জীবিকা নির্বাহ ও ঋণের বোঝা মেটাতে ভারতের দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন আখখেতে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করছেন লাখ লাখ শ্রমিক। এর মধ্যে মহারাষ্ট্রের বিদ জেলার নারী আখকাটাই শ্রমিকেরা পড়েছেন এক নির্মম বাস্তবতার মুখে। কাজের প্রচণ্ড চাপ, ঋতুস্রাবের সময় ছুটি না পাওয়ার বাধ্যবাধকতা এবং দিনভর কঠোর পরিশ্রমের হাত থেকে মুক্তি পেতে অনেক নারী ঝুঁকিপূর্ণভাবে জরায়ু কেটে ফেলার (হিস্টেরেকটমি) পথ বেছে নিচ্ছেন।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট-এর এক প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারত বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম আখ উৎপাদনকারী দেশ, যেখানকার আখ কোকা-কোলা ও পেপসিকোর মতো বহুজাতিক কোমল পানীয় প্রস্তুতকারক সংস্থাতেও সরবরাহ করা হয়। পুরো ভারতে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ আখ কাটার কাজে নিয়োজিত। সাধারণত স্বামী-স্ত্রী জুটি বেঁধে ভোর থেকে রাত পর্যন্ত প্রতিদিন প্রায় ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করেন। বিনিময়ে তারা দৈনিক মাত্র চার শ রুপির মতো মজুরি পান।
তবে এই কাজের সবচেয়ে মর্মান্তিক দিকটি ভোগ করছে নারী শ্রমিকেরা। আখখেতে কাজ করার সময় টয়লেট বা সুপেয় পানির মতো ন্যূনতম সুবিধাও থাকে না। একদিন কাজ বন্ধ রাখলেই বড় অঙ্কের মজুরি কাটা যায় এবং ঠিকাদারকে জরিমানা দিতে হয়। ফলে ঋতুস্রাব, গর্ভাবস্থা কিংবা প্রচণ্ড শারীরিক অসুস্থতার মধ্যেও তাদের কাজ চালিয়ে যেতে হয়। একটানা ভারী কাজ ও বিশ্রামের অভাবে জরায়ু সংক্রান্ত বিভিন্ন জটিলতায় ভোগেন তারা।
পূর্ণিমা ও সবিতাসহ একাধিক নারী শ্রমিক জানান, কাজের এই নিষ্ঠুর চক্র ও অসহ্য যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে এবং কাজ হারানোর ভয়ে তারা বাধ্য হয়ে জরায়ু ফেলে দেওয়ার মতো চরম সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। সবিতা নামের এক শ্রমিক জানান, অপারেশনের পর তার শরীরে ইনফেকশন ছড়িয়ে পড়েছে এবং আগের চেয়েও ব্যথা বেড়ে গেছে। অথচ এই অস্ত্রোপচারের খরচ মেটাতেও তাদের চড়া সুদে নতুন করে ঋণ নিতে হয়।
২০১৯ সালে মহারাষ্ট্র সরকারের এক জরিপে দেখা যায়, শুধু বিদ জেলার ৮২ হাজারেরও বেশি নারী আখকাটাই শ্রমিকের মধ্যে প্রায় ১৩ হাজার ৮৬১ জন নারী জরায়ু কেটে ফেলেছেন। এর মধ্যে ৪৫ শতাংশের বেশি নারী পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক জটিলতার শিকার হন। বোম্বে হাইকোর্ট আঞ্চলিক সরকারকে শ্রমিকদের কল্যাণ ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিলেও মাঠপর্যায়ে এর কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখা যায়নি বলে অভিযোগ শ্রমিকদের।
এদিকে কোকা-কোলা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে মিলে শ্রমিকদের সুপেয় পানি, শৌচাগার ও স্বাস্থ্যসামগ্রী পাওয়ার সুবিধা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে। তবে ভুক্তভোগী নারী শ্রমিকদের ভাষ্যমতে, শোষণমূলক এই শ্রমকাঠামো ও চরম দারিদ্র্যের বেড়াজাল থেকে মুক্তি না মিললে তাদের এই শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার কোনো উপায় নেই।



