Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

বাগেরহাটে তৈরি কাঠের বাড়ি যাচ্ছে ইউরোপে

পরিবেশবান্ধব বসতবাড়ি যাবে বেলজিয়ামের পাইরি ডাইজা ইকো পার্কে

আপডেট : ২৩ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৫:১৪ পিএম

কেউ তৈরি করছেন বসতঘরের দরজা জানালা, কেউ ফ্রেম আবার কেউ তৈরি করছেন দেওয়াল। সবশেষে দক্ষ শ্রমিকদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় রঙ পালিশে তৈরি হচ্ছে নান্দনিক ও পরিবেশবান্ধব কাঠের বসতবাড়ি। ঘরের ভেতর-বাইরে এমন সুন্দর কারুকাজ, যা প্রথম দৃষ্টিতেই মন কাড়ে। এমন দৃশ্য দেখা যায় বাগেরহাট সদর উপজেলার প্রত্যন্ত কররী গ্রামের একটি ফার্নিচারের কারখানায়।

বাগেরহাট-খুলনা মহাসড়কের সিঅ্যান্ডবি বাজার সংলগ্ন এ গ্রামের ন্যাচারাল ফাইবার নামের কারখানায় তৈরি বাড়িগুলো রপ্তানি করা হবে ইউরোপের দেশ বেলজিয়ামের পাইরি ডাইজা ইকো পার্কে। আশপাশের এলাকা থেকে সংগ্রহ করা কাঠ দিয়ে বসতবাড়ি তৈরি হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটিতে।

কাঠের তৈরি এ বাড়ির কাঠামো, দেয়াল, দরজা-জানালা এমনকি ছাদও কাঠের তৈরি। প্রথমে কাঠ কেটে ও সাইজ করে পুরো বাড়িটি তৈরি করেন শ্রমিকরা। বাড়িটি ১১ মিটার লম্বা এবং চওড়া সোয়া ৪ মিটার। সম্পূর্ণ কাঠের তৈরি। পরে বিভিন্ন অংশকে ছোট আকারের করা হয়। ফলে পুরো বাড়িটিকে স্বল্প স্থানে সহজে পরিবহন করা যায়। পরবর্তীতে এ খন্ডাংশগুলো জুড়ে যেকোনো জায়গায় স্থাপন করা সম্ভব।

ন্যাচারাল ফাইবার প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা মোস্তাফিজ আহমেদ বলেন, “পরিবেশের ক্ষতি করে না এমন পণ্য ব্যবহার করে তৈরিকাঠের ঘর ইউরোপের দেশ বেলজিয়ামে যাচ্ছে চলতি বছরের প্রথমদিকে।”

১২০টি বসতবাড়ি তৈরির অর্ডার পান বাগেরহাট বিসিক শিল্পনগরীর উদ্যোক্তা মোস্তাফিজ। এরপর পরিবেশবান্ধব বসতবাড়ির তৈরির উদ্যোগ নেন তিনি।

ব্যবসায়ী মোস্তাফিজ আহমেদ বলেন, “বেলজিয়ামের একটি ইকো পার্কের জন্য বায়াররা অর্ডার দিয়েছেন। পরিবেশবান্ধব কাঠের তৈরি এ রকম ১২০টি বসতঘর তাদের প্রয়োজন, যা আগামী দুই বছরের মধ্যে বেলজিয়ামে পাঠানো হবে। আমাদের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাদের চুক্তি হয়েছে। দেশি মেহগনি কাঠ দিয়ে এই ঘরগুলো তৈরি করতে হবে। এ ছাড়া, এসব বাড়ির কাঁচামাল পরিবেশে মিশে যায় এমন হতে হবে। পরিবেশের ক্ষতি হয়, এমন কোনো পণ্য ব্যবহার করা যাবে না।”

পরিবেশবান্ধব এই বাড়ি রপ্তানির মাধ্যমে নতুন বাজার সৃষ্টি, কর্মসংস্থান তৈরি ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের নতুন পথ উন্মোচিত হতে যাচ্ছে। সরকারি পৃষ্টপোষকতা পেলে এই উদ্যোগ আরও একধাপ এগিয়ে যাবে। প্রথমবারের মতো নিজ দেশের এই পণ্য ইউরোপের বাজারে রপ্তানিতে সম্পৃক্ত থাকতে পেরে শ্রমিকরাও খুশি।

কাঠমিস্ত্রি মোজাহিদ বলেন, “আমাদের প্রথমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তারপর ডিজাইন দেখে সম্পূর্ণ একটি বসতঘর তৈরি করেছি। এরপর কোম্পানি ও বিদেশি লোকজন দেখে পছন্দ করেছেন। এখন আমরা পুরোদমে কাজ শুরু করেছি। আবহাওয়া অনুকূলে  থাকলে প্রতিটি বসতঘর তৈরি করতে এক সপ্তাহ সময় লাগে। প্রায় ২০০ জন শ্রমিক এই বাড়ি তৈরির কাজ করছেন।”

কারখানার শ্রমিক শরিফুল ইসলাম বলেন, “আমরা আগে কখনো এই ঘর তৈরি করিনি। এখন দেখছি খুবই সুন্দর হয়েছে ঘরগুলো। সম্পূর্ণ কাঠ দিয়ে এভাবে ঘর তৈরি করা যায় কখনও ভাবতেও পারিনি।”

বাড়ির দুইটি বেডরুম, মোট পাঁচজন থাকার উপযোগী। সম্পূর্ণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। ঘরের একপাশে একটি বারান্দা, বেডরুমের সঙ্গে বাথরুম ও বসার ঘর রয়েছে। বসার ঘরে টেলিভিশন দেখার ব্যবস্থা এবং ঘরের ভেতরেই রান্না করারও ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ঘরের প্রতিটা অংশ খুলে প্যাকিং করে পাঠানো হবে বেলজিয়ামে।

সাইফুল নামের অপর এক শ্রমিক বলেন, “আমাদের হাতে তৈরি কাঠের ঘর বিদেশে যাচ্ছে, এটা আমাদের জন্য গর্বের। আমরা এই ঘর তৈরি করতে পেরে খুবই আনন্দিত।”

জানা গেছে, চলতি বছরের শুরুর দিকে গ্রিসের কোকোম্যাট নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বেলজিয়াম থেকে কাঠের ঘর তৈরির অর্ডার পায় বাগেরহাটের ন্যাচারাল ফাইবার নামের প্রতিষ্ঠানটি। এরপর থেকে কাঠের ঘরের স্যাম্পল তৈরি শুরু হয় প্রতিষ্ঠানটিতে। কাঠের তৈরি স্যাম্পল ঘরটি ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানের পছন্দ হওয়ায় চুক্তি অনুযায়ী আগামী বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের জুন মাসের মধ্যে ১২০টি ঘর তৈরি করে রপ্তানির জন্য কাজ শুরু হয় ।

পাইরি ডাইজা ইকো পার্কের প্রধান স্থপতি পেসেল ডি বেক বলেন, “আমরা এখানে এসেছি কারণ এখানের মানুষ কারুশিল্পে দক্ষ। এছাড়া এই এলাকার কাঠও খুবই উন্নত। আমরা এই কাঠের বাড়িগুলোয় থেকেছি। অবশ্যই মশার ভয় ছিল। আমাদের দেশে এত মশা নেই। তবে আমরা বাড়িগুলোতে থেকে খুবই শান্তি পেয়েছি।”

   

About

Popular Links

x