Thursday, May 30, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

দেবতা জানুসের নাম থেকে যেভাবে বছরের প্রথম মাস হলো জানুয়ারি

কখনো কি আপনার মনে প্রশ্ন জেগেছে, কেন ১ জানুয়ারি বছরের প্রথম দিন

আপডেট : ০১ জানুয়ারি ২০২৪, ১২:৩৪ পিএম

বর্ণিল উৎসবে নতুন বছর ২০২৪ বরণ করে নিয়েছে বিশ্ববাসী। বছরের প্রথম মাস হিসেবে জানুয়ারির ১ তারিখে সারা বিশ্বের মানুষ সাড়াম্বরে নতুন বছরকে স্বাগত জানায়। কিন্তু কখনো কি আপনার মনে প্রশ্ন জেগেছে, কেন ১ জানুয়ারি বছরের প্রথম দিন?

কখনো ২৫ মার্চ, আবার ২৫ ডিসেম্বরসহ বিভিন্ন তারিখে বছরের শুরু ধরার ইতিহাস রয়েছে।

মূলত রোমান পেগান উৎসব এবং দুই হাজার বছরেরও বেশি আগে রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার যে ক্যালেন্ডার বা পঞ্জিকা চালু করেছিলেন তার সূত্র ধরেই এমনটা ঘটেছিল।

জানুস

প্রাচীন রোমানদের জন্য, জানুয়ারি মাসটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এ মাসটি ছিল দেবতা জানুসকে উৎসর্গ করা মাস। যার আরেক নাম ইয়ানুরিয়াস, ল্যাটিন ভাষায় যার অর্থ জানুয়ারি।

রোমান পৌরাণিক কাহিনীতে, জানুস হচ্ছেন দ্বিমুখী দেবতা, অর্থাৎ তাকে দুটি মুখ দিয়ে চিত্রিত করা হয়েছে। তাকে রূপান্তরের দেবতাও বলা হয়। অর্থাৎ যেকোনো পরিবর্তনের শুরু এবং শেষের প্রতীক।

ইংল্যান্ডের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডায়ানা স্পেনসার’র মতে, জানুসের দুটি মুখের একটি সামনের দিকে এবং আরকটি পিছনের দিকে ঘোরানো। সামনের মুখটি দিয়ে ভবিষ্যতের দিকে এবং পেছনের মুখটি অতীতের দিকে ফেরানোকে নির্দেশ করে। জানুয়ারি বছরের প্রথম মাস হওয়ার পেছনে অতীত এবং ভবিষ্যৎ - উভয় দিকে তাকানোর একটা সম্পর্ক আছে।

অর্থাৎ, যদি বছরের মধ্যে একটা সময় আসে যখন আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হয় যে “এটাই আবার শুরু করার সময়”, সেক্ষেত্রে জানুয়ারি প্রথম মাস হওয়াটা যৌক্তিক বলে মনে করেন ডায়ানা স্পেনসার।

আবার ইউরোপে জানুয়ারি এমন এক সময় যখন শীতকালের পরের দিনগুলো দীর্ঘ হতে শুরু করে।

এ বিষয়ে অধ্যাপক ডায়ানা স্পেন্সার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে বলেন, “এটি রোমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময় ছিল, কারণ এটি সেই ভয়ানক ছোট দিনগুলোর পরে আসতো, যখন পৃথিবী ছিল অন্ধকার, হীম শীতল এবং যখন ঠান্ডার কারণে কোনো ফসল ফলত না৷”

কেননা, বছরের দীর্ঘতম রাত ২২শে ডিসেম্বর থেকে ক্রমে দিন বড় হতে থাকে, আর জানুয়ারির শুরু থেকে দিনের দৈর্ঘ্য বেড়ে যায় সূর্যের দক্ষিণায়নের ফলে।

এ কারণে অধ্যাপক স্পেন্সারের মতে জানুয়ারি এক ধরনের বিরতি এবং প্রতিফলনের সময়কাল।

২৫শে ডিসেম্বর

সেসময় রোমানরা যতো বেশি ক্ষমতা অর্জন করতে শুরু করে, তারা নিজেদের বিশাল সাম্রাজ্য জুড়ে নিজেদের ক্যালেন্ডার ছড়িয়ে দিতে শুরু করে। কিন্তু মধ্যযুগে রোমের পতনের পর খ্রিস্টধর্ম নিজেদের দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করে এবং তারা দাবি করে যে ১ জানুয়ারি পেগানদের তারিখ।

সেসময় যেসব দেশে খ্রিস্টধর্মের আধিপত্য ছিল, তারা ২৫শে মার্চকে নতুন বছরের শুরু হিসেবে উদযাপন করতে চেয়েছিল। তাদের মতে, সেটি ছিল এমন দিন; যেদিন দেবদূত গ্যাব্রিয়েল ভার্জিন মেরির কাছে উপস্থিত হয়েছিলেন।

স্পেন্সার বিবিসিকে বলেন, “যদিও খ্রিস্টের জন্মের সময় ক্রিসমাস হয়, কিন্তু খ্রিস্টের এ জন্মের ঘোষণাটি মেরির কাছে আরও আগে আসে যে, তিনি ঈশ্বরের এক নতুন অবতারের জন্ম দিতে চলেছেন। সেই মুহূর্ত থেকে যেহেতু খ্রিস্টের গল্পের শুরু হয়েছে, তাই ২৫শে মার্চ থেকে নতুন বছর শুরু হওয়াকে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ ভাবা হয়।”

১ জানুয়ারি যেভাবে প্রথম দিন হলো বছরের

ষোড়শ শতকে পোপ গ্রেগরি ত্রয়োদশ গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার প্রবর্তন করেন এবং ক্যাথলিক দেশগুলিতে ওই সময় থেকে পহেলা জানুয়ারিকে নতুন বছরের শুরু হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা হয়।

আমরা এখন যে ক্যালেন্ডার অনুসরণ করি বা যেটি ইংরেজি বর্ষপঞ্জি হিসেবে চেনেন অনেকে, সেটাই “গ্রেগরিয়ান” ক্যালেন্ডার।

ইতালি, স্পেন এবং পর্তুগালের মতো ক্যাথলিক দেশগুলো তখন দ্রুতই এই নতুন ক্যালেন্ডার গ্রহণ করে। তবে প্রোটেস্ট্যান্ট এবং অর্থোডক্স খ্রিস্টান প্রধান দেশগুলো এটি বেশ দেরিতে গ্রহণ করে।

পোপের কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা এবং প্রোটেস্ট্যান্ট সম্প্রদায়কে গ্রহণ করা দেশ ইংল্যান্ড,  ১৭৫২ সালের আগ পর্যন্ত গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসরণ করেনি। এর আগ পর্যন্ত তারা ২৫ মার্চকেই নববর্ষের প্রথম দিন হিসেবে উদযাপন করত।

১৭৫২ সালে ব্রিটেনের পার্লামেন্টের একটি আইন ব্রিটিশদের ইউরোপের বাকি অংশের সঙ্গে একীভূত করে। এর আগে ১৬৯৯ সালে জার্মানির বিভিন্ন প্রোটেস্ট্যান্ট অধ্যুষিত রাজ্যগুলো নতুন এই বর্ষপঞ্জি গ্রহণ করে।

ব্রিটেনের পর ১৭৫৩ সালে সুইডেন, ১৮৭৩ সালে জাপান, ১৯১২ সালে চীন, ১৯১৮ সালে সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র এবং ইউরোপের সবশেষ দেশ হিসেবে গ্রীস ১৯২৩ সালে এই গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার গ্রহণ করে।

এরপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খ্রিস্টান প্রধান নয় এমন দেশও গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার ব্যবহার করতে শুরু করে।

বর্তমানে বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসরণ করে, আর ঠিক এই কারণেই আমরা ১ জানুয়ারি সারা বিশ্বে নতুন বছরকে বরণের উৎসব দেখি।

জুলিয়ান ক্যালেন্ডার থেকে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার

গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের আগে প্রচলিত ছিল জুলিয়ান ক্যালেন্ডার। রোমান শাসক জুলিয়াস সিজার প্রথম শতকে ওই বর্ষপঞ্জি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যেখানে বছরের সময়কাল ১১ সেকেন্ড বেশি স্থায়ী হয়। সেইসঙ্গে দেখা যায় ক্যালেন্ডারটিতে লিপ ইয়ার বা অধিবর্ষ সংক্রান্ত কিছু ভুল গণনা ছিল। যে কারণে প্রায়শই ঋতুর সঙ্গে এর বিচ্যুতি ঘটত। ফলে বার বার সংশোধন করতে হতো।

এই ভুলের কারণে পরের কয়েক শতক ভুল সময়ে পালিত হয় অনেক উৎসব। বিশেষ করে “ইস্টার”-এর তারিখ নির্ধারণে সমস্যা দেখা দেয়। পাশাপাশি নানাবিধ সমস্যা দেখা দেওয়ায় সেসময় এই ক্যালেন্ডারের কিছু পরিবর্তন অত্যাবশ্যক হয়ে উঠে। ফলস্বরূপ, জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের পরিবর্তন এবং প্রতিস্থাপন হিসেবে চালু করা হয় বর্তমানের গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারটি।

সূর্যের চারপাশে পৃথিবীর কক্ষপথ পরিভ্রমণে ৩৬৫ দিন, পাঁচ ঘন্টা, ৪৮ মিনিট এবং ৪৫.২৫ সেকেন্ড সময় লাগে। বছর এবং দিন তারিখের হিসেব এই পরিভ্রমণের সময়কালকে ঘিরেই নির্ধারণ করা হয়।

বিশ্বকোষ এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা অনুসারে, নতুন এই গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে ৩৬৫ দিনে এক বছর গণনা করা হয়। বাকি যে ঘণ্টা, মিনিট ও সেকেন্ড থাকে সেগুলোকে ভারসাম্যে আনতে প্রতি চার বছর পর পর লিপ ইয়ার থাকে, যেখানে প্রতি চার বছরে একদিন বেড়ে যায়।

মূলত জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের ভুল গণনা সংশোধন বা ঠিক করার জন্য, জার্মান জ্যোতির্বিজ্ঞানী ক্রিস্টোফার ক্ল্যাভিয়াসকে একটি নতুন ক্যালেন্ডার ডিজাইন করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এরপর জ্যোতির্বিজ্ঞানী লুইগি লিলিওর (অ্যালোসিয়াস লিলিয়াস) সুপারিশের ভিত্তিতে তৈরি হয় নতুন ক্যালেন্ডার, যা পরবর্তীতে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার হিসেবে পরিচিতি পায়।

এই পদ্ধতি অনুযায়ী প্রতি চতুর্থ বছর একটি অধিবর্ষ বা লিপ ইয়ার। কিন্তু বেজোড় শতকের বছর অর্থাৎ যেসব বছর ৪০০ দ্বারা বিভাজ্য নয়, সেগুলোকে এই পদ্ধতিতে ছাড় দেওয়া হয়। যেমন ১৬০০, ২০০০, ২৪০০ সালগুলো লিপ ইয়ার ছিল। কিন্তু, ১৭০০, ১৮০০, এবং ১৯০০ বছর লিপ ইয়ারের তালিকা থেকে বাদ যায়। আনুষ্ঠানিকভাবে এ সংশোধনী আনা হয় ১৫৮২ সালের ২৪শে ফেব্রুয়ারি।

পোপের শাসনে এই সংশোধনী গৃহীত হলেও একে ঘিরে ধর্মীয় নেতা এবং পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ দেখা দিয়েছিল তখন। বিশেষ করে প্রোটেস্ট্যান্ট দেশগুলো নতুন ক্যালেন্ডারকে প্রত্যাখ্যান করেছিল।

গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জি যেভাবে সর্বজনীন হলো

গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জির সবচেয়ে বড় দিক হল এটি সর্বজনীন, যেখানে তারিখগুলো কখনোই দিন পরিবর্তন করে না। তবে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসরণ করে, এমন অনেক দেশেরই তাদের নিজস্ব ঐতিহ্যগত বা ধর্মীয় ক্যালেন্ডারও রয়েছে।

যেমন, বাংলাদেশের নিজস্ব বাংলা ১২ মাসের পঞ্জিকা রয়েছে। ১৪শ বছরের বেশি সময় ধরে প্রতিবছর এপ্রিলের মাঝামাঝি বাংলা নববর্ষ পালন করা হয় বাংলাদেশে।

একইভাবে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, মিয়নামার এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী ক্যালেন্ডার ব্যবহার করে থাকে।

এছাড়া ১৯১২ সালে চীন গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার গ্রহণ করলেও তাদের নিজস্ব চন্দ্র বর্ষপঞ্জিও অনুসরণ করে এবং প্রতি ছর চীনসহ বিভিন্ন দেশে চীনা নববর্ষ উদযাপন অব্যাহত রেখেছে।

আবার ইথিওপিয়ার বাসিন্দারা সেপ্টেম্বর মাসে এনকুটাটাশ নামে নিজেদের ঐতিহ্য অনুযায়ী নববর্ষ উদযাপন করে। অন্যদিকে, মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোয় হিজরি নববর্ষ পালন হয়।

তবে, অভ্যন্তরীণ এবং বৈশ্বিক যোগাযোগে দাপ্তরিক কাজ সম্পাদনে বিশ্বজুড়ে মূলত গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারই ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

About

Popular Links