Thursday, June 04, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

রাজনৈতিক-প্রভাবমুক্ত উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন কী অধরাই থেকে যাবে?

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রত্যাশা পূরণে কিছুই করেনি। কোনো নীতিমালা প্রতিষ্ঠিত করেনি তারা। পুরো ব্যবস্থাটাই আবার আগের সেই পুরনো খোলসে ঢুকে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।

আপডেট : ০১ মার্চ ২০২৬, ০১:৫৪ পিএম

জুলাই অভ্যুত্থানের একটা বড় অংশ জুড়ে ছিল শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের প্রত্যাশা। যেহেতু আন্দোলন শুরু হয়েছিল শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে, সেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিবেশ, জবাবদিহিতা ও উন্নয়ন ছিল বিভিন্ন আলোচনার অনুষঙ্গ। তৎকালীন সরকার যখন শিক্ষার্থীদের ওপর জোর প্রয়োগ করছিল, তখন রাস্তায় নেমেছিলেন অনেক শিক্ষকও। আমি এবং আমার মতো আরও অনেকেই, যাঁরা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষ হয়ে কোনো মিটিং-মিছিলে যাননি, তাঁরাও রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছিলেন শিক্ষার্থীদের পক্ষ হয়ে।

একটি গণঅভ্যুত্থানে সমাজের নানান শ্রেণির মানুষ নানান উদ্দেশ্য নিয়ে অংশ নেয়। একটি নির্যাতনমূলক সরকার সরে যাওয়ার পর নতুন করে সম্ভাবনার আলো ফুটবে দেশে- এমন প্রত্যাশা করে তারা সকলেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে আমাদের অনেকের প্রত্যাশা ছিল উচ্চশিক্ষার সংস্কার নিয়ে। ঐতিহাসিকভাবে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়-ক্যাম্পাসগুলো সরকারি দল ও তাদের ছাত্রসংগঠনগুলো যেভাবে নির্যাতনের আখড়া হিসেবে ব্যবহার করেছে, তা থেকে মুক্তির প্রত্যাশা ছিল আমাদের।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বলতে গেলে সেই প্রত্যাশা পূরণে কিছুই করেনি। কোনো নীতিমালা প্রতিষ্ঠিত করেনি তারা। পুরো ব্যবস্থাটাই আবার আগের সেই পুরনো খোলসে ঢুকে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।

বিশেষত নির্বাচনের পর সরকারদলীয় পরিচয়ে শিক্ষকদের নানান কর্মকাণ্ড বিস্তৃত হচ্ছে। প্রশাসনিক পদগুলো দখলের ব্যাপারে একটা ক্ষেত্র প্রস্তুত হচ্ছে আবার। যেন আমরা বাইবেলে বর্ণিত মুসা (আ.)-এর সেই অভিশপ্ত কওম, যারা সারা দিন সফর করে সন্ধ্যায় দেখত যেখান থেকে যাত্রা শুরু করেছে, আবার সেখানেই ফিরে অবস্থান করছে। উচ্চশিক্ষা নিয়ে আমাদের এই দিশাহীন যাত্রার শেষ কি তবে হবে না?

বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসন জিতে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। তারেক রহমান- যিনি এবারই প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেন এবং প্রথমবারের মতো দলের চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচনে নেতৃত্ব দিলেন- প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন। এই বিশাল জনরায় কেবল একটি দলের বিজয় নয়, এটি জনগণের পক্ষ থেকে পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট দাবি। সেই দাবির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাক্ষেত্র হতে পারে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা।

উত্তরাধিকারের বোঝা

নতুন সরকার যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পাচ্ছে, সেগুলো কয়েক দশকের রাজনৈতিক দখলদারিত্বের শিকার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে জেলা শহরের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত একই চিত্র- উপাচার্য নিয়োগ হয় দলীয় বিবেচনায়, শিক্ষক নিয়োগ হয় আনুগত্যের পুরস্কার হিসেবে, আর ছাত্রাবাসগুলো থাকে ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের নিয়ন্ত্রণে। এই ব্যবস্থা আওয়ামী লীগ আমলেও ছিল, অতীতে বিএনপি আমলেও ছিল। পার্থক্য শুধু দলের নামে, কাঠামোয় নয়।

এই সত্যটি স্বীকার করা জরুরি, কারণ নতুন সরকারের সামনে প্রলোভনটাও পুরোনো- বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আবারও নিজেদের মতো করে সাজিয়ে নেওয়া। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা এই প্রলোভনকে আরও সহজলভ্য করে তোলে। কিন্তু ইতিহাস বলে, এই পথে গেলে পাঁচ বা দশ বছর পর আবার একই সংকট ফিরে আসবে, কেবল মুখোশ বদলাবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: প্রথম পরীক্ষাক্ষেত্র

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদ বর্তমানে শূন্য। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় নিয়োগ পাওয়া উপাচার্য পদত্যাগ করেছেন নিজে থেকেই। নতুন সরকারকে অচিরেই এই পদে কাউকে নিয়োগ দিতে হবে। এই একটি নিয়োগ হবে গোটা সরকারের উচ্চশিক্ষানীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই বিশ্ববিদ্যালয় জাতির প্রতিটি ঐতিহাসিক মোড়ে নেতৃত্ব দিয়েছে- ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে জুলাই অভ্যুত্থান পর্যন্ত। অথচ সেই গৌরবময় প্রতিষ্ঠানটি আজ QS বিশ্ব বিশ্ববিদ্যালয় র‍্যাংকিংয়ে ৫৮৪তম। এশিয়ার শীর্ষ একশোতেও নেই। একটি বিশ্ববিদ্যালয় যে জাতির জন্মে ভূমিকা রেখেছে, তার এই অবস্থানের পেছনে রাজনৈতিক দখলদারিত্বের অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই।

আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্য নিয়োগের একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি আছে। সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ভারতের আইআইটি কিংবা মালয়েশিয়ার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একটি স্বাধীন সার্চ কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটিতে থাকেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটের নির্বাচিত প্রতিনিধি, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, শিল্পখাতের প্রতিনিধি, প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি এবং দু-একজন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ। প্রার্থীদের মূল্যায়ন হয় গবেষণার অবদান, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে দূরদর্শিতার ভিত্তিতে।

বিএনপি সরকার যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগে এই ধরনের একটি স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে, তাহলে এটি কেবল একটি পদ পূরণ হবে না- এটি হবে একটি ঐতিহাসিক নজির। দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর একটি বার্তা এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সহজেই দিতে পারবে তারা। অন্য সকল ক্ষেত্রে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। আর যদি পরিচিত পথে অর্থাৎ আগের মতো আনুগত্য বিবেচনায় কাউকে বসানো হয়, তাহলে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি প্রথম দিন থেকেই প্রশ্নের মুখে পড়বে।

শিক্ষক নিয়োগ: নীতিমালার আধুনিকায়ন জরুরি

উপাচার্য একা সব বদলাতে পারবেন না যদি শিক্ষক নিয়োগের কাঠামো একই থাকে। বর্তমান ব্যবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগগুলো নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এতটাই স্বেচ্ছাচারী যে যোগ্যতর প্রার্থী পরিচয়হীন হলে বারবার বাদ পড়েন। এই চর্চার মূল্য চোকাচ্ছে দেশ। বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, বাংলাদেশের মাত্র ২০ শতাংশ স্নাতক শ্রমবাজারের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম- পাঁচজনের মধ্যে চারজন গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছেন যোগ্যতার ঘাটতি নিয়ে। এই সংকটের শিকড় শিক্ষক মানের অবনতিতেও।

নতুন সরকারকে একটি জাতীয় নীতিমালা তৈরি করতে হবে যেখানে থাকবে- বিজ্ঞাপন প্রকাশ থেকে চূড়ান্ত নিয়োগ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ, নিয়োগ বোর্ডে বাইরের বিশেষজ্ঞ অন্তর্ভুক্তি, এবং পদোন্নতির ক্ষেত্রে গবেষণা প্রকাশনা ও শিক্ষাদান মানকে প্রাথমিক মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকেও ঢেলে সাজাতে হবে। এই মুহূর্তে ইউজিসি কার্যত সরকারের একটি বর্ধিত অঙ্গ হিসেবে কাজ করে। এটিকে সত্যিকারের স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থায় পরিণত করতে হবে, যার কাজ হবে মানদণ্ড নির্ধারণ ও পর্যবেক্ষণ- নিয়োগে হস্তক্ষেপ নয়।

দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা: সুযোগ না বিপদ?

তারেক রহমানের সরকার দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। এই শক্তি দিয়ে সংসদে আইন পাস করা যায়, কাঠামোগত সংস্কার করা যায়। বিশ্ববিদ্যালয় আইনগুলো সংশোধন করে উপাচার্য নিয়োগে স্বচ্ছতা বাধ্যতামূলক করা, শিক্ষক নিয়োগে জাতীয় মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করা- এসব এখন আইনগতভাবে সম্ভব।

কিন্তু এই একই শক্তি ব্যবহার করে সব বিশ্ববিদ্যালয় দ্রুত নিজেদের রঙে রাঙিয়ে নেওয়াও সম্ভব। ইতিহাস বলে, বাংলাদেশে যে দলই ক্ষমতায় এসেছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রথম দিকেই নিজেদের আওতায় নিতে চেয়েছে। বিএনপি এই প্রলোভন থেকে মুক্ত থাকতে পারবে কিনা, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

প্রত্যাশার ভার কেটে সফল হোক নতুন সরকার

জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম যে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছে, তার একটি বড় অংশ শিক্ষাব্যবস্থাকে ঘিরে। তারা চেয়েছে এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে মেধাই পরিচয়, দলীয় পরিচয় নয়। সেই প্রজন্মের ভোটও এই নির্বাচনের ফলাফলে ভূমিকা রেখেছে।

তারেক রহমানের সরকারের সামনে তাই শুধু একটি প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, একটি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিও আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ থেকে শুরু করে জাতীয় শিক্ষানীতি পর্যন্ত প্রতিটি সিদ্ধান্তে এই প্রতিশ্রুতির পরীক্ষা হবে।

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা কি সত্যিই রাজনীতির বাইরে যেতে পারবে? নাকি শুধু দলের রং বদলাবে, কাঠামো একই থাকবে? এই প্রশ্নের উত্তর আগামী কয়েক মাসেই স্পষ্ট হয়ে যাবে।

ড. মুশতাক ইবনে আয়ূব
সহযোগি অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ইমেইল: [email protected]
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।
   

About

Popular Links

x