Wednesday, July 22, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

শুধু মে মাসেই ফোটে যে ফুল

মে ফ্লাওয়ার যেন প্রকৃতির দেওয়া এক নিখুঁত উপহার

আপডেট : ১২ মে ২০২৫, ০৮:২৫ পিএম

প্রকৃতি যেন সময়ের এক নিখুঁত ঘড়ি। ঋতু বদলের সঙ্গে সঙ্গে ফুলের বাহারও বদলায়—গ্রীষ্মে কৃষ্ণচূড়া, বর্ষায় কদম, শরতে কাঁশফুল আর শীতে চন্দ্রমল্লিকা। কিন্তু এমন একটি ফুল আছে, যা বছরের দীর্ঘ সময় নিদ্রায় থাকে, আর হঠাৎ মে মাসে জেগে ওঠে—নিজেকে মেলে ধরে মাত্র এক থেকে দুই সপ্তাহের জন্য। এই বিস্ময়কর ফুলটির নামই যেন তার পরিচয়—মে ফ্লাওয়ার।

সময়ের নিঃশব্দ অনুসারী

প্রতি বছর ইংরেজি ক্যালেন্ডারের পঞ্চম মাসে, মে মাসের শুরু থেকে মাঝামাঝি দিকের সময়ে ফুটে ওঠে এই ফুল। এরা এতটাই সময়নিষ্ঠ যে প্রতিবছর প্রায় একই সময়ে প্রথম ঝলক মেলে। যেন প্রকৃতি নিজেই ক্যালেন্ডার মিলিয়ে জানিয়ে দেয়—“এখন মে মাস চলছে।”

লাল-গোলাপি বল আকৃতির এই ফুলের কোনো গন্ধ নেই, কিন্তু রয়েছে অপার নান্দনিকতা। একে অনেকে “ফায়ার বল লিলি”, “টর্চ লিলি”, “আফ্রিকান ব্লাড লিলি”, কিংবা “ফুটবল লিলি” নামেও চেনে।

সাধারণত মে ফ্লাওয়ার ১০০ থেকে ২০০টির মতো ছোট ছোট ফুলের সমন্বয়ে গঠিত গোলাকার, যার মাথায় থাকে হলুদ রংয়ের পুংকেশর। গাছটির বৈজ্ঞানিক নাম Haemanthus multiflorus। Maryllidaceae পরিবারভুক্ত এই গাছের আদি নিবাস পশ্চিম আফ্রিকা হলেও বর্তমানে তা পূর্ব ভারত, মিয়ানমার, ইন্দোনেশিয়া এবং বাংলাদেশের পরিবেশেও মানিয়ে নিয়েছে ভালোভাবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান গবেষণা কর্মকর্তা মো. আব্দুর রহিম জানান, এ ফুলের কান্ড ১০-১২ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হয়। পাতাগুলো সবুজ, নরম ও রসালো। কন্দ ও বীজের মাধ্যমে এটি বংশবিস্তার করে।

বছরের অধিকাংশ সময় গাছটি টবের মাটির নিচে সুপ্ত থাকে। এপ্রিলের দিকে পেঁয়াজের মতো মাথা উঁকি দেয়। এরপর ধীরে ধীরে পাতাসহ কান্ড বের হয়। মে মাসের প্রথম দিনেই দেখা মেলে পূর্ণ বিকশিত ফুলের। ফুল ঝরে যাওয়ার অনেকদিন পর পর্যন্ত সবুজ পাতা টবজুড়ে ছড়িয়ে থাকে।

ফুল ফোটা শেষে গাছে ফল ধরে। ফল গোলাকার থেকে লম্বা হয়। রং গাঢ়-ধূসর ও শক্ত। কন্দ ও বীজের মাধ্যমে এ ফুলের বংশবিস্তার ঘটে।

সৌরভহীন মে ফ্লাওয়ারের শোভা সম্পর্কে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মো. সৌরভ বলেন, "আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেনে বাহারি রঙের ফলজ, বনজ, ম্যানগ্রোভ, নগ্নবীজী, আবৃতবীজী ও আলংকারিক উদ্ভিদের  সমারোহ রয়েছে। লালচে বল আকৃতির দেখতে বলে এই ফুলকে ফায়ার বল লিলি, টর্চ লিলিও বলা হয়। পরবর্তীতে জানতে পারি ফুলটির নাম 'মে ফ্লাওয়ার'। এমন নাম শুনে শুরুতে কিছুটা বিস্মিতও হয়েছিলাম।”

নান্দনিক, তবে সাবধানতা জরুরি

মে ফ্লাওয়ার যেমন নান্দনিক তেমনি তার রয়েছে এক বিপজ্জনক দিক। ভুলবশত কখনো এই ফুল মুখে নিয়ে ফেললে তীব্র বিষক্রিয়া হতে পারে। গৃহপালিত প্রাণী—বিশেষ করে ছাগল ও ভেড়ার শরীরে বিষক্রিয়া দেখা দিতে পারে, যা প্রাণঘাতীও হতে পারে। আফ্রিকায় একসময় এর কষ ব্যবহৃত হতো শিকারের তীরে কিংবা মাছ ধরার যন্ত্রে।

মে ফুল সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাইলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. ছালেহ আহাম্মদ খান বলেন, “মে ফুল প্রায় ৩ সেমির মতো চওড়া হয়। এর পাতাও খুব সুন্দর।  ফুলটি সাধারণত মে মাসে ফুটলেও পুরো মাসজুড়ে স্থায়ী হয় না। সাধারণত এক থেকে দুই সপ্তাহ পর্যন্ত থাকে।”

মে ফ্লাওয়ার যেন প্রকৃতির দেওয়া এক নিখুঁত উপহার। প্রতিবছর মে মাসে আবির্ভূত হয়ে এই ফুল যেন হয়ে ওঠে অপেক্ষার আরেক নাম। সেই অনন্য সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে অনেকেই বাড়ির সামনের আঙিনা, ছাদ বাগান কিংবা ব্যালকনিতে মে ফ্লাওয়ারের টব স্থান দিচ্ছেন। সময়নিষ্ঠ ফোটার বিস্ময় আর অপার সৌন্দর্য্য যেন প্রতিনিয়তই পুষ্পপ্রেমীদের হৃদয়ে দাগ কেটে যাচ্ছে।

   

About

Popular Links

x