রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে মাঝারি থেকে তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। যা অব্যাহত থাকতে পারে জানিয়ে দেশজুড়ে হিট অ্যালার্ট জারি করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। কোনো বিশাল এলাকাজুড়ে যখন তাপপ্রবাহ হয়, তখন এরকম সতর্কবার্তা দেওয়া হয়।
বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেশি থাকায় এ সময় জনজীবনে অস্বস্তি বেড়েছে বলেও জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। দুর্ভোগ এড়াতে স্কুল কলেজ বন্ধ ঘোষণা করেছে সরকার। তীব্র গরমে সুস্থ থাকতে নানা পরামর্শ দিচ্ছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে, গরমের হাত থেকে বাঁচতে সাধারণ মানুষ চালাচ্ছেন নানা প্রচেষ্টা। গরমে প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ায় বেড়েছে এসি ও ফ্যানের বিক্রি।
তবে গরমের হাত থেকে বাঁচতে এসি বা ফ্যানের পাশাপাশি অনেকেই কিছু প্রচলিত কলাকৌশলের শরণাপন্ন হচ্ছেন।
প্রশ্ন উঠেছে, এসব কলাকৌশল কতটা কার্যকরী? এ ব্যাপারে চিকিৎসকরাই বা কী বলছেন? এসব বিষয়ে জানার চেষ্টা করেছে যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি বাংলা। চলুন, জেনে নেওয়া যাক সে সম্পর্কে-
মাথা ন্যাড়া করা
ছোটবেলায় গরমের ছুটিতে মাথা ন্যাড়া করে দেওয়ার স্মৃতি আছে হয়তো আমাদের সবারই কমবেশি রয়েছে। অভিভাবকদের ভাষ্য, এতে মাথায় বাতাস লাগে, মাথা তেমন ঘামে না।
গরমে চিকিৎসকরাও সাধারণত চুল ছোট রাখার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। তবে, গরমা কমাতে ন্যাড়া হয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই বলেও মত তাদের।
এ বিষয়ে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালের ডার্মাটোলজি বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. রুবাইয়া আলী বিবিসি বাংলাকে বলেন, “চুল ছোট থাকলে কিছুটা আরাম পাওয়া যায়। তবে, এর বাড়তি কোনো হেলথ বেনিফিট (স্বাস্থ্যগত সুবিধা) নেই। যাদের পক্ষে চুলের যত্ন নেওয়া সম্ভব হয় না, তারা চুল ‘ট্রিম’ করে রাখতে পারেন।”
তবে, মাথায় সরাসরি সূর্যালোক যাতে না পড়ে, সেজন্য রোদে বের হলে ক্যাপ বা ছাতা ব্যবহার করতে হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
টক খাওয়া
“টক খেলে গরম কমে”, এরকম একটা ধারণা প্রচলিত রয়েছে। এই গরমে বিক্রি বেড়েছে বিভিন্ন ধরনের জুস ও শরবতের। তবে, মানুষের সবচেয়ে বেশি আগ্রহ কাঁচা আমের জুস বা শরবতের প্রতি। এছাড়া তেতুলের শরবত, লেবুর শরবতের মতো পানীয়েরও বেশ কাটতি থাকে গরমে এই সময়ে। গরমে সাধারণ মানুষের মূল খাবারে ভাতের সঙ্গে টক ডালের বা আচারের উপস্থিতিও বাড়ে।
তবে চিকিৎসকরা বলছেন, টক জাতীয় খাবার গ্রহণের সঙ্গে শরীরের তাপের হ্রাসবৃদ্ধির সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই।
এ বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজে হাসপাতালের চিকিৎসক মোহাম্মদ সালেহ মাহমুদ তুষার বিবিসি বাংলাকে বলেন, “টক জাতীয় খাবার রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে। সে কারণে সাময়িক স্বস্তি বোধ করেন অনেকেই। তবে, এ ধরনের খাবার গ্রহণ করলেই গরম কম লাগবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।”
চা পান
প্রচণ্ড গরমেও চায়ের দোকানগুলোতে ভিড় চোখে পড়ার মতো। এমন ধারণাও প্রচলিত রয়েছে যে, গরম চা খেলে বাইরের গরম কম অনুভূত হবে। তবে চিকিৎসকরা বলছেন, এটা একেবারেই ভুল ধারণা।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথের এক প্রকাশনা বলছে, মানব শরীরে ক্যাফেইন খুব দ্রুত শোষিত হয়। গ্রহণের মাত্র ৪৫ মিনিটের মধ্যেই ৯৯% ক্যাফেইন শোষিত হয়ে যায়।
চা বা কফির ক্যাফেইন দেহকে পানিশূন্য করে ফেলে এবং শরীরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে তোলে। এতে অল্প সময়েই শরীরের তাপমাত্রা অনেকখানি বেড়ে যেতে পারে।
কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞ ও গবেষক ডা. শেখ মইনুল খোকন বিবিসি বাংলাকে জানান, অল্প সময়ে শরীরের তাপমাত্রার পরিবর্তন “হিটস্ট্রোক”র ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। কারণ, চা-কফি পানের পর পাকস্থলীতে গরম পানির বাড়তি তাপ শরীরের ভেতরটাকেও গরম করে তোলে।
তাই এ সময়ে, চা-কফি, অ্যালকোহল, নিকোটিন সবই এড়িয়ে চলতে বলছেন এই চিকিৎসক। তবে, যাদের সকালে বা বিকেলে কিংবা এক কাপ চা না খেলে চলে না। তাদের চা খাওয়ার আগেই খানিকটা পানি পান করে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তার ভাষ্য, এতে তাপমাত্রার ভারসাম্য বজায় থাকবে।
স্যালাইন খাওয়া
গরমের সময় স্যালাইন খাওয়ার প্রবণতা দেখা যায় অনেকের মাঝে। পানিশূন্যতা রোধে স্যালাইনের পাশাপাশি ইলেক্ট্রোলাইট সমৃদ্ধ পানীয়ও গ্রহণ করেন অনেকে।
এ বিষয়ে ডা. সালেহ মাহমুদ তুষার বলেন, “বাইরে যারা কাজ করছেন, তারা যদি বেশি ঘেমে যান, স্যালাইনটা তখন তাদের জন্য বেশি জরুরি। অন্যথায়, কেবল গরম লাগলেই স্যালাইন খাওয়ার প্রয়োজন নেই।”
এছাড়া যাদের ডায়াবেটিস বা কিডনি জটিলতা আছে তাদের চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতিরেকে স্যালাইন না খাওয়াই ভালো।
বারবার গোসল
গরমের দিনে পানিতে নেমে গোসল বা শরীর ভিজিয়ে বসে থাকেন অনেকে। তবে, ব্রিটেনের জাতীয় স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ বা এনএইচএস বলছে, কোথাও পুকুর বা জলাশয় দেখলেই নিজেকে ঠান্ডা করার জন্য সেখানে নেমে পড়বেন না, কারণে তাতে আরও অনেক বেশি বিপদ হতে পারে।
এ বিষয়ে ডা. রুবাইয়া আলী বলেন, “অতিরিক্ত গরম বা ঠান্ডা কোনোটাই ত্বকের জন্য ভালো নয়। ঠান্ডা পানিতে ত্বক শুষ্ক হয়ে যেতে পারে। ত্বকের জন্য উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলোর ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। এতে ত্বক ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
চিকিৎসকদের মতে, গরমে একাধিকবার গোসল করলেও বারবার মাথা না ভেজানোই ভালো। তাতে ঠান্ডাজনিত অসুস্থতা দেখা দিতে পারে।
ত্বক ঠান্ডা রাখতে এ সময়ে শরীরে ঠান্ডা পানি ছিটিয়ে দেওয়া কিংবা স্পঞ্জ করে গা মুছে দেওয়া যেতে পারে বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

ঠান্ডা পানি পান
তীব্র গরমে একটু প্রশান্তির খোঁজে অনেকেই ঠান্ডা পানি পান করেন। তবে, বেশি ঠান্ডা পানি পান করতে মানা করছেন চিকিৎসকরা। এতে ঠান্ডাজনিত সমস্যা প্রকট হতে পারে।
তারা বলছেন, ঠান্ডা পানির কারণে শরীরে তাপমাত্রায় ভারসাম্যহীনতাও দেখা দিতে পারে। ফলে, জ্বর, সর্দি, কাশিতে ভুগতে হতে পারে। পাকস্থলীতে হঠাৎ করে ঠান্ডা পানি প্রবেশ করলে হজমেও ব্যাঘাত ঘটতে পারে।
এসব সমস্যা এড়াতে স্বাভাবিকের চেয়ে অল্প ঠান্ডা পানি পানের পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা।



