ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের মিনাব শহরের শাজারেহ তাইয়্যেবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পাঁচ মাস পরও ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ চলছে। সেখানে এখনো এক শিশুর মরদেহ চাপা পড়ে থাকার আশঙ্কায় তল্লাশি চালাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা।
সম্প্রতি ধ্বংসস্তূপ সরানোর সময় একটি খননযন্ত্র হঠাৎ থেমে যায়। এক শ্রমিক ধ্বংসস্তূপের ভেতর হাত ঢুকিয়ে একটি শিশুর খাতা বের করে আনেন। খাতাটির পাতাগুলো তখনো অক্ষত ছিল। পরিপাটি হাতের লেখায় ভরা খাতাটির প্রচ্ছদে লেখা ছিল ‘মাহিয়া সালারি’। শিশুটির বয়স ছিল আট বছর।
মিনাবের প্রসিকিউটর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম দিনে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি একটি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ওই স্কুলে ১৫৬ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ১২০ জনই শিশু।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলার পরও বিদ্যালয়টির ধ্বংসস্তূপে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। কংক্রিটের মেঝে একটির ওপর আরেকটি ধসে পড়েছে। শ্রেণিকক্ষের ধ্বংসাবশেষ থেকে বাঁকা রড বেরিয়ে আছে। এরই মধ্যে ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে মাহিয়া সালারির খাতাটি উদ্ধার করা হয়েছে।
মাহিয়া তার ছোট ভাই আলীর সঙ্গে স্কুলে ছিল। হামলার কিছুক্ষণ আগে তাদের মা সন্তানদের নিয়ে যেতে স্কুলে এসেছিলেন। হামলায় মা, মাহিয়া ও আলী, তিনজনই নিহত হন।
শাজারেহ তাইয়্যেবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আমাইনে নাদেমি ছয় বছর ধরে সেখানে প্রথম শ্রেণিতে পড়িয়েছেন। হামলার পর বিদ্যালয়ের পরিস্থিতি স্মরণ করে তিনি বলেন, "এটিকে আর স্কুল বলা যায় না। এখানে শুধু দেয়ালগুলো দাঁড়িয়ে আছে, যেগুলো থেকে মৃত্যু, শোক আর রক্তের গন্ধ ভেসে আসে।"
তিনি বলেন, "আমি ভেবেছিলাম, সবাই বেরিয়ে গেছে। আমি জানতাম না, তারা সবাই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে।"
হামলার সময় সংলগ্ন একটি সামরিক স্থাপনাও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। স্কুলটিতে কীভাবে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছিল, সে বিষয়ে পেন্টাগন এখনো বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।
রেড ক্রিসেন্টের উদ্ধারকর্মী রেজা বেসারাতি বলেন, "আমি এখনো সবকিছু মনে করতে পারি।"
বন্দর আব্বাস থেকে প্রায় দুই ঘণ্টার পথ পেরিয়ে মিনাব শহরে পৌঁছানো যায়। খেজুরগাছ ও বৃহস্পতিবারের জমজমাট বাজারের জন্য পরিচিত শহরটি এখন যুদ্ধের ক্ষত বহন করছে। শহরের বিভিন্ন ভবন, সড়কের বাতির খুঁটি ও দেয়ালে হামলায় নিহত শিশুদের ছবি টাঙানো হয়েছে।
শহরের বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধের কারণে মানুষের দুর্ভোগের চিত্র স্পষ্ট। মিনাব এখন ইরানের সাধারণ মানুষের ওপর সংঘাতের প্রভাবের অন্যতম প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
ইরানজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের পর শুরু হওয়া যুদ্ধ দেশটির রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। কয়েক মাস আগে দেশটিতে কঠোর নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক সংকট, মূল্যস্ফীতি ও নেতৃত্বের প্রতি অসন্তোষকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল। পরে বিক্ষোভ দমনে ব্যাপক ধরপাকড় ও দমন-পীড়নের অভিযোগ ওঠে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো কয়েক হাজার মানুষের নিহত ও নিখোঁজ হওয়ার কথা জানালেও মোট হতাহতের সংখ্যা নিশ্চিত নয়।
এরপর শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ। যুদ্ধের প্রভাব ইরানের রাজধানী তেহরান থেকে দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।
আইনজীবী আজাদেহ বলেন, "মানিয়ে নেওয়া প্রত্যেক ইরানির স্বভাবের মধ্যে রয়েছে। আমরা আমাদের জীবন চালিয়ে যাওয়ার, দৈনন্দিন রুটিন বজায় রাখার এবং আশাবাদী থাকার চেষ্টা করেছি।"
তবে যুদ্ধ ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার ক্ষেত্রে অনেকেই সতর্ক। ট্রেনে যাত্রার সময় পরিবার, কাজ ও দৈনন্দিন জীবনের নানা বিষয় নিয়ে স্বাভাবিক আলোচনা হলেও রাজনীতির প্রসঙ্গ উঠতেই পরিবেশ বদলে যায়।
রূপচর্চাবিশেষজ্ঞ সেপিদেহ বলেন, "আমি ইরানকে ভালোবাসি। ভীষণ ভালোবাসি। কিন্তু যখন দেখি আমার তারুণ্য ফুরিয়ে যাচ্ছে এবং আমার স্বপ্নগুলো হারিয়ে যাচ্ছে, তখন দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া ছাড়া আমার আর কোনো উপায় থাকে না।"
তেহরান থেকে বন্দর আব্বাসগামী প্রায় ৯০০ মাইলের রাতের ট্রেনে শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, ফুটবলার ও পরিবারসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ যাতায়াত করছেন। যুদ্ধ সম্পর্কে প্রত্যেকেরই রয়েছে আলাদা অভিজ্ঞতা।
কয়েক মাস বন্ধ থাকার পর ঘরোয়া ফুটবল লিগ আবার শুরু হয়েছে। বাড়ি ফেরার পথে দুই তরুণ ফুটবলারের সঙ্গে কথা বলে যুদ্ধের স্মৃতি জানতে চাওয়া হলে আবদুল্লাহ বলেন, "তারা শিশুভর্তি একটি স্কুলে হামলা করেছিল…তাদের বয়স ছিল ৭, ৮ ও ৯ বছর। পুরো দেশ শোকে ভেঙে পড়েছিল। জানাজার দিন…সবাই কেঁদেছিল।"
মিনাব শহরে স্কুলে হামলায় নিহত শিশুদের ছবি এখনো বিভিন্ন স্থানে টাঙানো রয়েছে। ধ্বংসস্তূপে পড়ে থাকা মাহিয়ার খাতা সেই হামলার ভয়াবহতার আরেকটি স্মারক হয়ে আছে।
সরকারবিরোধী আন্দোলনে একসময় অংশ নেওয়া এক ব্যক্তি বলেন, "আমি যুদ্ধ মেনে নিয়েছিলাম। কিন্তু নিরপরাধ মানুষ হত্যার বিনিময়ে নয়। যুদ্ধ সবকিছু ধ্বংস করে দেয়। এটি ভালো মানুষ আর খারাপ মানুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য করে না।"



