Thursday, June 20, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

যেখানকার মানুষ ১০০ বছর বাঁচে

জেনে নিন, তাদের বেশি দিন বাঁচার পেছনের কারণ

আপডেট : ১৪ মে ২০২৪, ০৫:২১ পিএম

জীবন আছে যার, মৃত্যু তার জন্য অবশ্যম্ভাবী। তবু, “জন্মিলে মরিতে হইবে” এই অমোঘ সত্যিটা জেনেও মৃত্যুকে যতটা সম্ভব দূরে সরিয়ে রাখার জন্য মানুষের চেষ্টার অন্ত নেই। কিন্তু ঠেকনো যায় না মৃত্যু। তবে, মানুষ চেষ্টা করলেই তার জীবনে কিছুটা দীর্ঘায়িত করতে পারে। এজন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন।

আর এই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের ক্ষেত্রে কিছু কিছু অঞ্চলের মানুষ আবার একটু বেশি এগিয়ে। বেশি দিন বাঁচার ক্ষেত্রে “ব্লু জোন” হিসেবে পরিচিত অঞ্চলের মানুষেরা বেশি এগিয়ে।

“ব্লু জোন” বলতে মূলত সেসব অঞ্চলকে বোঝায় যেখানকার মানুষের শতবর্ষী হওয়ার হার বেশি। এসব অঞ্চলে পৃথিবীর অন্যান্য অনেক জায়গার তুলনায় ক্রনিক ডিজিজ বা দীর্ঘস্থায়ী রোগের হার কম।

বিশ্বে এমন পাঁচটি “ব্লু জোন” রয়েছে। এর মধ্যে একটি “ব্লু জোন হলো ইকারিয়া দ্বীপ। এজিয়ান সাগরের পূর্ব অংশের গ্রীকের ছোট এ দ্বীপটির স্থায়ী বাসিন্দা আট হাজারের কিছু বেশি।

যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইকারিয়া দ্বীপের এক তৃতীয়াংশ বাসিন্দা ৯০ বছরের বেশি বেঁচে থাকেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, দৃঢ় সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধন, নিয়মিত শরীর চর্চা এবং প্রয়োজন মাফিক ঘুম ইত্যাদি এই দ্বীপের বাসিন্দাদের শতবর্ষী হওয়ার কারণ বলে মনে করা হয়।

ইকারিয়ানদের দীর্ঘায়ু লাভের পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হলো, তাদের খাদ্যাভ্যাস।

মেডিটারেনিয়ান ডায়েট বা ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের খাদ্যাভ্যাস স্বাস্থ্যকর হিসেবে সুপরিচিত। আর এই মেডিটারেনিয়ান ডায়েটের সঙ্গে মিল আছে ইকারিয়া ডায়েটের। এই ডায়েটে স্বাস্থ্যকর চর্বি, প্রচুর আঁশ বা ফাইবার এবং পুষ্টিগুণ সম্পন্ন খাবার অন্তর্ভুক্ত থাকে।

বিবিসি বলছে, ইকিরিয়ানদের এই খাদ্যাভ্যাস ব্যাপকভাবে উদ্ভিজ্জ নির্ভর। বাদাম, আলু, লেবু, শাকসবজি, শস্য এবং বীজে আধিক্য থাকে সেখানে। ফ্যাট বা চর্বির প্রধান উৎস হিসেবে থাকে জলপাই তেল।

তারা দই, পনির, মাছ, পোল্ট্রি এবং রেড ওয়াইন পরিমিত পরিমাণে খায়। আল লাল মাংস খায় খুবই সীমিত পরিমাণে, মাসে কয়েকবার।

গবেষণায় দেখা গেছে, এমন নিয়ম মেনে খাবার নির্বাচনে অনেক রোগের ঝুঁকি কমে যায়। হ্রাস পায় হৃদরোগ, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল, স্থূলতা এবং উচ্চ রক্তচাপের মতো রোগের নেপথ্য কারণগুলো।

সম্প্রতি ডায়ান কোচিলাস নামে একজন গ্রিক-আমেরিকান শেফ “দ্য ইকারিয়া ওয়ে” নামে একটি রান্নার বই লিখেছেন। বইটিতে তিনি ইকারিয়া দ্বীপের বাসিন্দাদের খাবারের আলোকে একটি “ডায়েট প্ল্যান” দিয়েছেন। যারা নিজেদের পাতে মেডিটারেনিয়ান ঘরানার খাবার রাখতে তাদের জন্য পরামর্শ রয়েছে বইটিতে।

প্রশান্তি ও স্বস্তিদায়িনী দ্বীপটির সরল ও মৃদুগতির জীবনের অনুপ্রেরণায়। যেখানে মানুষে মানুষে বন্ধন গড়ে ওঠে খাবার টেবিলকে ঘিরে।

বইটিতে ইকারিয়ানদের নানান রকম খাবারের কথা উল্লেখ করেছেন ডায়ান কোচিলাস।

এতে দই, শসা এবং আখরোট স্যুপের মতো হালকা খাবার, স্ন্যাকস, বড় বা মাঝারি লোকসমাগমের ডিনারের রেসিপি যেমন মিলবে তেমনি পাওয়া যাবে পনিরে ভাজা পিচ এবং আরগুলা সালাদ; রেড ওয়াইনে ভাজা মশলাদার মটরশুটি; পেস্তা-কিসমিসের পোলাওয়ের মত পদ।

এ বিষয়ে ডায়ান কোচিলাস বিবিসিকে বলেন, "লোকে যে পরিমাণ চাপ নেয়, এটা আমাকে রীতিমত অবাক করে। আমেরিকাতে দেখা যায়, স্ট্রেস নিয়ে লোকে নিজের ক্ষতি করে। বেশিরভাগ সময় আমাদের মাথার ভেতরেই কেবল এর অস্তিত্ব থাকে, চিন্তার ধরণের কারণে যা তীব্র হয়। আমার বইয়ের লক্ষ্য, মানুষ যেন নিজের যত্ন সম্পর্কে আরও সচেতন হয়। আমি দেখাতে চাই খাবারও একটা ভালোবাসার নাম।"

শিমজাতীয় খাবারে লুকিয়ে আছে রহস্য

রান্নার বই লেখার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম পিবিএস-এ “মাই গ্রিক টেবিল” নামে একটি রান্নার অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন ডায়ান কোচিলাস। তার আদি নিবাস ইকারিয়াতেই। এখনও বছরের অর্ধেক সময় এখানে কাটে তার। ইকারিয়াতে একটি রান্নার স্কুলও চালান কোচিলাস।

তিনি তার বইয়ে একশোটি প্ল্যান্ট-বেইজড বা উদ্ভিজ্জ উপাদানের রেসিপি অন্তর্ভূক্ত করেছেন।

বইয়ে বলা হয়, ইকারিয়ার নিরামিষ খাবারগুলোতে স্বাস্থ্যের উৎকর্ষ এবং মনের সন্তুষ্টি যেমন আসে, বাস্তবতার বিচারেও এগুলো তৈরি করা সুবিধাজনক।

গ্রিসের অন্যান্য অংশের মতো এই দ্বীপেও কিছু মানুষ এখনও গ্রিক অর্থোডক্স চার্চের দিনপঞ্জি অনুযায়ী উপবাস ব্রত পালন করে থাকে। তাই, বছরের একটা নির্দিষ্ট সময় যেমন লেন্ট (ইস্টারের আগের ৪০ দিনের উপবাস) এর সময় মাংস খায় না।

কোচিলাসের রান্নার বইয়ে যেসব উপাদানের কথা বলা হয়েছে সেগুলো ইকারিয়াতে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। যার মধ্যে রয়েছে দই, বাদাম, মধু, সামুদ্রিক লবণ, জলপাই তেল, বাদাম, টাটকা ভেষজ উপাদান, নানাবিধ শস্য, রসুন এবং বিভিন্ন ধরনের লেবু।

বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের সুপারমার্কেটেই এগুলোর কাছাকাছি পণ্য পাওয়া যাবে বলে “দ্য ইকারিয়া ওয়ে” বইটিতে উল্লেখ করেন কোচিলাস।

বইটিতে সবচেয়ে বেশি রয়েছে শিমজাতীয় রেসিপির কথা।

এর মধ্যে থেকে উদাহরণ হিসেবে বিবিসির প্রতিবেদনে দুয়েকটি রেসিপির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যেগুলোর মধ্যে রয়েছে – মটরশুটি, তাহিনি (এক ধরনের তিল বাটা) এবং দই; ফাভা বিন(বিশেষ জাতের শিমের বিচি) স্টু; মরিচ দিয়ে কিডনি বিন; হলুদ, মৌরি এবং লেটুসসহ ক্যারামেলাইজড জাম্বো বিন।

কোচিলাস বলেন, "শিম বা মটরশুটি কোলেস্টেরল কমিয়ে হৃদযন্ত্রকে রাখে। কারণ এগুলো দ্রবণীয় ফাইবার সমৃদ্ধ, যা কোলেস্টেরলের কণিকার সঙ্গে মিশে সেগুলোকে শরীর থেকে সরিয়ে নেয়।"

টাইপ টু ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিরোধের ক্ষেত্রেও এটি “উপশমকারী” বলে উল্লেখ করেন তিনি।

“ইট বিনস্ অ্যান্ড লিভ লংগার” (শিম/মটরশুটি বিচি খাও, দীর্ঘায়ু হও) কীভাবে ব্লু জোনের মতো খাদ্যাভ্যাসের প্রবক্তাদের জন্য মন্ত্র হয়ে উঠেছে বইয়ে সেটিও ব্যাখা করেন কোচিলাস।

কথাটি মূলত ড্যান বুয়েটনারের। তিনি ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের একজন কর্মী এবং দীর্ঘায়ু বিশেষজ্ঞ।

তার দাবি, প্রতিদিন এক কাপ পরিমাণ শিমজাতীয় বীজ একজন ব্যক্তির আয়ু চার বছর বাড়িয়ে দিতে পারে।

বিশ্বের যেকোনো জায়গাতে ভালো শিমজাতীয় বীজ পাওয়া যাবে উল্লেখ করেন কোচিলাস স্যুপ, সালাদ বা প্রধান খাবারে এই বীজের বহুমুখী ব্যবহার দেখিয়েছেন।

বেগুন, টমেটো, ফেটা পনির (ভেড়া বা ছাগলের দুধ থেকে তৈরি গ্রিক পনির) দিয়ে হোয়াইট বিন স্টু রেসিপি সম্পর্কে কোচিলাস লিখেছেন "এই সাধারণ খাবারটি শাকসবজির সাথে ‘বিন’ এবং ডাল দিয়ে করা অনেক গ্রিক রান্নার একটি। বাড়িতে কেউ করতে চাইলে রেসিপিটির জন্য টিনজাত বিন ব্যবহার করতে পারেন। একটি পুষ্টিকর এবং সুষম খাবার পেয়ে যাবেন তারা “

“দ্য ইকারিয়া ওয়ে”তে ডায়ান কোচিলাস বিভিন্ন গ্রিক নীতির কথাও উল্লেখ করেছেন। তেমনই একটি হলো “কালি অরেক্সি”। খাওয়ার সময় পরস্পরকে এটি বলার প্রচলণ রয়েছে গ্রিক সমাজে। যার অর্থ হলো, “খাবার উপভোগ করুন!”

About

Popular Links