গোপনে উপসাগরীয় দুই দেশ বাহরাইন ও কুয়েত যুদ্ধবিমান মোতায়েন করে ইরানের অভ্যন্তরে সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে।
শুক্রবার (২৪ জুলাই) যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের বরাতে জানা গেছে।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, তেহরানের ওপর এটিই এই দেশগুলোর প্রথম সরাসরি পাল্টা হামলা।
তারা জানান, চলতি মাসের শুরুর দিকে চালানো এই বিমান হামলায় মূলত ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র মজুতের ডিপোসহ একাধিক সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়।
ইরানকে মোকাবিলায় আরব দেশগুলোর মধ্যে গড়ে ওঠা নতুন সহযোগিতার ইঙ্গিত দিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) এই অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। যুদ্ধের শুরুর দিকে ইরানে একাধিকবার হামলা চালানো আরব আমিরাত লক্ষ্যবস্তুর গোপন সামরিক তথ্য সরবরাহের পাশাপাশি আক্রমণকারী যুদ্ধবিমানগুলোকে আকাশপথে প্রতিরক্ষামূলক সুরক্ষা দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রতিক্রিয়ায় টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে বাহরাইন ও কুয়েতে হামলা চালিয়ে আসছে ইরান। দুটি দেশেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। পারস্য উপসাগরীয় দেশ দুটির বিমানবাহিনী আকারে ছোট, যদিও তাদের বহরে মার্কিন ও ইউরোপীয় যুদ্ধবিমান আছে।
আরব আমিরাত বলেছে, উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি উন্মুক্ত রাখাসহ এ অঞ্চলে উত্তেজনা কমানোর পক্ষে তারা। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কুয়েত ও বাহরাইনে ইরানি হামলার নিন্দা জানিয়ে দেশ দুটির সঙ্গে পূর্ণ সংহতি প্রকাশের পাশাপাশি তাদের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় নেওয়া সব পদক্ষেপে সমর্থন জানিয়েছে।
তবে এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত কুয়েতের রাষ্ট্রদূত তার দেশের ইরানে হামলার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।
রাষ্ট্রদূত আল-জেইন আল-সাবাহ বলেন, “কুয়েত রাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক অভিযানে অংশ নেয়নি। এমনকি প্রতিবেশী কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অভিযান চালাতে নিজের ভূখণ্ড ব্যবহারের অনুমতিও দেয়নি।”
এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য যোগাযোগ করা হলেও বাহরাইন সরকারের কোনো প্রতিনিধি সাড়া দেননি।
বস্তুত পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলেই একই রকম উভয়সংকট স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একদিকে অনিচ্ছাকৃত যুদ্ধ, অন্যদিকে ভৌগোলিকভাবে বিশাল ও ক্ষুব্ধ প্রতিবেশী ইরান - এই দুইয়ের মাঝখানে পড়ে গেছে আরব সরকারগুলো। পুরো যুদ্ধজুড়ে ইরানের সামরিক আঘাতের সিংহভাগ মাশুল গুনতে হয়েছে এই দেশগুলোকেই। দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের কারণে হুমকিতে পড়েছে তাদের নিরাপত্তা ও অর্থনীতি।
ব্লুমবার্গ ইকোনমিকসের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষক দিনা এসফান্দিয়ারি বলেন, “যুদ্ধ যেভাবে গড়াচ্ছে, তা এভাবে চলতে থাকাটাই তাদের জন্য সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি। কারণ অশান্ত এই অঞ্চলে নিজেদের ‘স্থিতিশীলতার প্রতীক’ হিসেবে টিকিয়ে রাখা বা সেই ভাবমূর্তি বজায় রাখার সুযোগও তারা পাচ্ছে না।”
একেবারে শুরুর দিকেই এ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল আরব আমিরাত। যুদ্ধের সূচনালগ্ন থেকে শুরু করে এপ্রিলে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরদিন পর্যন্ত তারা ইরানের ওপর কয়েকবার বিমান হামলা চালিয়েছে।
গত কয়েক সপ্তাহে আমিরাতে সরাসরি হামলা চালানো থেকে মোটামুটি বিরত থেকেছে ইরান। তবে চলতি মাসের শুরুতে আমিরাতের দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে তেহরান।সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছে কুয়েত ও বাহরাইন।
বিশ্লেষক এসফান্দিয়ারি জানান, কয়েক দশক ধরেই ইরানের সঙ্গে এই দেশ দুটির সম্পর্ক ভালো নয়। আর সাম্প্রতিক এই সংঘাতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ; কারণ যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে এই দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে আঘাত হানার জন্য হামলার মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে ইরান।
গত রবিবার কুয়েতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরান তাদের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও পানি লবণমুক্তকরণ পরিশোধনাগারে হামলা চালিয়েছে। এই আক্রমণকে নিজেদের নাগরিকদের জন্য সরাসরি হুমকি ও উত্তেজনার বিপজ্জনক বৃদ্ধি বলে উল্লেখ করেছে তারা।
ওমান ও কাতারের মতো দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরেই ইরান ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে এক ধরনের ত্রিমুখী কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখে চলেছে। তেহরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়ানোর আগ্রহ তাদের নেই। অন্যদিকে যুদ্ধের শুরুর দিকে আমিরাতের সঙ্গে মিলে যৌথভাবে ইরানে হামলা চালিয়েছিল সৌদি আরব। তবে সূত্র জানিয়েছে, রিয়াদ এখন নিজেদের অবস্থান নতুন করে মূল্যায়ন করছে।
হরমুজ প্রণালি কার্যত অবরুদ্ধ করে রেখেছে ইরান। ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল রপ্তানিতে এর প্রভাব পড়েছে। চলতি সপ্তাহে সৃষ্টি হয়েছে নতুন হুমকি - ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠীদের লোহিত সাগরে অবরোধ ও জাহাজে হামলা। এ অঞ্চলের পর্যটন খাত বিধ্বস্ত হয়ে গেছে; সেইসঙ্গে চাপে পড়েছে বিদেশি বিনিয়োগ।



