Thursday, June 04, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

ভাষা বদলায়, মায়া থাকে

বৃষ্টির দিনে চিঠি হারায়, মেসেজ জন্ম নেয়

আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৩:১১ পিএম

বৃষ্টি নামলেই আমার মাথার ভেতর ছোটকালের একটা পুরোনো ছবি ভেসে ওঠে। টিনের চালের ওপর টুপটাপ শব্দ, বারান্দায় বৃষ্টির ছাঁট, আর ভেতরে বাবা খবরের কাগজ মেলে ধরেছেন। কাগজের গায়ে কালি-কালি গন্ধ—সে গন্ধ এখন আর কোথাও নেই। মা বসে আছেন টেবিলের সামনে, হাতে চিঠি। কাগজের চিঠি। খামের ওপর ঠিকানা লেখার সময় তিনি খুব ধীরে লিখতেন, যেন একটা ভুল অক্ষর মানে ভুল গন্তব্য। কিংবা বিদেশ থেকে অনেকদিন পর আসা মেজোমামার চিঠি। তখন ভাষা ছিল ভারী, কিন্তু মায়ার মতো নরম। শব্দগুলোকে হাতে ধরে রাখা যেত। আজ একই বৃষ্টির দিনে আমার ছোট ভাগ্নে মোবাইলের স্ক্রিনে দুই আঙুল দিয়ে “Ami ashtesi” লিখে ফেলে। ব্যস। কোনো খাম নেই, কোনো ডাকপিয়ন নেই, কোনো অপেক্ষা নেই। ভাষা হালকা হয়ে গেছে? নাকি শুধু মাধ্যম বদলে গেছে?

মাধ্যম বদলালেই ভাষা বদলায়—এটা খুব স্বাভাবিক। এক সময় ভাষা ছিল মুখে মুখে: পালাগান, জারি-সারি, হাটের গল্প, মায়ের ঘুমপাড়ানি। পরে ভাষা গেল কাগজে: পুঁথি, পত্রিকা, বই, সরকারি নথি। তারপর এল বেতার—কণ্ঠস্বরের রাজত্ব। সন্ধ্যায় রেডিওর সামনে বসে আমরা যে বাংলা শুনতাম, সে বাংলা ছিল একধরনের শুদ্ধতার মাপজোক করা বাংলা। টেলিভিশন এলে বাংলা পেল মুখ, পোশাক, আলোর রঙ। নাটক-খবর-ঘোষণায় এক ধরনের “জাতীয় উচ্চারণ” তৈরি হলো। গ্রামের মানুষও শহরের টোন শিখে ফেলল, শহরের মানুষও গ্রামের প্রবাদ ধার নিল—অদ্ভুত মিশ্রণ।

এ মিশ্রণের একটা বড় বাঁক ১৯৫২। ভাষা তখন শুধু কথাবার্তা না—পরিচয়। “ভাষা” শব্দটা হঠাৎ করে বুকের ভেতর ঢুকে গেল। রবীন্দ্রনাথের সেই লাইন—“যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে”—আমাদের ইতিহাসে কেবল গান হয়ে থাকেনি, মিছিলের শিরদাঁড়াও হয়েছে। তারপর ১৯৭১—রেডিওর তরঙ্গ দিয়ে স্বাধীনতার বাংলা ছড়িয়ে পড়ল। যে বাংলা আগে ছিল ঘরের, স্কুলের, আদালতের; সে বাংলা হয়ে উঠল যুদ্ধের, স্বপ্নের, আর রাষ্ট্রের। বেতারের ঘোষণায় যে কণ্ঠ বলত “এটি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র”—সে কণ্ঠের ভেতরে আমরা ভাষার ক্ষমতা শুনতাম।

কিন্তু ভাষার ইতিহাস শুধু বড় ঘটনাতে লেখা হয় না। ছোট ছোট প্রযুক্তিও ভাষাকে টেনে হিঁচড়ে বদলায়। টাইপরাইটার এলো—লেখা দ্রুত হলো, ভাষা কিছুটা সংক্ষিপ্ত হলো। ল্যান্ডফোন এলো—কথা হলো কম, “হ্যালো” আর “কেমন আছো”র মধ্যে দৌড়ঝাঁপ বাড়ল। ক্যাসেট-প্লেয়ার এলো—গানের বাংলা ঘরে ঢুকল, শব্দের সুর বদলাল। তারপর কম্পিউটার। তখন আমরা বুঝলাম বাংলা অক্ষরেরও একটা কীবোর্ড লাগে। বিজয়, ইউনিকোড—এগুলো শুধু সফটওয়্যার নয়, এগুলো আসলে আমাদের লিখিত ভাষার গেটপাস। কীবোর্ড যেমন, বানানও তেমন। যে অক্ষর টাইপ করতে কষ্ট, সে অক্ষর একটু একটু করে হারিয়ে যেতে চায়—ভাষা খুব আলসে।

মোবাইল ফোন এসে বাংলা আরও দ্রুত হলো। এসএমএসের যুগে “ভালো” হলো “vlo”, “কেমন” হলো “kemon”—বাংলা রোমান পোশাক পরে রাস্তায় নামল। এ পোশাক দেখে অনেকেই ভয় পেলেন: “ভাষা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে!” আমার মনে হয়, ভাষা নষ্ট হয় না—ভাষা বদলায়। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ যে প্রশ্নটি করেছিলেন, সেটাই আজও সবচেয়ে বাস্তব: “মাতৃভাষার উন্নতি ছাড়া কোনো জাতি কি কখনও বড় হতে পেরেছে?”

উন্নতি মানে শুধু শুদ্ধ বানান না—উন্নতি মানে ব্যবহার, বিস্তার, নতুন জগতে টিকে থাকার ক্ষমতা। প্রযুক্তির জগতে যদি বাংলা অস্বস্তিতে থাকে, তাহলে আমরা ছোট হয়ে যাব। ভাষা নয়—আমরা। তারপর সোশ্যাল মিডিয়া এল। এখানে বাংলা কথা বলে না—বাংলা ছুটে বেড়ায়। স্ট্যাটাস, কমেন্ট, মিম, হ্যাশট্যাগ—সবই নতুন নতুন “ঘরানা” তৈরি করেছে। কারও বাংলা খুব সাহিত্যিক, কারও বাংলা খুব আঞ্চলিক, কারও বাংলা ইমোজির সঙ্গে মিশে অর্ধেক মুখভঙ্গি হয়ে গেছে। মজার ব্যাপার হলো—এখানে “মাধ্যম” শুধু কাগজ বা স্ক্রিন নয়; মাধ্যম হলো অ্যালগরিদমও। কোন শব্দ ভাইরাল হবে, কোন বাক্য হারিয়ে যাবে—তার একটা বড় অংশ নির্ধারণ করে প্ল্যাটফর্মের নিয়মকানুন। ভাষা এখন আর শুধু মানুষের হাতে নেই; ভাষা মানুষের সঙ্গে মেশিনের হাতেও।

এই জায়গায় এসে হুমায়ুন আজাদকে মনে পড়ে। তিনি খুব সোজা করে জিজ্ঞেস করেছিলেন: “বাঙলা ভাষা কি একটি? নাকি অনেক?”

বাংলাদেশে বাংলা সত্যিই “অনেক”। বাসের হেলপার যে বাংলা বলে, টিভি নিউজরিডার যে বাংলা বলে, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক যে বাংলা লেখে, টিকটকে যে বাংলা নাচে—সবগুলো আলাদা, আবার সবগুলোই আমাদের। প্রযুক্তি এই “অনেক”-কে একই জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে। আগে আঞ্চলিক শব্দ শহরে উঠতে সময় নিত; এখন এক রাতেই ট্রেন্ডিং। আগে নতুন শব্দ জন্মাত বইয়ে; এখন জন্মায় ইনবক্সে। “লাইক দিলাম”, “ইনবক্সে আসেন”, “স্ক্রিনশট পাঠাই”—এগুলো আমাদের দৈনন্দিন বাংলা। কেউ কেউ মুখ বাঁকান, কিন্তু ভাষা তো মুখ বাঁকিয়ে বাঁচে।

আর নজরুল—নজরুল মনে করিয়ে দেন ভাষার ভিতরে মানুষ থাকা জরুরি। “মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।”

প্রযুক্তি যখন আমাদের কথা বলার গতি বাড়ায়, তখন মানুষটা যেন ছোট না হয়ে যায়। “দ্রুত” আর “উচ্চস্বরে” এক জিনিস নয়। অনেক সময় দ্রুত কথা বলতে গিয়ে আমরা কম শুনি। কম শুনতে শুনতে ভাষা একদিন কেবল শব্দ হয়ে যায়—অর্থ থাকে না, মমতা থাকে না।

আমার খুব কৌতূহল লাগে—আগে আমরা “চিঠি লিখতাম”, এখন “মেসেজ দিই”; আগে “খবরের কাগজ পড়তাম”, এখন “ফিড স্ক্রল করি”; আগে “আড্ডা দিতাম”, এখন “ভয়েস নোট পাঠাই”; আগে “পাণ্ডুলিপি” ছিল, এখন “কনটেন্ট”। শব্দ বদলায়, অভ্যাস বদলায়, মূল্যবোধও একটু একটু করে বদলায়। কিন্তু একটা জিনিস বদলায় না—মানুষের মন। মানুষ এখনো ভালোবাসলে শব্দ খোঁজে, কষ্ট পেলে নীরব হয়, আনন্দ পেলে গান গায়। প্রযুক্তি কেবল সেই মনকে প্রকাশের নতুন দরজা দেয়।

তবে ভয়ও আছে। আমরা যদি বাংলা লিপিকে প্রযুক্তির ভেতরে আরও সহজ, আরও সুন্দর, আরও সম্মানিত না করি—তাহলে বাংলা ধীরে ধীরে “শেয়ারযোগ্য” ভাষা হয়ে উঠবে, “লেখার” ভাষা থাকবে না। স্কুলের বইয়ে বাংলা থাকবে, কিন্তু ভবিষ্যতের সফটওয়্যারের মেনুতে থাকবে না। এটা যেন না হয়। বাংলা কীবোর্ড, বাংলা ফন্ট, বাংলা ভয়েস-টু-টেক্সট, বাংলা এআই—এসবকে রাষ্ট্রীয় আর সামাজিকভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি শুধু ফুল দিয়ে পালন করলে হবে না; ভাষাকে নতুন প্রযুক্তির ভেতর বাঁচিয়ে রাখতে হবে।

আমি আশাবাদী—কারণ আমাদের ভাষার জেদ আছে। যে ভাষা রক্ত দেখে দাঁড়িয়েছে, সে ভাষা স্ক্রিন দেখে ভয় পাবে কেন? আমরা যদি প্রযুক্তিকে বাংলার বন্ধু বানাতে পারি, তাহলে একদিন হয়তো আমার ভাগ্নেও “Ami ashtesi” লিখবে না—সে লিখবে “আমি আসছি”, আর সেটা লিখতে তার আঙুলে কষ্ট হবে না, মনেও লজ্জা হবে না। সেদিন বৃষ্টির শব্দটা হয়তো আবার কাগজের গন্ধের মতো ফিরে আসবে—নতুন এক রূপে, নতুন এক মাধ্যমে, কিন্তু একই মায়ায়।

মোঃ নিয়াজ আলমগীর, সহকারি অধ্যাপক
আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।
   

About

Popular Links

x