আইন প্রণয়ন করা মার্কিন কংগ্রেসের মূল দায়িত্ব হলেও কেন্দ্রীয় সরকারের আয়-ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, কর নির্ধারণ, নির্বাহী বিভাগের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি এবং সরকারি কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার মতো গুরুত্বপূর্ণ সব দায়িত্বও পালন করতে হয় তাদের। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, দেশটির আইনসভা বা কংগ্রেস গঠিত হয়েছে দুটি কক্ষ নিয়ে, প্রতিনিধি পরিষদ (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) এবং সেনেট।
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে মোট ৫৩৫ জন ভোটাধিকারসম্পন্ন সদস্য রয়েছেন। এর মধ্যে প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য ৪৩৫ জন এবং সেনেটের সদস্য ১০০ জন।
প্রতিনিধি পরিষদে প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের আসনসংখ্যা নির্ধারিত হয় জনসংখ্যার ভিত্তিতে। যে অঙ্গরাজ্যের জনসংখ্যা যত বেশি, সেখানে প্রতিনিধি পরিষদে আসনসংখ্যাও তত বেশি। অন্যদিকে, প্রতিটি অঙ্গরাজ্য থেকে দুজন করে সেনেটর নির্বাচিত হন। ফলে জনসংখ্যার তারতম্য সত্ত্বেও সেনেটে সব অঙ্গরাজ্যের সমান প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়েছে।
প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য হতে হলে প্রার্থীর বয়স কমপক্ষে ২৫ বছর এবং অন্তত সাত বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হতে হবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট অঙ্গরাজ্যের বাসিন্দা হওয়া বাধ্যতামূলক। এই কক্ষের সদস্যরা দুই বছরের জন্য নির্বাচিত হন, যার ফলে প্রতি দুই বছর পরপর প্রতিনিধি পরিষদের সব আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
পক্ষান্তরে, সেনেটর হওয়ার ক্ষেত্রে বয়স কমপক্ষে ৩০ বছর এবং অন্তত নয় বছর ধরে মার্কিন নাগরিক হওয়ার শর্ত রয়েছে। সেনেটরদের মেয়াদ ছয় বছর, তবে সব আসনে একসঙ্গে নির্বাচন হয় না। প্রতি দুই বছর অন্তর সেনেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যা এই উচ্চকক্ষের ধারাবাহিকতা বজায় রাখে।
প্রতিনিধি পরিষদ ও সেনেটের মূল দায়িত্ব আইন পাস করা হলেও তাদের কিছু সুনির্দিষ্ট সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদের অন্যতম প্রধান ক্ষমতা হলো রাজস্ব বা করসংক্রান্ত বিল উত্থাপন করা এবং কোনো প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অভিশংসন বা ইমপিচমেন্টের অভিযোগ আনা।
অন্যদিকে, সেনেটের রয়েছে সেই অভিশংসনের বিচার পরিচালনার ক্ষমতা। এ ছাড়া প্রেসিডেন্টের মনোনীত গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা, রাষ্ট্রদূত ও ফেডারেল বিচারপতিদের নিয়োগে সেনেটের সম্মতি এবং আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুমোদনের ক্ষেত্রেও এই কক্ষের অনুমোদন আবশ্যক।
যুক্তরাষ্ট্রে কোনো প্রস্তাবিত আইনকে বিল বলা হয়। কংগ্রেসের কোনো সদস্য বিল উত্থাপনের পর তা সংশ্লিষ্ট কমিটিতে পাঠানো হয়। কমিটি বিলটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই, সংশোধন ও বিশেষজ্ঞদের মতামত গ্রহণের পর কক্ষের আলোচনায় উপস্থাপন করে। প্রতিনিধি পরিষদ ও সেনেট, উভয় কক্ষেই বিল পাস হতে হয়। দুটি কক্ষে পাস হওয়া বিলের ভাষা ও বিষয়বস্তু অভিন্ন হতে হয় এবং পরবর্তীতে তা প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের মাধ্যমে আইনে রূপ নেয়।
কংগ্রেসের অধিকাংশ বিস্তারিত নীতি ও পর্যালোচনা কাজ হয় বিভিন্ন স্থায়ী কমিটিতে। প্রতিনিধি পরিষদে ২৩টি এবং সেনেটে ১৭টি কমিটি রয়েছে। এসব কমিটি বাজেট, পররাষ্ট্রনীতি, প্রতিরক্ষা ও সরকারি প্রশাসনসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিলের খসড়া তৈরি ও শুনানি পরিচালনা করে।
পাশাপাশি, নির্বাহী বিভাগের কর্মকাণ্ডে নজরদারি চালানো, সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং কোথাও কোনো দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহার হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখাও এই কমিটিগুলোর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। প্রতিনিধি পরিষদ ও সেনেটের এই সম্মিলিত ও ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামোর মাধ্যমেই পরিচালিত হয় যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক আইনসভা ব্যবস্থা।



