Saturday, September 12, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

এবার বাব আল-মানদেব নিয়ন্ত্রণহীন, বিশ্ব বাণিজ্যে নতুন সংকট

নৌপথের মাঝখানে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পেরিম দ্বীপও তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে

আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:২৯ পিএম

লোহিত সাগরের প্রবেশমুখে ইয়েমেন ও জিবুতির মাঝের সরু জলপথ বাব আল-মানদেব প্রণালি। মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তেলসহ পণ্য পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ এখন হুতিদের নিয়ন্ত্রণে। এর ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে নতুন করে বড় ধরনের চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের বিদ্রোহীরা কয়েক সপ্তাহ ধরে বাব আল-মানদেব দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে হামলার হুমকি দিয়ে আসছিল। এরই মধ্যে শুক্রবার তারা গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগর মোখা দখল করে। ইয়েমেন সরকারের কর্মকর্তাদের দাবি, নৌপথের মাঝখানে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পেরিম দ্বীপও তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।

শনিবার আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তারা সরকারি বাহিনীকে হটিয়ে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের মধ্যে হুতিদের এই অগ্রযাত্রাকে সংঘাতের নতুন ফ্রন্ট হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাতের কারণে নিকটবর্তী হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাব আল-মানদেবের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। এখন এই নৌপথেও জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।

যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই নৌপথ দিয়ে যেত। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার পর সৌদি আরব পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন ব্যবহার করে অপরিশোধিত তেল লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে নেওয়া শুরু করে। সেখান থেকে জাহাজে করে তেল রপ্তানি করা হচ্ছিল।

জ্বালানি বাজারবিষয়ক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান এনার্জি অ্যাসপেক্টসের সহপ্রতিষ্ঠাতা রিচার্ড ব্রোঞ্জের হিসাবে, একপর্যায়ে ইয়ানবু বন্দর দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৪৫ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩০ লাখ ব্যারেল বাব আল-মানদেব হয়ে যেত।

তবে হামলার হুমকির কারণে আগস্টে বাব আল-মানদেব দিয়ে সৌদি তেল পরিবহন প্রতিদিন প্রায় ৪ লাখ ব্যারেলে নেমে আসে। বর্তমানে তা আরও কমেছে বলে জানিয়েছেন ব্রোঞ্জ।

তিনি বলেন, বাব আল-মানদেব এত দিন বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রাণ হিসেবে কাজ করেছে। এই পথ হারানোর আশঙ্কা থেকেই বর্তমান পরিস্থিতি কতটা অস্থিতিশীল, তা বোঝা যাচ্ছে।

বাব আল-মানদেব এড়িয়ে এশিয়ার বাজারে তেল নিতে জাহাজগুলোকে এখন দীর্ঘ ঘুরপথ বেছে নিতে হচ্ছে। সুয়েজ খাল পেরিয়ে ভূমধ্যসাগরে যাওয়ার পর আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল ধরে দক্ষিণে যেতে হচ্ছে। এরপর আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে ভারত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে এশিয়ায় পৌঁছাতে হচ্ছে।

রিচার্ড ব্রোঞ্জ জানান, এশিয়ার অনেক শোধনাগার এখন বিকল্প উৎস থেকে তেল সংগ্রহের চেষ্টা করছে। ফলে অন্যান্য অঞ্চলের তেলবাহী জাহাজের জন্য বেশি দাম দিতে হচ্ছে। তেলের দাম দ্রুত বাড়ার পেছনে এটিও বড় কারণ।

বাব আল-মানদেবের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো দখলে যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার বিশ্ববাজারে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। একপর্যায়ে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৭ ডলারে উঠলেও পরে তা কমে ১০৪ ডলারে নেমে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দামও বেড়েছে। ফলে শুক্রবার তেলের দাম মে মাসের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠে।

বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আগস্টে দেশে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও প্রায় চার বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। আগস্টেও মূল্যস্ফীতির হার ৮% এর ওপরে ছিল।

বিশ্ববাজারে তেলের দাম দীর্ঘ সময় ধরে বেশি থাকলে বাংলাদেশে আমদানি ব্যয়, পরিবহন খরচ ও পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে নিত্যপণ্যের বাজারেও। ফলে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম আরও বেড়ে যাওয়া পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।

   

About

Popular Links

x