বিশ্ব চরম আবহাওয়ার একটি ‘বিপজ্জনক অঞ্চলে’ প্রবেশ করেছে বলে সতর্ক করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। এরই মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এল নিনোর প্রভাব অনুভূত হতে শুরু করেছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) জানিয়েছে, এবারের এল নিনো ৭০ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী হতে পারে এবং এর প্রভাব অন্তত ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস জানিয়েছেন, এল নিনো ক্রমেই বড় আকার নিচ্ছে। জলবায়ু ও আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা দিন দিন মানুষের কাছে অচেনা হয়ে উঠছে। মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণতার সঙ্গে এল নিনোর প্রভাব যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়ার স্বাভাবিক ধরন বদলে যায়। কোথাও বৃষ্টিপাত কমে গিয়ে খরা ও দাবানলের ঝুঁকি বাড়ে, আবার কোথাও অতিবৃষ্টি, বন্যা, ভূমিধস ও শক্তিশালী টাইফুনের আশঙ্কা তৈরি হয়। ডব্লিউএমও বলছে, আগামী কয়েক মাসে এসব প্রভাব আরও স্পষ্ট হতে পারে।
প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলীয় গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এলাকায় সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দ্রুত বেড়েছে। প্রধান পর্যবেক্ষণ এলাকাগুলোতে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি ছিল। পূর্বাভাস অনুযায়ী, কোথাও কোথাও সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেশি হতে পারে। এমন হলে এটি ১৯৫০ সালের পর সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো হতে পারে।
ডব্লিউএমওর পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক মাসে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্য আমেরিকা ও উত্তর দক্ষিণ আমেরিকার বিস্তীর্ণ এলাকায় স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত হতে পারে। এতে খরা ও দাবানলের ঝুঁকি বাড়বে।
কম বৃষ্টিপাতের প্রভাব বৈশ্বিক বাণিজ্যেও পড়তে পারে। পানামা খালে পানির স্তর কমে গেলে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপের প্রয়োজন হতে পারে।
শুধু সমুদ্রপৃষ্ঠেই নয়, প্রশান্ত মহাসাগরের পানির নিচের স্তরেও অস্বাভাবিক উষ্ণতা দেখা যাচ্ছে। কোথাও কোথাও পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি রয়েছে।
এ ছাড়া ভারত মহাসাগর, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আটলান্টিক এবং অস্ট্রেলিয়ার উপকূলের কিছু অংশেও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা থাকার পূর্বাভাস রয়েছে।
সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে অস্ট্রেলিয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশটিতে একের পর এক সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ দেখা গেছে। এতে প্রবাল বিবর্ণতা ও শৈবাল বিস্তারসহ সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞান সংস্থার প্রধান গবেষক অ্যালিস্টার হবডে বলেন, এল নিনো সাধারণত এমন চরম উষ্ণতা তৈরি করে, যা সামুদ্রিক পরিবেশের জন্য বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি করতে পারে।
তবে এবারের পূর্বাভাসে গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি থেকে কিছুটা রক্ষা পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে প্রবালগুলো পুনরুদ্ধারের কিছুটা সময় পেতে পারে। তবে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া ও তাসমানিয়ায় পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
প্রতি বছর প্রায় ১৪ হাজার জাহাজ পানামা খাল ব্যবহার করে। বৈশ্বিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথটি পানামার আয়েরও বড় উৎস। খরার কারণে খালে পানির স্তর কমে গেলে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করতে হতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইন্দোনেশিয়ায় চলতি শুষ্ক মৌসুমে এক লাখ ৭ হাজার হেক্টরের বেশি এলাকায় দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। দীর্ঘ শুষ্ক মৌসুমের কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মধ্য কালিমান্তানের এক বাসিন্দা জানান, সেখানে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে দাবানল চলছে। ঘন ধোঁয়ার কারণে বাইরে বের হলে চোখ জ্বালা করছে এবং তীব্র ধোঁয়ার গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।
দাবানল নিয়ন্ত্রণে কর্তৃপক্ষ ক্লাউড সিডিংয়ের মাধ্যমে বৃষ্টি নামানোর চেষ্টা করছে। জমি পরিষ্কারের জন্য আগুন ব্যবহারের অভিযোগে কয়েক ডজন মানুষকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।
চীনে চলতি বছর সাতটি টাইফুন স্থলভাগে আঘাত হানতে পারে বলে দেশটির বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। এর সঙ্গে শক্তিশালী এল নিনোর সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করছেন তারা।
এল নিনোর প্রভাবে শুধু খরাই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে অতিবৃষ্টির আশঙ্কাও রয়েছে। পূর্ব আফ্রিকা, দক্ষিণ ব্রাজিল ও যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলের কিছু এলাকায় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হতে পারে। এতে বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
ডব্লিউএমওর মহাসচিব সেলেস্তে সাওলো বলেন, খরা ও বন্যার কারণে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এরই মধ্যে বিপর্যয় ও অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। এল নিনো শক্তিশালী হলে এসব প্রভাব আরও বাড়তে পারে।
প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব উপকূলে অবস্থানের কারণে এল নিনোর প্রভাবে পেরু বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। অতীতে পেরু, ইকুয়েডর ও ব্রাজিলের কিছু এলাকায় এল নিনোর সময় অতিবৃষ্টির কারণে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধস হয়েছে।
শহরাঞ্চলে দুর্বল পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা থাকায় অতিবৃষ্টির সময় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এল নিনো নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও সেটিকে আতঙ্কে পরিণত না করে আগাম প্রস্তুতি বাড়ানো জরুরি। বিভিন্ন সংস্থা নদীর পানির উচ্চতা, বন্যার ঝুঁকি ও আবহাওয়ার পূর্বাভাস সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে দ্রুত তথ্য দেওয়ার ব্যবস্থা করছে।
তাদের মতে, চরম আবহাওয়ার আগে মানুষকে সতর্ক করতে পারলে প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনো একা কোনো সংকট তৈরি করে না। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অপরিকল্পিত আবাসন, দুর্বল পানি ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা চরম আবহাওয়ার ক্ষয়ক্ষতি আরও বাড়িয়ে দেয়।
তাই এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় শুধু আবহাওয়ার পূর্বাভাসের ওপর নির্ভর না করে দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো, জননিরাপত্তা ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করার ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন।



