ইরান যুদ্ধে নিহত মার্কিন সেনাদের পরিবারগুলো সরকারি বেতন ও অন্যান্য সুবিধা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছে। কংগ্রেস আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণা না করায় নিহত ও আহত সেনাদের প্রাপ্য সুবিধা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তাদের স্বজনেরা।
রবিবার (৬ সেপ্টেম্বর) দি টেলিগ্রাফের একটি প্রতিবেদনে এসব তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
মার্চে পশ্চিম ইরাকে একটি জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান বিধ্বস্ত হয়ে ছয়জন মার্কিন সেনা নিহত হন। তাদের একজন ছিলেন ৩৩ বছর বয়সী মেজর অ্যালেক্স ক্লিনার। বিমানটি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে সহায়তা করছিল।
অ্যালেক্সের স্ত্রী লিবি ক্লিনার অভিযোগ করেন, স্বামীর মৃত্যুর পর মার্কিন বিমানবাহিনী শুরুতে তাকে কিছু অতিরিক্ত সুবিধার জন্য অযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করেছিল। কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানকে কংগ্রেস আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ হিসেবে ঘোষণা করেনি।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে লিবি বলেন, তার স্বামী এমন একটি সামরিক সংঘাতে প্রাণ দিয়েছেন, যা বাস্তবে যুদ্ধের মতো হলেও সরকারি নথিতে সেটিকে যুদ্ধ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে না, এ বিষয়টি তার কাছে অত্যন্ত হতাশাজনক।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিবির অভিযোগ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পর মার্কিন বিমানবাহিনী বিষয়টি ব্যাখ্যা করে। কর্মকর্তারা জানান, অ্যালেক্সের শেষ বেতন-চেকে ঝুঁকিভাতা ও যুদ্ধ-সম্পর্কিত কর সুবিধা অন্তর্ভুক্ত ছিল। তাকে শুরুতে ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছিল বলেও স্বীকার করেন তারা।
কর্মকর্তারা জানান, অ্যালেক্সের ক্ষেত্রে ‘যুদ্ধকালীন ভাতা’ হিসেবে মাসে ২২৫ ডলার দেওয়া হয়েছে। এই ভাতা কংগ্রেস আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে কি না, তার ওপর নির্ভরশীল নয়।
লিবি পরে বলেন, শোকাহত একটি পরিবারের জন্য সরকারি পরিভাষা ও জটিল প্রক্রিয়া বোঝা অত্যন্ত কঠিন। তার মতে, সামরিক দায়িত্ব পালনের সময় স্বজন হারানো কোনো পরিবারকে নিজেদের প্রাপ্য সুবিধা বুঝতে সরকারি ভাষার বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠতে বাধ্য করা উচিত নয়।
তিনি বলেন, এমন কঠিন সময়ে প্রতিটি পরিবারকে শুরু থেকেই স্পষ্ট ও অভিন্ন তথ্য দেওয়া প্রয়োজন। নিহত সেনাদের পরিবারের প্রাপ্য সুবিধা নিশ্চিত করা তাদের আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান জানানোরই অংশ।
বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে লিবি ক্লিনারের অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন করা হয় মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সকে। তিনি বলেন, লিবি যা পাওয়ার অধিকারী, তা যেন তিনি পান, তা নিশ্চিত করতে সরকার সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবে।
তবে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানকে ‘যুদ্ধ’ হিসেবে উল্লেখ করতে অস্বীকৃতি জানান ভ্যান্স। তার দাবি, সেখানে বর্তমানে ‘সক্রিয়ভাবে গোলাগুলি চলছে না’।
অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানকে একাধিকবার ‘যুদ্ধ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। পরে ভ্যান্সের বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ট্রাম্প বলেন, তিনি এটিকে ‘সামরিক সংঘাত’ হিসেবে দেখেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের হামলা বিরতিসহ চলমান রয়েছে।
ইরানবিরোধী অভিযানে আহত মার্কিন সেনাদের পরিবারগুলোর পক্ষ থেকেও অভিযোগ উঠেছে। তাদের দাবি, পেন্টাগন অনেক ক্ষেত্রে আহত সেনাদের আঘাতের মাত্রা কম করে দেখাচ্ছে এবং তাদের যথাযথভাবে যুদ্ধাহত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না।
তবে মার্কিন সেনাবাহিনী এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সামরিক বাহিনী বলছে, আহত সেনাদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশে কিছুটা সময় লাগে। বিশেষ করে কোনো সেনা অল্প সময়ের মধ্যেই দায়িত্বে ফিরে এলে তাঁদের আঘাতের তথ্য প্রকাশের বাধ্যবাধকতাও সব ক্ষেত্রে থাকে না।
ইরানবিরোধী অভিযানে নিহত কয়েকজন মার্কিন সেনার পরিবারের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তাদের মধ্যে ২৫ বছর বয়সী লেফটেন্যান্ট টাইলার জেমস ফিহানের বাবা-মাও রয়েছেন।
ফিহানের মা শারি ফিহান বলেন, ট্রাম্প তার সঙ্গে এমনভাবে কথা বলেছেন, যেন একজন মা তার সন্তানকে হারানোর পর যে শোকের মধ্য দিয়ে যান, তিনি তা বুঝতে পারছেন। তিনি বলেন, ট্রাম্প সংঘাতের ধ্বংসযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করেছেন এবং সে কারণেই বিষয়টি সম্পর্কে তার ধারণা রয়েছে।



