অর্থের বিনিময়ে সরাসরি নাগরিকত্ব বা ‘গোল্ডেন পাসপোর্ট’ বিক্রির লাভজনক কর্মসূচি বন্ধ করতে পূর্ব ক্যারেবিয়ান অঞ্চলের পাঁচটি দেশকে চূড়ান্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)।
ব্রাসেলস থেকে পাঠানো এক কড়া চিঠিতে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, আগামী ২০২৮ সালের ১ জুনের মধ্যে এই কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ না করলে শেনজেনভুক্ত দেশগুলোতে এসব দেশের নাগরিকদের ভিসা-মুক্ত যাতায়াতের সুবিধা সম্পূর্ণ বাতিল করা হবে।
আলটিমেটাম পাওয়া দেশগুলো হলো - অ্যান্টিগুয়া অ্যান্ড বারবুডা, ডমিনিকা, গ্রেনাডা, সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস এবং সেন্ট লুসিয়া।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট-এর প্রতিবেদনে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
কেন এই কঠোর সিদ্ধান্ত?
ইইউ দীর্ঘদিন ধরেই এই ‘সিটিজেনশিপ-বাই-ইনভেস্টমেন্ট’ (সিবিআই) কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। সমালোচক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রক্রিয়ায় আবেদনকারীদের তথ্য সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই (ভেটিং) করা হয় না। ফলে এর আড়ালে অর্থ পাচার, সন্ত্রাসে অর্থায়ন, পরিচয় জালিয়াতি এবং অবৈধ অভিবাসনের ঝুঁকি ব্যাপক বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল এর প্রতিনিধি হিউ জর্গেনসেন বলেন, “এখানে মূলত নির্দিষ্ট দেশের নাগরিকত্ব বিক্রি করা হচ্ছে না, বরং অন্য দেশগুলোতে (বিশেষ করে ইউরোপে) বিনা ভিসায় প্রবেশের অধিকার বিক্রি করা হচ্ছে।”
মাত্র ২ লাখ ডলারে মিলছে নাগরিকত্ব
এই দ্বীপ রাষ্ট্রগুলো থেকে ন্যূনতম ২ লাখ ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা) খরচ করে যেকোনো বিদেশি নাগরিক পাসপোর্ট কিনতে পারেন। এই পাসপোর্টের সুবাদে ইউরোপের অধিকাংশ দেশসহ বিশ্বের ১৪০টিরও বেশি দেশে ভিসা ছাড়াই ভ্রমণ করা যায়।
ইউরোপীয় কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ১ লাখেরও বেশি বিদেশি নাগরিককে এই প্রক্রিয়ায় পাসপোর্ট দেওয়া হয়েছে। আবেদনকারীদের সিংহভাগই চীন, সিরিয়া, ইরাক ও নাইজেরিয়ার নাগরিক - যাদের জন্য সাধারণত ইউরোপে প্রবেশের ক্ষেত্রে কঠোর ভিসা নীতি রয়েছে।
অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা
এই ‘গোল্ডেন পাসপোর্ট’ কর্মসূচি বন্ধ হলে ছোট এই দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোর অর্থনীতি পুরোপুরি ভেঙে পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য অনুযায়ী:
২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে এই পাঁচ দেশের গড় জিডিপির (GDP) প্রায় ৬.৫% এসেছে পাসপোর্ট বিক্রির টাকা থেকে।
২০২২ সালে ডমিনিকার জিডিপির ৩০% এর বেশি এসেছে এই খাত থেকে। অ্যান্টিগুয়া অ্যান্ড বারবুডার মোট অ-কর রাজস্বের প্রায় ৬০% আসে এই কর্মসূচি থেকে।
দেশগুলোর সরকার জানিয়েছে, এই অর্থ দিয়ে তারা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতিপূরণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, আবাসন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো মৌলিক খাত পরিচালনা করে। বিকল্প কোনো আয়ের উৎস ছাড়া হুট করে এটি বন্ধ হলে দেশগুলো দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
পাল্টা লড়াইয়ে ক্যারেবিয়ান রাষ্ট্রগুলো
ইইউ-এর এই চিঠির জবাবে যৌথ কূটনৈতিক লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে দেশগুলো। সম্প্রতি ডমিনিকায় এক জরুরি বৈঠকে মিলিত হয়ে ৫ দেশের প্রধানমন্ত্রীরা ব্রাসেলসে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই দল ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেইন এবং ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তাসহ শীর্ষ ইইউ কর্মকর্তাদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা করবে।
দেশগুলোর পক্ষে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে যে, বিশ্বজুড়ে অর্ধেকেরও বেশি দেশ ভিন্ন ভিন্ন নামে বিনিয়োগের বিনিময়ে আবাসন বা নাগরিকত্ব দিচ্ছে, এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও ‘ট্রাম্প গোল্ড কার্ড’-এর মতো কর্মসূচি রয়েছে। তাই শুধু তাদের ওপর এই নিষেধাজ্ঞা চাপানো অন্যায়।
বিশ্বজুড়ে বাড়ছে কড়াকড়ি
ক্যারেবিয়ান এই পাসপোর্টের ওপর বৈশ্বিক চাপ নতুন নয়। ২০১৭ সালে কানাডা এবং ২০২৩ সালে যুক্তরাজ্য ডমিনিকা ও সেন্ট লুসিয়ার নাগরিকদের ভিসা-মুক্ত সুবিধা বাতিল করে। চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রও এদের ওপর নির্দিষ্ট ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত করেছে এবং নিরাপত্তা বাড়াতে নতুন বায়োমেট্রিক তথ্য আদান-প্রদান চুক্তি সই করেছে। ইইউ-এর এই নতুন আলটিমেটাম মূলত সেই কড়াকড়ির পালে নতুন হাওয়া দিল।



