একাত্তরের ১ নভেম্বর এক জরুরি চিঠি এলো ঢাকার আরবান গেরিলা দলের কাছে। চিঠিটি পাঠানো হয়েছে ঢাকা সদর উত্তর মুক্তিবাহিনীর শিমুলিয়া ক্যাম্প থেকে। চিঠির বক্তব্য: আহত মুক্তিযোদ্ধাদের রক্ত ও ওষুধপত্রের জরুরি দরকার। সেজন্য টাকা প্রয়োজন। যে করেই হোক ব্যবস্থা করতে হবে।
চিঠি পেয়ে বড় মগবাজারের কোনো এক হাইডআউটে গেরিলাদের জরুরি মিটিং বসলো। সিদ্ধান্ত হলো, পাকিস্তানের তৎকালীন অন্যতম ধনী এবং পাকিস্তানি জান্তা সরকারের খুবই বিশ্বস্ত আদমজী পরিবারের ব্যাংক লুট করা হবে। ব্যাংকের নাম ‘‘মুসলিম কমার্শিয়াল ব্যাংক’’। পরদিন মঙ্গলবারেই শেষ করতে হবে রেকির কাজ, অপারেশন হবে বুধবার ৩ নভেম্বরেই! বেলা সোয়া ১১টা থেকে সাড়ে ১১টার মধ্যেই মুসলিম কমার্শিয়াল ব্যাংকের পলওয়েল ব্রাঞ্চে হামলা করতে হবে।
ঠিক হলো আসাদ, মুনীর, ফিরোজ, জন, ফেরদৌস এবং আরিফ এই অপারেশনে অংশ নেবেন। নেতৃত্ব দেবেন আসাদ। কিন্তু গেরিলারা সমস্যায় পড়লেন অপারেশনের গাড়ি নিয়ে। বুধবার সকাল পর্যন্ত একটা গাড়িও ম্যানেজ করা গেল না। বুধবার সকালে আবার বৈঠক বসে তাদের, ঠিক হলো গেরিলা আরিফ তাদের বাড়ির কালো মরিস মাইনর গাড়িটি কোনো এক অজুহাতে নিয়ে আসবেন, সেটা দিয়েই হবে অপারেশন।
গাড়ি নিয়ে এলেন আসাদ। কিন্তু সমস্যা দেখা দিলো গাড়ির নম্বর প্লেট নিয়ে। এই মরিস মাইনর ও তার নম্বর প্লেট খুবই পরিচিত। এই গাড়ি নিয়ে বেরোলে ধরা পড়ে যাওয়ার খুব ভালো সম্ভবনা আছে। ঠিক হলো নম্বরপ্লেট বদল করে ফেলা হবে। সেইমতে এক গেরিলা কালো মাউন্ট পেপারে একটা ভুয়া নম্বর লেখা হলো: ‘‘বগুড়া খ ৫৭৮’’। নওরতন কলোনির এক বাড়িতে গিয়ে ভুয়া নম্বরপ্লেটটি লাগানো হলো গাড়িতে। গেরিলাদের কাছে এই বাড়িটি বেশ পছন্দের ছিল। কারণ বাড়িটির দুইপাশে দুই গেট থাকায় এক গেইট দিয়ে ঢুকে অন্যটি দিয়ে বেরিয়ে ভিন্ন এক রাস্তায় চলে যাওয়া যেত। ফলে দ্রুত শত্রুকে ধোঁকা দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার জন্য এই বাড়িটি খুবই সুবিধাজনক ছিল।
বুধবার সকাল ১১টার দিকে গেরিলা জন ব্যাংক এলাকায় চলে গেল দ্বিতীয় রেকি করার জন্য। তার দায়িত্ব ছিল পুরো এলাকা পর্যবেক্ষণ করা এবং অপারেশনের মূল গ্রুপকে অপারেশন শুরুর প্রয়োজনীয় গ্রিন সিগন্যাল দেওয়া। ঠিক সাড়ে ১১টার সময় নওরতন কলোনি থেকে বেরিয়ে এলো কালো মরিস মাইনর গাড়িটি, গেরিলাদের মধ্যে আসাদের হাতে ছিল স্টেনগান, ফেরদৌসের হাতে ছিল রিভলবার এবং মুনীরের হাতে ডামি রিভলবার! গাড়িতে আরও ছিল ফিরোজ। ওর দায়িত্ব ছিল চারদিকে সতর্ক খেয়াল রাখা।
ঠিক সকাল ১১টা ৪০ মিনিটে গাড়ি এসে থামলো ব্যাংকের সামনে। নির্দিষ্ট অবস্থান থেকে জন সিগন্যাল দিল, দেখে প্রথমে খুবই নিরীহ ভঙ্গিতে ধীরে সুস্থে ফিরোজ নেমে গেল গাড়ি থেকে। ও হাঁটতে শুরু করার কিছুক্ষণ পর খানিক দূরত্ব বজায় রেখে নেমে এলো আরও তিনজন। গাড়িতে বসে রইলো আরিফ, ইঞ্জিন স্টার্ট দিয়ে রাখলো।
ফিরোজ ব্যাংকের সামনে সহজ ভঙ্গিতে ব্যাংকের গেটে দাঁড়িয়ে থাকা অস্ত্রধারী দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করলো, ‘‘টাকা তোলা যাবে?’’ দারোয়ান জবাব দেওয়ার জন্য মুখ খুলেছে কেবল, ঠিক সেই সময় ফিরোজ আচমকা তার ঘাড় বরাবর হাত দিয়ে কারাতের ‘‘রদ্দা’’ কোপ বসিয়ে এক ঝটকায় ছিনিয়ে নিল তার রাইফেলটি। এলিয়ে পড়া দারোয়ানকে পাশে সরিয়ে তার অস্ত্র হাতে দারোয়ানের জায়গায় পজিশন নিয়ে দাঁড়িয়ে গেল ফিরোজ।
ব্যাংকের ভেতর তখন রয়েছে ব্যাংকের ৭ কর্মচারী ও ৪ জন ক্লায়েন্ট। আসাদ স্টেনগান উঁচিয়ে ধরে বললো, ‘‘হ্যান্ডস আপ!’’ কেউ জায়গা ছেড়ে নড়ার চেষ্টা করবেন না। কর্মচারী ও ক্লায়েন্টদের অস্ত্রের মুখের জড়ো করা হলো ক্যাশ-কাউন্টারের পেছনে। মুনীর ম্যানেজারের বুল বরাবর ডামি রিভলবারের নল উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো, যেন সে নড়তে ভুলে যায়।
তারপরের ঘটনা খুবই সংক্ষিপ্ত! ম্যানেজার সাহেব কাঁপতে কাঁপতে বললেন, “দোহাই আমাদের প্রাণে মারবেন না, আপনারা কারা আমরা বুঝতে পেরেছি। কেন আপনারা এই কাজ করছেন, সেটাও আমরা জানি। আমরা আপনাদের পক্ষে আছি।”
পাশ থেকে আরেক কর্মকর্তা তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, ‘‘আমাদের গুলি করবেন না। টাকা নিতে চান, নিন। কিন্তু, কিসে করে নেবেন? কোনো ব্যাগ বা কিছু এনেছেন?’’
গেরিলাদের একজন তার গায়ের জামা খুলে ছুঁড়ে দিলো। ক্যাশ-কাউন্টার থেকে টাকা জড়ো করে জামায় তুলে বোঁচকা বাঁধা হলো। তারপর বিদ্যুতের মতো ছুটে বেরিয়ে গেল গেরিলারা, এক মুহূর্তে হাওয়া!
পুনশ্চঃ সেদিন মুসলিম কমার্শিয়াল ব্যাংক থেকে মোট ১৫,৫২৯ টাকা ছিনিয়ে নিয়েছিল গেরিলারা, যদিও পলওয়েল ব্রাঞ্চ কর্তৃপক্ষ পত্রিকায় ছাপিয়েছিল ১৮,৫০০ টাকার কথা।
তথ্য কৃতজ্ঞতা:
১. স্বাধীনতা সংগ্রাম–ঢাকায় গেরিলা অপারেশন/হেদায়েত হোসেন মোরশেদ
২. ব্রেভ অফ হার্টস/হাবিবুল আলম বীর প্রতীক



