Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

রোজায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেসব ভিন্ন রীতি পালন করা হয়

  • সংস্কৃতিভেদে রমজানে বিভিন্ন দেশে কিছু আলাদা রীতি পালন করা হয়
  • ইফতারের পর হালকা মজা করায় কোনো ক্ষতি নেই বলেই মনে করেন ইরাকিরা
আপডেট : ১২ মার্চ ২০২৪, ০২:৫০ পিএম

শুরু হয়েছে সারাবিশ্বের মুসলমানদের পবিত্রতম মাস রমজান। আরবি বর্ষপঞ্জিকার নবম মাস রমজান। এই মাসটি মুসলমানদের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, মুসলিমদের জন্য নির্ধারিত পাঁচ ফরজের একটি হলো রোজা, যেটি এ মাসেই পালন করা হয়।

ধর্মীয় নিয়ম অনুযায়ী রোজা রাখার নিয়ম একই। তবে সংস্কৃতিভেদে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রমজান মাসে কিছু আলাদা রীতি পালন করা হয়। যেগুলোর সঙ্গে অবশ্য ধর্মীয় কোনো বিধি-বিধানের সম্পর্ক নেই। চলুন বিবিসি’র সৌজন্যে জেনে নেওয়া যাক বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রমজানে প্রচলিত এমন কিছু রীতি সম্পর্কে-

তুরস্ক

রমজানের সময় সেহরির আগে মসজিদের মাইক ব্যবহার করে মানুষজনকে জাগিয়ে তোলা বাংলাদেশে বেশ পরিচিত। বিভিন্ন এলাকায় তরুণদের হাক-ডাকে মুসলিমদের জাগানোর প্রচলনও বেশ পুরোনো। অনেকটা একই রকম প্রথা চালু রয়েছে বিশ্বের মুসলিমপ্রধান দেশ তুরস্কে।

অটোম্যানদের মতো তুর্কিরা ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে “দাভুল” নামের বড় আকারের ঢোল পিটিয়ে মানুষজনকে সেহরির সময় জাগিয়ে তোলে। এর বিনিময়ে বখশিস পায় তারা। এ সময় সেহরিতে জেগে ওঠা মুসলিমরা একসঙ্গে খাওয়ার জন্য তাদের ডাকও দেয়।

অনেকটা একই চর্চা আছে আলবেনিয়ার রোমা মুসলিমদের মধ্যে। ভেড়া বা ছাগলের চামড়ায় আবৃত লোদ্রা নামের ঐতিহ্যবাহী ড্রামের সঙ্গে বিশেষ গীতিনাট্য দিয়ে তারা রমজানে দিনের শুরু এবং শেষ করে।

মিশর, জর্ডান ও মরক্কো

মিশর ও জর্ডানে সেহরির আগে এলাকাভিত্তিক কিছু মানুষ প্রতিবেশীদের ঘুম থেকে ওঠানোর জন্য ডাকেন, যাদের বলা হয় মেসাহারাতি।

মেসাহারাতির কাজ হচ্ছে আশেপাশের রাস্তায় ঘুরে ঘুরে মানুষকে জাগিয়ে তোলার জন্য ডাক দেওয়া। ঢোলের মৃদু শব্দের সঙ্গে তারা ডেকে দেয়ার কাজটি করেন।

একই কাজ করা লোকদের মরক্কোতে ডাকা হয় “নাফারস” নামে। এ সময় তারা ঐতিহ্যবাহী পোশাক “গান্দোরা”, টুপি এবং একজোড়া চপ্পল পরে প্রার্থনার সুরে ধীর গতিতে হাঁটতে থাকে। সাধারণত শহরের লোকেরাই নাফারস হিসেবে কয়েকজনকে নির্বাচন করেন। রমজানের শেষ রাতে মরক্কোর এই দীর্ঘস্থায়ী ঐতিহ্য বজায় রাখার জন্য এই ব্যক্তিদের সম্মানী দেওয়া হয়।

রমজানের ঐতিহ্যগুলোর মধ্যে একটি মিশরের “ফানুস”। এটি মূলত ধাতু ও রঙিন কাঁচ দিয়ে উজ্জ্বল রঙের প্রদীপ বা লণ্ঠন। ধারণা করা হয়, এই ঐতিহ্যের উৎপত্তি ফাতেমীয় সাম্রাজ্য, যখন খেলাফত আল-মুই লি-দিন আল্লাহ কায়রোতে আসার সময় তাকে রঙিন লণ্ঠন দিয়ে স্বাগত জানানো হয়েছিল।

মিশরে রমজানের ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে রাস্তা, বাড়ি এবং পাড়া এই লণ্ঠন দিয়ে আলোকিত করা হয়। স্বতন্ত্র নকশা এবং বিচিত্র কারুকার্যের জন্য পরিচিত লণ্ঠন বৈশ্বিকভাবে মিশরীয় রমজানের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

ইরাক

রমজানে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যে সারাদিনের সংযমের সঙ্গে ইফতারের পর হালকা মজা করায় কোনো ক্ষতি নেই বলেই মনে করেন ইরাকিরা। আর তাই এ সময় তারা খেলেন দেশটির অন্যতম প্রধান একটি ঐতিহ্যবাহী খেলা “মেহাবেস”। একে আংটি খেলাও বলা হয়ে থাকে।

বাড়ির বাইরে কেবল পুরুষরা অংশ নিলেও, ঘরের ভেতর নারীরাও এই খেলায় অংশ নিয়ে থাকে/বিবিসি

৪০ থেকে ২৫০ জন পর্যন্ত খেলাটিতে অংশ নিতে পারে। এ সময় অংশগ্রহণকারীরা দুটো দলে ভাগ হয়ে যায়। পালা করে একটি দল আংটি লুকিয়ে রাখে, এবং অন্যদলের সদস্যদের ধারণা করতে হয় যে আংটিটি কার কাছে আছে। বাড়ির বাইরে কেবল পুরুষরা অংশ নিলেও, ঘরের ভেতর নারীরাও এই খেলায় অংশ নিয়ে থাকে। ইরাকিদের কাছে এই খেলা সবার একত্রিত হয়ে কিছুটা আনন্দে কাটানোর মাধ্যম। যুদ্ধের কারণে অনেক বছর খেলাটি বন্ধ থাকলেও ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখার প্রচেষ্টায় আবার ফেরত আসছে।

লেবানন

কামানে তোপধ্বনি দিয়ে ইফতারের সময় হবার বিষয়টি জানানো হয় লেবাননে। এটি সম্ভবত বিশ্বে প্রচলিত রমজানের প্রাচীনতম ঐতিহ্যের একটি। প্রায় ২০০ বছর ধরে লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশ আজও এই চর্চা চালু রেখেছে, যা “মিদফা আল ইফতার” নামে পরিচিত। তবে, এটি সবসময় লেবাননের রমজানের ঐতিহ্যের অংশ ছিল না। বলা হয়ে থাকে, মিশর থেকে এই প্রথার উদ্ভব। কোন এক রমজান মাসে তৎকালীন শাসক খোশ কদম ঘটনাক্রমে সূর্যাস্তের সময় কামানের একটি গোলা ছোঁড়েন। এর শব্দ কায়রো শহরজুড়ে প্রতিধ্বনিত হয় এবং জনগণ একে রোজা শেষ হওয়ার সংকেত হিসেবে ভুল করে। তবে এই ভুলকেই সবাই খুব প্রশংসা করে এবং শেষমেশ কামানের তোপধ্বনি ঐতিহ্যে পরিণত হয়।

বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন কিছু রীতি পালন করা হয়/বিবিসি

মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ “মিদফা আল ইফতারকে” ইফতারের সময় হওয়ার আনুষ্ঠানিক সংকেত হিসেবে গ্রহণ করেছে। লেবাননে ১৯ শতকের বিশেষ এক কামানই রয়েছে, যা বর্তমানে কেবল এই উদ্দেশ্যেই ব্যবহৃত হয়।

১৯৮৩ সালে লেবাননে আক্রমণের পর কামানকে অস্ত্র হিসেবে বাজেয়াপ্ত করা হয়। ফলে ঐতিহ্যটি হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধের পর লেবানিজ সেনাবাহিনী এই প্রথা পুনরুজ্জীবিত করে যা আজও অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাতেও সেহরি ও ইফতারে কামানের তোপধ্বনি দেওয়া হয়।

সংযুক্ত আরব আমিরাত

রমজান শুরু হওয়ার আগেই সংযুক্ত আরব আমিরাতে চালু হয় “হক আল লায়লা” নামের এক বিশেষ আয়োজন। রমজানের ঠিক আগের মাস অর্থাৎ শাবান মাসের ১৫ তারিখে এটি হয়। এদিন শিশুরা রঙিন কাপড় পরে প্রতিবেশীদের বাড়ি বাড়ি যায়। এ সময় তারা ব্যাগে মিষ্টি সংগ্রহ করে এবং সুর করে বলে "আতোনা আল্লাহ ইউতিকোম, বাইত মক্কা ইউদিকুম”, যার অর্থ "আপনারা আমাদের দিন, আল্লাহ আপনাদের পুরস্কৃত করবেন এবং মক্কা পরিদর্শনের তৌফিক দেবেন।"

“হক আল লায়লা” সংযুক্ত আরব আমিরাতে রমজান পালনের ঐতিহ্য হয়ে উঠেছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো রমজানের গুরুত্ব সম্পর্কে সবার মধ্যে সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়া। সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো কুয়েতেও এটি পালন করা হয়। তবে তা হয় রমজানের মাঝামাঝি সময়ে তিন দিনের উদযাপন। এ সময় শিশুরা তাদের আশেপাশের বাড়ির দরজায় কড়া নাড়তে থাকে এবং মিষ্টি এবং চকলেটের জন্য গান গায়। এই ঐতিহ্যটিকে “গারগিয়ান” বলা হয়।

ইন্দোনেশিয়া

ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপের মুসলমানদের জন্য রমজানের আগে নিজেদের শুদ্ধ করার একটি পদ্ধতি “পাদুসান”। যার অর্থ গোসল করা। রমজান শুরুর আগে ইন্দোনেশিয়ার মুসলমানরা তাদের আশেপাশের প্রাকৃতিক পুকুরে গোসল করে এবং নিজেদের পরিষ্কার করে।

ইন্দোনেশিয়ায় রমজানের আগে নিজেদের শুদ্ধ করার একটি পদ্ধতি ‘পাদুসান’/বিবিসি

এই সাংস্কৃতিক চর্চা রমজান মাসে বিশ্বাসীদের শুদ্ধ করে বলে মনে করেন মুসলিমরা। তবে ইদানীং অনেকেই নিজ বাড়িতেই এই গোসল করেন।

   

About

Popular Links

x