যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের মোহাভি মরুভূমিতে অবস্থিত এডওয়ার্ডস এয়ার ফোর্স বেসে একটি বি-৫২ স্ট্র্যাটোফোর্ট্রেস বোমারু বিমান বিধ্বস্ত হয়ে আট আরোহীর মৃত্যু হয়েছে। উড্ডয়নের পরপরই বিমানটি রানওয়েতে আছড়ে পড়ে এবং এতে আগুন ধরে যায়। যুক্তরাষ্ট্র স্থানীয় সময় সোমবার (১৫ জুন) এ দুর্ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছে মার্কিন বিমানবাহিনী।
দুর্ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিমানবাহিনীর কর্নেল জেমস হেইস জানান, আট ইঞ্জিনবিশিষ্ট জেটচালিত বিমানটি একটি নিয়মিত পরীক্ষামূলক ফ্লাইট পরিচালনা করছিল। উড্ডয়নের কিছুক্ষণের মধ্যেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এটি এডওয়ার্ডস ঘাঁটির রানওয়েতে বিধ্বস্ত হয়। দুর্ঘটনার পর সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ড থেকে ঘন কালো ধোঁয়ার বিশাল কুণ্ডলী আকাশে ছড়িয়ে পড়ে, যা বহু দূর থেকেও দেখা যায়।
বিমানটিতে সামরিক সদস্যদের পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তা, বেসামরিক বিশেষজ্ঞ এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা ছিলেন। বিমানটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে তাদের দুজন কর্মীও রয়েছেন। জানা গেছে, ফ্লাইটটি একটি রাডার আধুনিকীকরণ প্রকল্পের পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের অংশ ছিল। তবে কী কারণে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
নিহতদের পরিচয় এখনো প্রকাশ করা হয়নি। বিমানবাহিনী জানিয়েছে, নিহতদের পরিবারের সদস্যদের আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করার প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের নাম প্রকাশ করা হবে না।
ঘটনাস্থলের আকাশপথের ভিডিওতে দেখা গেছে, লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে প্রায় ১৬১ কিলোমিটার উত্তরের মরুভূমি এলাকায় ব্যাপক অগ্নিকাণ্ডের চিহ্ন রয়েছে। একটি বড় এলাকা পুড়ে কালো হয়ে গেছে এবং এখনো সেখান থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার আয়তন একটি ফুটবল মাঠের চেয়েও বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। দুর্ঘটনাস্থলের আশপাশে জরুরি সেবা সংস্থার যানবাহন মোতায়েন করা হয়েছে।
এডওয়ার্ডস এয়ার ফোর্স বেস যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। ১৯৩০-এর দশকে একটি শুকনো হ্রদাঞ্চলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই ঘাঁটির আয়তন প্রায় ১ হাজার ২৪৫ বর্গকিলোমিটার, যা এটিকে বিমানবাহিনীর বৃহত্তম ঘাঁটিগুলোর একটি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
ঐতিহাসিকভাবেও ঘাঁটিটির গুরুত্ব অপরিসীম। ১৯৪৭ সালে কিংবদন্তি পরীক্ষামূলক পাইলট চাক ইয়েগার এখান থেকেই বেল এক্স-১ বিমানে শব্দের গতি অতিক্রমের ইতিহাস গড়েন। পরবর্তী সময়ে এক্স-১৫ পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন কর্মসূচি এবং নাসার স্পেস শাটলের প্রথম অবতরণও এই ঘাঁটিতে সম্পন্ন হয়।
বি-৫২ স্ট্র্যাটোফোর্ট্রেস দীর্ঘপাল্লার সাবসনিক বোমারু বিমান হিসেবে কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিমানটি প্রায় ৩১ হাজার ৭৫০ কেজি অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম বহনে সক্ষম। ক্লাস্টার বোমা, নির্ভুল নির্দেশিত ক্ষেপণাস্ত্র, প্রচলিত বোমা এবং পারমাণবিক ওয়ারহেডসহ বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র বহনের ক্ষমতা রয়েছে এর।
বিমানবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, বি-৫২ সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ১৬৬ মিটার উচ্চতায় উড়তে পারে এবং আকাশে পুনরায় জ্বালানি গ্রহণ ছাড়াই আট হাজার মাইলের বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে সক্ষম। আন্তর্জাতিক বিমান দুর্ঘটনা তথ্যভাণ্ডার অনুসারে, এর আগে ২০১৬ সালে গুয়ামে একটি বি-৫২ বিমান বিধ্বস্ত হয়েছিল। তবে সে ঘটনায় বিমানে থাকা সাতজনই প্রাণে বেঁচে যান।
বর্তমানে মার্কিন বিমানবাহিনীর বহরে কেবল বি-৫২ এইচ (H) মডেলগুলো সক্রিয় রয়েছে। বিধ্বস্ত বিমানটি এডওয়ার্ডসভিত্তিক ৪১২তম টেস্ট উইংয়ের অধীনে পরিচালিত হতো। অন্যদিকে অধিকাংশ বি-৫২ বোমারু বিমান বর্তমানে নর্থ ডাকোটা ও লুইজিয়ানার ঘাঁটিগুলোতে মোতায়েন রয়েছে।



