প্রকৃতির ছোট্ট একটি প্রাণীও যে আধুনিক প্রযুক্তির বিশাল ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিপত্তি ঘটাতে পারে, তার আরেকটি উদাহরণ দেখা গেলো ফ্রান্সে। ঝাঁকে ঝাঁকে জেলিফিশ ঢুকে পড়ায় ফ্রান্সের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্র্যাভেলিনের তিনটি চুল্লি বন্ধ করে দিতে হয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
মজার বিষয় হলো, ঠিক এক বছর আগে একই দিনে একই কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছিলো। ২০২৫ সালের ১১ আগস্ট জেলিফিশের বিশাল ঝাঁক পাম্পিং ব্যবস্থায় ঢুকে পড়ায় চারটি চুল্লি বন্ধ করে দিতে হয়েছিলো। এবারও গত ১১ আগস্ট একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলো।
গ্র্যাভেলিন বিদ্যুৎকেন্দ্রে মোট ছয়টি ৯০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার রিঅ্যাক্টর রয়েছে। জেলিফিশের কারণে এর মধ্যে তিনটি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আরেকটির উৎপাদন অর্ধেক করা হয়েছে। একটি আগে থেকেই রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ ছিল। ফলে ঘটনার সময় মাত্র একটি রিঅ্যাক্টর পূর্ণ ক্ষমতায় চলছিলো।
বিদ্যুৎকেন্দ্রটির পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ইডিএফ জানিয়েছে, জেলিফিশের কারণে তৈরি পরিস্থিতির প্রভাব বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা, কর্মীদের নিরাপত্তা বা পরিবেশের ওপর পড়েনি। স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রিঅ্যাক্টরগুলোকে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডে পুনরায় যুক্ত করতে কর্মীরা কাজ করছেন।
পারমাণবিক চুল্লি ঠাণ্ডা রাখতে বিপুল পরিমাণ পানি প্রয়োজন হয়। সমুদ্র থেকে সেই পানি পাম্প করে নেওয়ার সময় জেলিফিশের বড় ঝাঁক পাম্পে আটকে যায়। এতে পানি সরবরাহে সমস্যা তৈরির আশঙ্কা দেখা দেয়। ঝুঁকি এড়াতেই চুল্লিগুলো বন্ধ করা হয়।
পরিস্থিতি সামাল দিতে আশপাশের সমুদ্রে তিনটি মাছ ধরার নৌকা দিয়ে ২৪ ঘণ্টা নজরদারি চালানো হচ্ছে। নৌকাগুলো জেলিফিশ ধরে সাগরের অন্য অংশে ছেড়ে দিচ্ছে। পাশাপাশি পাম্পিং স্টেশন ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি পরিষ্কার করা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত জেলিফিশের কোন প্রজাতি এই ঘটনার জন্য দায়ী, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
একই দিনে কেন বারবার?
একই দিনে টানা দুই বছর এমন ঘটনা ঘটায় প্রশ্ন উঠেছে, এটি কি নিছক কাকতালীয়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্রের পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে জেলিফিশের সংখ্যা বৃদ্ধির সম্পর্ক থাকতে পারে। সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা বাড়া, অতিরিক্ত মাছ ধরা ও প্লাস্টিক দূষণ কিছু এলাকায় জেলিফিশের বংশবৃদ্ধির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উষ্ণ হয়ে ওঠা সমুদ্রও তাদের বিস্তারে ভূমিকা রাখতে পারে।
ফ্রান্সে অবশ্য এ বছর এই প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কার্যক্রম ব্যাহত হয়নি। জুন ও জুলাইয়ে অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও খরার মতো পরিস্থিতির কারণেও দেশটির কয়েকটি পারমাণবিক চুল্লি বন্ধ রাখতে হয়েছিল।
জেলিফিশের কারণে আগেও থেমেছে পারমাণবিক কেন্দ্র
জেলিফিশের ঝাঁকে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার ঘটনা শুধু ফ্রান্সেই নয়। ২০১৩ সালে সুইডেনে জেলিফিশের কারণে একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তিন দিনের জন্য বন্ধ রাখতে হয়েছিলো। ১৯৯৯ সালে জাপানেও একই ধরনের ঘটনায় একটি পারমাণবিক কেন্দ্রের বিদ্যুৎ উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
শুধু জেলিফিশ নয়
মানুষের বিদ্যুৎ ও বিজ্ঞানভিত্তিক অবকাঠামোর জন্য বিপত্তি তৈরি করা প্রাণীর তালিকায় অবশ্য জেলিফিশ একা নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাটে গত বছর একটি র্যাকুনের কারণে এক হাজারের বেশি বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ঘটনা ঘটেছিল। সেটি একটি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে ঢুকে যন্ত্রপাতির ক্ষতি করেছিল। একপর্যায়ে ওই এলাকার আড়াই হাজারের বেশি গ্রাহক বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েন।
বিজ্ঞানের জগতেও প্রাণীদের এমন ‘হস্তক্ষেপের’ ঘটনা আছে
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে লিগো নামের একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল গবেষণাগার মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্ত করে। ২০১৭ সালে সেখানে গবেষকেরা দেখতে পান, কিছু দাঁড়কাক বরফে ঢাকা একটি ঠাণ্ডা পাইপে ঠোকর দিচ্ছে। সেই ঠোকরের ফলে পাইপে কম্পন তৈরি হচ্ছিল, যা অত্যন্ত সংবেদনশীল যন্ত্রগুলোর তথ্য সংগ্রহে সমস্যা তৈরি করছিলো।
গবেষকেরা পরে কৃত্রিমভাবে একই ধরনের ঠোকরের কম্পন তৈরি করে দেখেন, তাতেও একই ধরনের তথ্যগত সমস্যা হচ্ছে। এরপর পাইপে বরফ জমার সুযোগ কমিয়ে দেওয়া হয়। ফলে দাঁড়কাকগুলোকে পানি খাওয়ার জন্য অন্য জায়গা খুঁজে নিতে হয়।
এছাড়া রয়েছে ইউরোপের বিখ্যাত গবেষণাগার সিইআরএনর ‘বাগেট’ রহস্য। ২০০৯ সালে সিইআরএনও একটি বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ঘটনায় যন্ত্রপাতির মেরামত করতে কয়েক দিন সময় লেগেছিল। বিভ্রাটের সঠিক কারণ আজও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তবে ঘটনাস্থলে পালক ও এক টুকরো রুটি পাওয়া গিয়েছিলো। ধারণা করা হয়, ছোট্ট এক টুকরো ফরাসি বাগেট কোনোভাবে যন্ত্রপাতির সমস্যার সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে পারে।
শুনতে মজার হলেও এসব ঘটনা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে করিয়ে দেয়। মানুষ যত বেশি প্রকৃতির জায়গা দখল করে প্রযুক্তি ও অবকাঠামো গড়ে তুলছে, ততই বন্যপ্রাণীর সঙ্গে মানুষের সংঘাতের সুযোগ বাড়ছে।



