Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

ক্র্যাক প্লাটুনের অপারেশন ‘গুলবাগ পাওয়ার স্টেশন’

পাকিস্তানিদের নির্মম বর্বরতার প্রতিরোধে এই অসমসাহসী অপারেশন কাঁপিয়ে দিয়েছিল হানাদারদের অন্তরে। মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ঢাকা ট্রিবিউনে গবেষক রা'আদ রহমানের লেখা সিরিজের চতুর্থ পর্ব এটি 

আপডেট : ০৫ জুলাই ২০২৩, ০৬:৪৭ পিএম

রাতের আকাশ চিরে এক অবিনাশী বিদ্যুৎচমক! সঙ্গে সঙ্গেই কানে তালা লেগে যাওয়া শব্দ! প্রচণ্ড বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল গোটা গুলবাগ, শান্তিবাগ, মালিবাগ, খিলগাঁও, শান্তিনগর ও মগবাজার এলাকা। রেশ না কাটতেই চারদিক কাঁপিয়ে আরেকটি বিস্ফোরণ! 

রাতের নিকষ কালো আঁধার হারিয়ে গেল লকলকে অগ্নিশিখায়। দেখতে দেখতে আগুনের গোলা লাফিয়ে উঠল অনেকটা। বিস্ফোরণস্থল সংলগ্ন তিনতলা বাড়িটার মাথাও ছাড়িয়ে গেল। যদিও আগুনের লালচে শিখায় পুরোপুরি কাটেনি চারপাশের কালিগোলা অন্ধকার পথ। এদিকে, বাতাসে ট্রান্সফর্মার অয়েলের পোড়া গন্ধ।

এভাবেই রাত ৮টা ৪৫ মিনিটে আরবান গেরিলাদের সাঁড়াশি আক্রমণে বিধ্বস্ত হয় ওয়াপদার ৩৩/৩১ কেভি খিলগাঁও পাওয়ার সাব-স্টেশন ( গুলবাগ পাওয়ার স্টেশন নামেও পরিচিত)। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ৫ এমভিএ বিশিষ্ট ট্রান্সফর্মার। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ঢাকার পাওয়ার স্টেশনগুলোতে হামলার অংশ হিসেবে উলান পাওয়ার স্টেশনের সঙ্গে গেরিলাদের আরেকটি দল গুলবাগ স্টেশনে হামলা চালায়। 

এই অপারেশনে ছিলেন- জুয়েল (পরবর্তীতে শহিদ), হানিফ, মুখতার, মোমিন, মালেক ও বাশার। এদের মধ্যে মুখতার, সাইদ, জুয়েল, মোমিন ও হানিফ ছিলেন অপারেশনের প্রথম পর্যায়ের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্বে।

অপারেশনে অংশ নেওয়া গেরিলাদের মধ্যে হানিফ ও জুয়েলের হাতে দুটো স্টেনগান আর মুখতার ও সাইদের হাতে ছিল দুটো কমান্ডো নাইফ বা বেয়নেট। দুটি ট্রান্সফর্মার ওড়াতে তৈরি করা হয়েছিল ৪০ পাউন্ড পি কে-এর দুটো চার্জ। ট্রান্সফর্মার দুটির গায়ে দুটো চার্জ বেঁধে সংযোগ ঘটানো হয়েছিল ২৪ ফুট প্রাইমা কর্ড বা বিস্ফোরক কর্ড-এক্স। কর্ডের দৈর্ঘ্যের ঠিক মাঝবরাবর বসানো হয়েছিল ডেটোনেটর-২৭। ফিউজ ওয়্যার দেওয়া হয়েছিল ঠিক এক মিনিটের। 

গুলবাগ এলাকায় অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন শরীফুল হকের বাড়িতে ছিল গেরিলাদের “আর-ভি”। ধানমন্ডির ২৮ নম্বর রোডের হাইডআউট থেকে গেরিলারা সেখানে যান। এই বাড়িটি থেকেই চূড়ান্ত আক্রমণ পরিচালনা করা হয়েছিল। 

পরিকল্পনা মতো আক্রমণের আগে ‘‘আর-ভি'' থেকে একজন গেরিলা বেরিয়ে আসেন ফাইনাল রেকি করতে। ঘুরেফিরে দেখে এসে তিনি জানান, পাওয়ার স্টেশনের ভেতরের দিকে একজন পশ্চিম পাকিস্তানি পুলিশ আছে কেবল। তার রাইফেল দুই-তিন হাত দূরে রাখা, পাওয়ার স্টেশনের পাশে একটা বাড়ির দেয়াল ঘেঁষে লুকিয়ে থাকার ব্যবস্থা আছে। জায়গাটা অন্ধকার। একটাই অসুবিধা, স্টেশনের গেট লাগোয়া পান-বিড়ি-চায়ের দোকানটার সামনে চার-পাঁচজন লোক বসে আড্ডা দিচ্ছে।

অবস্থা বুঝে মুখতার, জুয়েল, সাইদ, হানিফ ও মোমিন অপারেশনের প্রাথমিক কাজে লেগে গেলেন। 

প্রথমেই মুখতার ও সাইদ কমান্ডো নাইফ নিয়ে দোকানের দিকে এগোলেন। স্টেনগান সোজা করে জুয়েল ও হানিফ চলে গেলেন গেটে থাকা পুলিশ সদস্যকে নিরস্ত্র করতে। দোকানের লোকগুলো আড্ডা দিচ্ছিল, প্রথমে মনে করল দুজন খদ্দের এসেছে জিনিস কিনতে, দোকানদার কী নেবেন জিজ্ঞেস করার জবাবে দুজনের হাতে বেরিয়ে এলো চকচকে ধারালো ছুরি! আড্ডারত লোকগুলোর একজন হঠাৎ ছুটে পালাতে চাইলে তাকে ধরে আনা হলো, সবাইকে ঠাণ্ডা স্বরে জানানো হলো, ‘‘কেউ কোনো ঝামেলার চেষ্টা করলে শেষ করে দেওয়া হবে। আমরা চোর-ডাকাত-গুণ্ডা নই, মুক্তিবাহিনীর লোক, তোমাদের ভাই। কাজ সেরে চলে যাব। ভেতরে চলো।'' 

কথায় কাজ হলো, সবাই দোকান খালি রেখে স্টেশনের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকল।

ওদিকে গেটের কাছে পাহারারত পশ্চিম পাকিস্তানি পুলিশকে নড়ারও সময় দেননি জুয়েল। সরাসরি মুখের সামনে স্টেনের নল ধরে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা হলো তাকে। রাইফেলের দিকে হাত বাড়ানোরও সময় পায়নি সে। স্টেনগান হাতে এক তরুণকে আচমকা ঢুকতে দেখে ‘‘মুকুত'' বলে একটা চিৎকার দিচ্ছিল কেবল, নলটা মুখের সামনে দেখে জুয়েলের বাজখাঁই গলার ধমকে সেই চিৎকার পুরোটা গিলে ফেলল। হাত উপরের দিকে তুলে সে শুধু একবার বলেছিল, ‘‘লেকিন, স্টেশন কি আন্দার মে তো কারফিউ হ্যায়!'' 

তখন হানিফ স্টেশন অপারেটরের রুমে গিয়ে অন্যান্য কর্মচারীদের জিম্মি করে ফেলেন। গেট থেকে জুয়েল সেখানে পুলিশটিকে ধরে নিয়ে এলেন। তারপর সবাইকে ঢোকানো হলো পাশের একটি কক্ষে। এদিকে, মোমিন ততক্ষণে কাটার দিয়ে স্টেশনের টেলিফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছেন। স্টেশনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে শুরু হলো দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ। 

দলের বাকি সবাই এসে স্টেশনে ঢুকলেন। ট্রান্সফর্মার চার্জ ফিট করতে লেগে গেলেন পুলু, তাকে সহায়তা করছিলেন বাশার। গেটের ভেতরে যেখানে পুলিশ সদস্যের বদলে পাহারায় বসলেন মোমিন। গেটের বাইরে দোকানের কাছে পর্যবেক্ষণে রইলেন সাইদ। স্টেশনের ভেতরে এবং সার্বিক সবখানে নজর রেখে পাহারার দায়িত্বটি বুঝে নিলেন জুয়েল। 

তখনই ঘটল এক অদ্ভুত ঘটনা! 

একজন খদ্দের এসেছে পান-সিগারেট কিনতে, দোকানদারকে আর খুঁজে পায় না। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে বিরক্ত হয়ে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অপরিচিত লোকটাকে জিজ্ঞেস করেই ফেললো সে, ‘‘দোকানদার তো এখনো এলো না। আপনি তো বললেন পাওয়ার হাউজের ভেতরে গেছে, করছেটা কী সে ওখানে!''

দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সাইদ আবার জোর দিয়ে বললেন, ‘‘ওই তো গেটের ওপাশেই গেল লোকটা। আমাকে বলে গেল দোকানের দিকে নজর রাখতে, আপনি চাইলে গেটের ওপাশে গিয়ে খোঁজ নিয়ে আসতে পারেন ভাই।''

ফাঁদে পা দিলেন সেই ক্রেতা। মূল গেটের পাশে ছোট গেটটার কাছে গিয়ে “দোকানদার ভাই” বলে যখনই না ডাক দিয়েছে, সঙ্গে সঙ্গে কমান্ডো নাইফটা বের করে বেচারার পেটের সামনে ধরে সাইদ বললেন, ‘‘চেঁচামেচি করবেন না ভাই, চুপচাপ ভেতরে ঢুকে পড়ুন।'' আচমকা এই অবস্থায় থতমত খেয়ে যাওয়া লোকটা ভেতরে ঢুকতেই মোমিন তাকে সাদর অভ্যর্থনা জানিয়ে বললেন, ‘‘আসুন, আরেকটু কষ্ট করুন ভাই। ওই পাশের ঘরে গিয়ে বসুন, আরাম করুন। ব্যান্ড পার্টির বাদ্য এই শুনলেন বলে!''

এমনি করে আরও একজনকে নিয়ে ভেতরে ঢোকানো হলো। এদিকে প্রথমবার চার্জ ফিট করার পর পুলু দেখলেন, যেভাবে ফিট করা হয়েছে তাতে ট্রান্সফর্মার বিধ্বস্ত হবে, কিন্তু বেস বার ওড়ানো যাবে না। তাই নতুন পজিশনে চার্জ বসানো হলো। তারপর সবাইকে “ওকে” সিগন্যাল দিলেন তিনি। 

কক্ষের মধ্যে আটক লোকদের হুকুম দিয়ে হানিফ বললেন, ‘‘আপনারা দুই হাতে কান চেপে ধরে মেঝেতে সটান উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ুন। মাথা তুললেই গুলি করব।''

সবাই উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন হানিফ। স্টেশনের ভেতরে থাকলেন কেবল জুয়েল আর পুলু। বাকিরা সবাই গেটের কাছে। রয়ে যাওয়া জুয়েল স্টেনগান হাতে কাভার দিতে থাকলেন পুলুকে। রাত ৮টা ৪৪ মিনিটে পুলু ইগনাইট করলেন, প্রচণ্ড বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল চারপাশ। ছিটকে গিয়ে একটা ট্রান্সফর্মারের মাথা গিয়ে পড়ল পাশের এক বাড়ির টিনের চালে। 

অপারেশনের পর মুহূর্তেই ইন্দ্রপুরী পুকুরের কোণে রেল সড়কের পাশে চলে এলেন গেরিলারা। কয়েকজন চলে গেলেন মালিবাগ চৌধুরীপাড়ায় সাইদের বাসায়, বাকি চারজন রেল সড়ক ধরে রওয়ানা হলেন শাহজাহানপুরের দিকে। গেরিলারা তখনই বুঝতে পেরেছিলেন ট্রান্সফর্মারের মাথাটা ছিটকে পাশের একটা টিনের চালে গিয়ে পড়েছে। সেই ছিটকে যাওয়া অংশের আঘাতে বাড়িটির কারো ক্ষতি হলো কি-না, সেই ভাবনায় অসম্ভব দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন তারা। পরে জানা যায়, ট্রান্সফর্মারের ভগ্নাংশের আঘাতে বাড়িটির বেশ কয়েকজন সদস্য আহত হন এবং একটা বাচ্চা মেয়ের মৃত্যু হয়। এই ধাক্কা তাদের আলোড়িত করেছিল প্রচণ্ডভাবেই! 

কিন্তু যুদ্ধের বাস্তবতা বড় নির্দয় আর করুণ, না চাইতেও অনেক সময় নিরীহ জীবনের প্রদীপ নিভে যায় অজান্তেই। 

পাকিস্তানিদের নির্মম বর্বরতার প্রতিরোধে এই অসমসাহসী অপারেশন কাঁপিয়ে দিয়েছিল হানাদারদের অন্তরে। একটি অবুঝ প্রাণের বিনিময়ে অত্যাচারিত-নিপীড়িত সাধারণ বাঙালির মনোবল বেড়েছিল অনেক। 

সেই অনিচ্ছাকৃত দুর্ঘটনায় নাম না জানা সেই শহিদ শিশুটির জন্য অনেক অনেক ভালোবাসা ও আদর! তোমাদের এই ঋণ কখনো ভুলব না আমরা। 


তথ্যসূত্র: স্বাধীনতা সংগ্রাম ঢাকায় গেরিলা অপারেশন- হেদায়েত হোসাইন মোরশেদ


রা'আদ রহমান, গবেষক ও কলাম লেখক

   

About

Popular Links

x