Thursday, September 10, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

‘সম্পত্তি হস্তান্তর আইন ১৮৮২’- এর সংশোধনের সঙ্গে কি ইসলামিক শরিয়ার সংঘাত আছে?

অনেকে প্রশ্ন করছেন-এমন একটি ব্যবস্থা কি শরিয়া বিরোধী? হেবা ও নতুন আইনি ব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্যই বা কী?

আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:২২ পিএম

পরিবর্তনকে আমরা সহজে গ্রহণ করি না। নতুন কোনো আইন, রীতি বা ব্যবস্থা আমাদের দীর্ঘদিনের অভ্যাস, বিশ্বাস কিংবা প্রচলিত ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে-এই আশঙ্কা থেকেই অনেক সময় আমরা পরিবর্তনকে সন্দেহের চোখে দেখি। সামাজিক বিজ্ঞানেও পরিবর্তনের প্রতি মানুষের এই স্বাভাবিক প্রতিরোধের কথা বলা হয়েছে। কারণ পরিবর্তন বা নতুন মানেই কিছুটা অনিশ্চয়তা।

বাংলাদেশে সম্প্রতি সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২-এর নতুন বিধান সংযোজন নিয়ে যে আলোচনা ও বিতর্ক শুরু হয়েছে, সেটিও অনেকটা সেই বাস্তবতার প্রতিফলন। বিশেষ করে ১২২(এ) ও ১২২(বি) ধারা সংযোজন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে-এই বিধান কি ইসলামিক শরিয়ার সঙ্গে সাংঘর্ষিক? এটি কি কুরআনিক উত্তরাধিকারীদের প্রাপ্য অধিকার ক্ষুণ্ন করার সুযোগ তৈরি করবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজবার আগে নতুন বিধানটি আসলে কী করতে চাইছে, বিদ্যমান আইনে সম্পত্তি কীভাবে হস্তান্তর হয় সে বিষয়টি একটু জানা প্রয়োজন।

বাংলাদেশে সম্পত্তি হস্তান্তরের প্রচলিত পদ্ধতি অনেকগুলো। বিক্রয়, বন্ধক, ইজারা, এওয়াজ-বদল, দান এবং নালিশি দাবির হস্তান্তরসহ বিভিন্ন আইনি পদ্ধতিতে সম্পত্তি হস্তান্তর হয়ে থাকে। বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নিজস্ব আইন ও স্বীকৃত পদ্ধতিও রয়েছে। নতুন সংযোজিত বিধানগুলো এসব পদ্ধতি বাতিল বা প্রতিস্থাপন করছে না। বরং এর মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তরের আরেকটি আইনি পদ্ধতি তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছে-যেখানে দাতা জীবদ্দশায় সম্পত্তির ভোগ ও ব্যবহার করার অধিকার সংরক্ষণ করেও সম্পত্তির মালিকানা অন্যের কাছে হস্তান্তর করতে পারবেন। অর্থাৎ, একজন বাবা-মা চাইলে সন্তানকে সম্পত্তি দিয়ে যেতে পারবেন, কিন্তু তিনি জীবিত থাকা পর্যন্ত সেই সম্পত্তিতে নিজের ভোগদখল বা ব্যবহার অব্যাহত রাখার অধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন। একইভাবে নির্দিষ্ট নিকট আত্মীয়দের মধ্যেও এ ধরনের ব্যবস্থা প্রযোজ্য হতে পারে।

অনেকে প্রশ্ন করছেন-এমন একটি ব্যবস্থা কি শরিয়া বিরোধী? হেবা ও নতুন আইনি ব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্যই বা কী? মুসলিম আইনে হেবা বা দান সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি সুপ্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি। সাধারণভাবে হেবার ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ-দান করার ইচ্ছা বা ঘোষণা (ইজাব), গ্রহিতার দ্বারা গ্রহণ (কবুল) এবং দখল হস্তান্তর বা কব্জা। এই দখল সবসময় প্রত্যক্ষ দখল হতে হবে-এমন সরলীকৃত ধারণাও বাস্তবতার সঙ্গে সবসময় মেলে না। পরিবারের মধ্যে সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে পরোক্ষ দখলও হয়ে থাকে। যেমন হেবা করা সম্পত্তিটি ভাড়াটিয়ার কাছে ভাড়া থাকতে পারে।
  
১৯৯৯ সালের দিকে আমার পেশাগত জীবনের একটি ঘটনা এখানে প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভূমির সীমাবদ্ধতার আদেশ এর বিভিন্ন বাস্তবতার মধ্যে একজন বাবা তার প্রায় ১০০ বিঘার উপরের জমির প্রায় ৩০ বিঘা মেয়েকে হেবা করেছিলেন। কিন্তু সম্পত্তির দেখাশোনা ও ব্যবস্থাপনা বাবা নিজেই করতেন। বাবার মৃত্যুর পর মেয়ে যখন কাগজপত্র নিয়ে নামজারি করতে যান, তখন জটিলতা দেখা দেয়। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি হাইকোর্ট পর্যন্ত গড়ায়। আমরা যুক্তি দিয়েছিলাম যে, পারিবারিক বাস্তবতায় সরাসরি দখল না থাকলেও কনস্ট্রাক্টিভ পোজেশন-এর মাধ্যমে হেবা কার্যকর হয়েছে। কিন্তু আদালত নামজারির বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে হেবাটিকে কার্যকর হিসেবে গ্রহণ করেননি। মামলাটি আমরা হেরে যাই। এই অভিজ্ঞতা তখনই আমাকে একটি বিষয় ভাবিয়েছে-আইনের কাঠামোর মধ্যে থেকেই কি এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা যায় না, যেখানে দাতা তার সম্পত্তি জীবদ্দশায় নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করবেন, কিন্তু একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ মালিকানার বিষয়টিও নিশ্চিত করে যাবেন? নতুন সংশোধনীর একটি উদ্দেশ্য হয়তো এমন বাস্তব সমস্যারই সমাধানেরই একটি প্রচেষ্টা।

আরেকটি ঘটনা আমাকে আরও গভীরভাবে বিষয়টি ভাবতে বাধ্য করে। ২০১২ সালের কথা। আমি আমার বাবার কাছ থেকে হেবা হিসেবে পাওয়া একটি সম্পত্তির ব্যবস্থাপনার জন্য আবার বাবাকেই আমমোক্তারনামা দিয়েছিলাম। সাব-রেজিস্ট্রার জানতে চেয়েছিলেন, কেন আমি বাবাকে আমমোক্তার করছি। আমার উত্তর ছিল-আমি সবসময় সম্পত্তির দেখাশোনা করতে পারি না; তাই বাবা যেন সম্পত্তিটির পরিচালনা ও দেখাশোনা করতে পারেন। সেই সাথে তার ভোগদখলের অধিকার থাকলো। তখন এমন নতুন আইনি কাঠামো থাকলে, বিষয়টি আরো সরল ও স্বচ্ছভাবে অর্জন করা যেতো। আইনের নানা কৌশল ব্যবহার করে আইনজীবীরা বহুদিন ধরেই দাতার স্বার্থ রক্ষার বিভিন্ন পরোক্ষ পথ খুঁজে নিয়েছেন । প্রশ্ন হলো, সেই বাস্তবতাকে যদি একটি স্পষ্ট আইনি কাঠামোর মধ্যে আনা হয়, তাহলে সেটি কেন অগ্রহণযোগ্য হবে? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বয়স্ক বাবা-মায়ের নিরাপত্তা। চলমান বিতর্কের একটি মানবিক দিকও রয়েছে, যা আমাদের উপেক্ষা করা উচিত নয়।

আমার এক ক্লায়েন্টকে তার মায়ের সম্পত্তি পেতে দীর্ঘ আইনি লড়াই করতে হয়েছিল। তার মা নিজ পিতার কাছ থেকে হেবা হিসেবে যে সম্পত্তি পেয়েছিলেন, পরবর্তীতে তার মৃত্যর পর তার স্বামী সেই সম্পত্তি দ্বিতীয় স্ত্রীকে দিয়ে যান। ফলে প্রথম পক্ষের সন্তানরা অর্থাৎ আমার ক্লায়েন্ট তার নানার কাছ থেকে আসা সম্পত্তি নিয়ে সৎ মায়ের সাথে আইনি জটিলতার মধ্যে পড়ে যায়। যদি মা জীবিত অবস্থায় নিজের সম্পত্তি সন্তানকে  দান করে দিয়ে যেতে পারতেন এবং একই সঙ্গে নিজের জীবদ্দশায় ভোগদখল নিশ্চিত করতে পারতেন, তাহলে পরিস্থিতি হয়তো ভিন্ন হতে পারতো। সম্প্রতি এক আত্মীয়ও আমাকে ফোন করে একই ধরনের উদ্বেগের কথা বলেছেন। তিনি মেয়েকে সম্পত্তি দিয়ে যেতে চান। কিন্তু তার আশঙ্কা-মেয়ের ভবিষ্যৎ স্বামী কেমন হবেন, তা তিনি জানেন না। যদি কোনো একসময় মেয়ের স্বামী তাকে নিজের বাড়ি থেকেই বের করে দিতে চান, তখন তার কী হবে? এমন ভয়কে কি অমূলক বলে উড়িয়ে দেওয়া যায়? বাংলাদেশে এমন ঘটনাও বিরল নয় যেখানে সন্তানদের নামে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পর বৃদ্ধ বাবা-মা নিজেরাই সেই সম্পত্তিতে অনিরাপদ হয়ে পড়েন। কোথাও তাদের বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়, কোথাও তাদের সম্পত্তি বন্ধক রেখে ঋণ নেওয়া হয়, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেই সম্পত্তি শেষ পর্যন্ত নিলামে ওঠে। তাই সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তর এবং দাতার জীবনকালীন নিরাপত্তা-দুটিকে একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

শরিয়া কি সম্পত্তির মালিককে জীবদ্দশায় দান করতে বাধা দেয়? এখানেই বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা আছে। সমালোচকদের একটি অংশের আশঙ্কা-নতুন আইন ব্যবহার করে কেউ পছন্দের সন্তানকে সম্পত্তি দিয়ে গেলে অন্য কুরআনিক উত্তরাধিকারীরা তাদের শরিয়া সম্মত অংশ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।  আশঙ্কাটি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, জীবদ্দশায় বৈধভাবে হেবা বা দান করার অধিকার নতুন কোনো আইন সৃষ্টি করেনি। এই অধিকার ইসলামিক শরিয়া আইনে বহুদিনের স্বীকৃত বিষয়। অর্থাৎ, নতুন আইন না থাকলেও একজন ব্যক্তি জীবদ্দশায় বৈধ পদ্ধতিতে তার সম্পত্তি হেবা করতে পারেন। শুধুমাত্র  "ওসিয়ত" বা উইল এর ক্ষেত্রে ব্যাপারটি ভিন্ন । ফলে অন্য উত্তরাধিকারীদের বঞ্চিত হবার সমস্যাটি নতুন আইনের দ্বারা সৃষ্ট নয়; এটি মূলত সম্পত্তি হস্তান্তরের দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। এ কারণেই আমাদের সযত্নে বিস্তারিত আলোচনাটি প্রয়োজন-কীভাবে এমন হস্তান্তর হবে যাতে দাতার স্বাধীন ইচ্ছা, তার জীবনের ও জীবিকার নিরাপত্তা এবং সম্ভাব্য উত্তরাধিকারীদের ন্যায্য স্বার্থ-সবকিছুর মধ্যে একটি ভারসাম্য থাকবে।

নতুন সংশোধনী বোঝার জন্য সম্পত্তির ‘মালিকানা’ আর ‘ভোগদখল’ এর মধ্যে যে পার্থক্য তাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো সম্পত্তির মালিকানা অন্যের কাছে হস্তান্তর করা এবং জীবদ্দশায় সেই সম্পত্তির আয়, ব্যবহার বা ভোগের অধিকার নিজের কাছে রাখা-দুটি বিষয় সবসময় এক নয়। বিশিষ্ট মুসলিম আইনবিদ এ. এ. ফাইজি এবং ডি. এফ. মোল্লার মুসলিম আইনের আলোচনাতেও মালিকানার মূল স্বত্ব এবং জীবনকালীন ভোগের অধিকারের মধ্যে পার্থক্যের ধারণা পাওয়া যায়। সুতরাং প্রশ্নটি শুধু “সম্পত্তি কে পেলো?”-এতো সরল নয়। প্রশ্ন হলো, কোন অধিকার কখন, কীভাবে এবং কোন শর্তে হস্তান্তরিত হচ্ছে।

সরাসরি এমন কথা বলা ঠিক হবে না যে, নতুন বিধানগুলো ইসলামিক শরিয়ার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ এই সংশোধনী দ্বারা বিদ্যমান শরিয়া অনুযায়ী হেবা, আইনগত দান, উইল কিংবা আইন দ্বারা স্বীকৃত অন্যান্য ধর্মের সম্পত্তি হস্তান্তরের পদ্ধতিগুলোকে বাতিল বা সীমিত করার কথা বলা হয়নি। বরং নতুন পদ্ধতিটি জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাংলাদেশি মানুষের জন্য একটি অতিরিক্ত আইনি সুযোগ তৈরি করেছে, বিশেষ করে তাদের জন্যে, যে সব দাতা জীবিত থাকা অবস্থায় নিজে ভোগ ও ব্যবহারের অধিকার সংরক্ষণ করে সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তর করতে চান। আবার যিনি প্রচলিত শরিয়া অনুযায়ী হেবা করতে চান, তিনি সেই পদ্ধতিই অনুসরণ করতে পারবেন। কাউকে নতুন পদ্ধতি গ্রহণে বাধ্য করা হচ্ছে না এই আইনি সংশোধনীতে।

তবে কি এই নতুন সংশোধনী  নিয়ে কি তর্ক-বিতর্ক বা আলোচনার প্রয়োজন নেই? আছে। যে কোনো কোনো আইনকে প্রগতিশীল বা জনমুখী বলা মানেই তার কোনো ঝুঁকি নেই-এমন নয়। নতুন ব্যবস্থায় দাতা ও গ্রহীতার অধিকার কীভাবে বাস্তবে সংরক্ষিত হবে? সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কার? দাতা ও গ্রহীতার মধ্যে ভবিষ্যতে বিরোধ হলে প্রতিকার কী? অব্যবস্থায় সম্পত্তি নষ্ট হলে বা তার মূল্য কমে গেলে দায় কার? দাতা বা গ্রহীতা সম্পত্তি বন্ধক রাখতে পারবে কি? সেই ক্ষেত্রে দাতা /গ্রহীতার দায় কতটুকু? দাতার ওপর কোনো ধরনের অযাচিত প্রভাব প্রয়োগ করা হয়েছিল কি না-তা কীভাবে নির্ধারিত হবে?

এসব প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর প্রয়োজন। এই আইনের অপব্যবহার রোধে কী ধরনের সুরক্ষা থাকবে এটিও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের দেওয়ানি মামলার দীর্ঘসূত্রতা আমাদের সবারই জানা। একটি দুর্বল দলিল, অস্পষ্ট শর্ত বা বিতর্কিত হস্তান্তর বহু বছর ধরে মামলা-মোকদ্দমার কারণ হতে পারে। তাই নতুন আইন করার পাশাপাশি এর বাস্তব প্রয়োগের জন্য সুস্পষ্ট বিধি, দলিলের নির্দিষ্ট কাঠামো, নিবন্ধন প্রক্রিয়া এবং বিরোধ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। আমি বাংলাদেশে আইন পেশার পাশাপাশি কানাডার অন্টারিওতেও আইন পেশায় নিয়োজিত। উন্নত অনেক আইনব্যবস্থায় সম্পত্তি পরিকল্পনার ক্ষেত্রে একই ধরনের একটি মৌলিক চিন্তা দেখা যায়-বয়স্ক ব্যক্তি যেন নিজের সম্পত্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা জীবনের শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে পারেন।

উদাহরণ হিসেবে, কানাডায় স্বামী-স্ত্রী নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সম্পত্তি জয়েন্ট টেন্যান্সি (যৌথ মালিকানা) হিসেবে কিনতে পারেন, যার ফলে একজনের মৃত্যুর পর অন্যজন সম্পত্তির পূর্ণ মালিকানা পেতে পারেন। এই ক্ষেত্রে ওই সম্পত্তি মৃত ব্যক্তির সন্তানদের কেউ পাবে না, যতক্ষণ তিনি বেঁচে আছেন বা তিনি বিক্রি/বিলি করে দেন। আবার এস্টেট প্ল্যানিংয়ের এর মাধ্যমে  সারভাইভিং স্পাউস -এর জীবনকালীন ভোগ বা আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিভিন্ন কাঠামোও (স্পাউসাল ট্রাস্ট) রয়েছে। এর পেছনে একটি সাধারণ মানবিক দর্শন কাজ করে-বৃদ্ধ বাবা-মাকে তাদের জীবনের শেষ পর্যায়ে সন্তান বা অন্য কারও ওপর অনিরাপদভাবে নির্ভরশীল করে না তোলা। বাংলাদেশেও এই দর্শন অপ্রাসঙ্গিক নয়।

যারা বলছেন এটি শরিয়া বিরোধী, তাদের যুক্তি ও আইনি ভিত্তি বিস্তারিতভাবে জানা দরকার। একই সঙ্গে যারা আইনটির পক্ষে কথা বলছেন, তাদেরও স্বীকার করতে হবে-যেকোনো নতুন সম্পত্তি-ব্যবস্থা অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে পারে, যদি যথাযথ সুরক্ষা না থাকে। সংসদে যথেষ্ট আলোচনা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন থাকতে পারে। আইন প্রণয়নের পর এখন প্রয়োজন আরও বিস্তৃতভাবে আইনজীবী, ইসলামিক স্কলার, শিক্ষাবিদ, সমাজবিজ্ঞানী, প্রবীণ নাগরিক, নারী এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে জনপরিসরে আলোচনা। কারণ সম্পত্তি শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবার, উত্তরাধিকার, নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা এবং মানুষের জীবনের শেষ বয়সের নিশ্চয়তা।

একজন মানুষ জীবিত ও সুস্থ অবস্থায় নিজের সম্পত্তি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা কতটা রাখবেন? তিনি যদি সম্পত্তি কাউকে দিয়ে যেতে চান, তাহলে একই সঙ্গে নিজের জীবনকালীন নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করবেন? আর সেই সিদ্ধান্ত যেন প্রতারণা, চাপ বা ‘আনডিউ ইনফ্লুয়েন্স’-এর ফল না হয়, রাষ্ট্র কীভাবে তা নিশ্চিত করবে? আমার সম্পত্তি আমি জীবিত অবস্থায় কাউকে দিতে চাই-এটি যদি আমার আইনগত অধিকার হয়, তাহলে সেই অধিকার প্রয়োগের একটি স্বচ্ছ ও নিরাপদ পদ্ধতি থাকা নিশ্চয়ই খারাপ নয়।

সুতরাং নতুন সংশোধনীকে অন্ধভাবে সমর্থন কিংবা অজ্ঞতাপ্রসূতভাবে প্রত্যাখ্যান-কোনোটিই কাম্য নয়। প্রয়োজন আইনের ভাষা, ইসলামিক শরিয়ার নীতি এবং বাংলাদেশের বাস্তব সামাজিক পরিস্থিতি-এই তিনটির মধ্যে একটি কার্যকর সমন্বয়। যদি ১৮৮২ সালের সম্পত্তি হস্তান্তর আইন সংশোধনের মাধ্যমে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা যায়, যেখানে দাতা তার জীবদ্দশায় সম্পত্তির নিরাপত্তা ও ভোগের অধিকার বজায় রেখেও ভবিষ্যৎ মালিকানা নিশ্চিত করতে পারেন, তাহলে এটি বাংলাদেশের বয়স্ক বাবা-মা, স্বামী-স্ত্রী এবং অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের সম্পত্তি পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এই নতুন আইনের যথার্থ প্রয়োগ ও এর সাফল্য নির্ভর করছে শুধু আইনের ওপর নয়-এর সঠিক ব্যাখ্যা, স্বচ্ছ প্রয়োগ, অপব্যবহার প্রতিরোধ এবং ভবিষ্যৎ বিচারিক ব্যাখ্যার ওপরও। আর এ কারণেই বিতর্কটি থামিয়ে দিয়ে নয়; বরং আরও তথ্যভিত্তিক, দায়িত্বশীল এবং জনস্বার্থকেন্দ্রিক আলোচনার মধ্য দিয়েই এই আইনের যথার্থ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

 

 নুসরাত জাহান, আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট; ব্যারিস্টার এন্ড সলিসিটর, অন্টারিও, কানাডা; ব্যারিস্টার-এট-ল (লিঙ্কন'স ইন); ইউ. কে.
প্রকাশিত মতামতটি লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।
   

About

Popular Links

x