গাজায় অস্ত্র সমর্পণ ও যুদ্ধ-পরবর্তী শাসনব্যবস্থা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনায় নীতিগতভাবে সম্মতি দিয়েছে হামাস ও অন্যান্য ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ধাপে ধাপে গাজাকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ করা হবে এবং পরবর্তীতে উপত্যকার শাসনভার একটি নতুন ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাটিক সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। পুরো প্রক্রিয়ার তদারকি করবে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বোর্ড অব পিস।
বৃহস্পতিবার ট্রাম্প এই চুক্তিকে ‘ঐতিহাসিক পদক্ষেপ’ উল্লেখ করে বলেন, অস্ত্র সমর্পণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেই গাজা থেকে ধাপে ধাপে সেনা প্রত্যাহার করবে ইসরায়েল। একই সঙ্গে গাজার নিয়ন্ত্রণ একটি নতুন ফিলিস্তিনি সরকারের হাতে যাবে, যারা বোর্ড অব পিসের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রশাসন পরিচালনা করবে।
হামাসের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বিবিসিকে জানিয়েছেন, গাজাকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের পরিকল্পনায় সংগঠনটি সম্মত হয়েছে। শিগগিরই এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হবে বলে জানান তিনি। তবে ইসরায়েল এখনও এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
আল জাজিরার হাতে আসা খসড়া চুক্তি অনুযায়ী, আগামী ১৪ দিনের মধ্যে অস্ত্র সমর্পণের বিস্তারিত রূপরেখা প্রস্তুত করা হবে। প্রয়োজন হলে আন্তর্জাতিক যাচাইকরণ সংস্থার অনুমোদন নিয়ে এই সময়সীমা বাড়ানো যাবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথমে হামাসের নিয়ন্ত্রণাধীন পুলিশ বাহিনী অস্ত্র জমা দেবে। এরপর পর্যায়ক্রমে ভারী অস্ত্র নিষ্ক্রিয় করা হবে এবং গাজায় সব ধরনের সামরিক কার্যক্রম বন্ধ করা হবে। ধাপে ধাপে এই প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করবে গাজার জন্য গঠিত একটি জাতীয় কমিটি।
বোর্ড অব পিসের এক কর্মকর্তা জানান, হামাস ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠী তাদের অস্ত্র নতুন ফিলিস্তিনি প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করবে। তবে পুরো নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে উল্লেখযোগ্য সময় লাগবে।
হামাসের মধ্যস্থতাকারী দলের সদস্য গাজি হামাদ বলেন, গাজার জনগণের স্বার্থে এবং বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ও বাস্তুচ্যুতি বন্ধ করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ইসরায়েল চুক্তির শর্ত বাস্তবায়ন না করলে হামাসও কোনো ধাপ এগিয়ে নেবে না। তার ভাষায়, ইসরায়েলি বাহিনীর প্রত্যাহার এবং গাজার পুনর্গঠনের অগ্রগতির ওপরই অস্ত্র সমর্পণের বিষয়টি নির্ভর করবে।
মধ্যস্থতাকারীদের সূত্রে জানা গেছে, হামাস, বোর্ড অব পিস, মিশর, কাতার ও তুরস্কের দীর্ঘ আলোচনার পর এই সমঝোতায় পৌঁছানো হয়েছে। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই নিরস্ত্রীকরণ কার্যক্রম শুরু হতে পারে। একই সঙ্গে গাজাজুড়ে থাকা সুড়ঙ্গ, অস্ত্র কারখানা ও অস্ত্রাগার শনাক্ত করে নিষ্ক্রিয় করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী, ইসরায়েলকে গাজায় মানবিক সহায়তা প্রবেশ নিশ্চিত করতে হবে এবং সামরিক অভিযান বন্ধ রাখতে হবে। পাশাপাশি একটি আন্তর্জাতিক ভেরিফিকেশন কমিটি গঠন করা হবে, যা চুক্তির প্রতিটি ধাপ বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ করবে।
ট্রাম্পের ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনা অনুযায়ী, হামাস শেষ পর্যন্ত প্রায় দুই দশকের শাসনের অবসান ঘটিয়ে গাজার প্রশাসনিক দায়িত্ব ১৫ সদস্যের একটি ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাটিক সরকারের হাতে হস্তান্তর করবে। হামাসের সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ শেষ হওয়ার পরই নতুন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করবে এবং গাজার পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরু হবে।
অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চুক্তির আওতায় আগামী আট মাসের মধ্যে হামাস তাদের সব ধরনের হালকা ও ভারী অস্ত্র নিষ্ক্রিয় করবে। একই সঙ্গে সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক, অস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র এবং অস্ত্রভাণ্ডারের পূর্ণাঙ্গ তথ্যও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করবে।
এদিকে মিশরের রাজধানী কায়রোতে হামাস, মিশর, কাতার, তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতাকারীদের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। শিগগিরই আরেকটি বৈঠকে যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ, আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েন এবং নতুন প্রশাসনের কার্যক্রম শুরুর বিষয়গুলো চূড়ান্ত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।



