়ের রোড টু কানেক্টিভিটি প্রকল্প-১ এর আওতায় নারী উদ্যোক্তাদের জন্য নির্বাচিত চারটি ফলের মধ্যে কাঁঠাল রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। একইভাবে অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও সরকারি-বেসরকারি সংস্থাকে লাভজন এই খাতে আগ্রহী হতে আহ্বান জানান তিনি

যেকোনো গবেষণা প্রকল্পের জন্য তিন বছর কম সময় উল্লেখ করে কাঁঠালজাত পণ্য বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প নেওয়ার পাশাপাশি এই খাতের উন্নয়নে আলাদা করে নীতিমালা বাস্তবায়ন, বিনিয়োগ বাড়ানো, সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা এবং প্রচারণা বাড়ানোর আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেন কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের পোস্ট-হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী।

About

Popular Links