বাংলাদেশে শিশুদের অপহরণ, সহিংসতা ও হত্যার মর্মান্তিক ঘটনাগুলো শিশুদের আরও ভালোভাবে সুরক্ষার বিষয়টি আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বেশ কয়েকটি ঘটনায় দেশবাসী স্তম্ভিত হয়ে পড়েছে।
কুমিল্লার ১৩ বছর বয়সী ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতীম এবং পল্লবীর ৮ বছর বয়সী শিশু হত্যাকাণ্ডসহ শিশু নিখোঁজ বা অপহরণের অন্যান্য ঘটনা প্রমাণ করে যে, একটি সাধারণ দিন কত সহজেই মর্মান্তিক হয়ে উঠতে পারে। গভীর শোক ও বিচারের দাবির পাশাপাশি এই ঘটনাগুলো পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারকে শিশুদের সুরক্ষার উপায় নিয়ে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করা উচিত।
২০২৬ সালের মে মাসে, ঢাকার পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ৮ বছর বয়সী এক শিশুর মরদেহ এক প্রতিবেশীর ভাড়া বাসা থেকে উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানায়, শিশুটিকে প্রলোভন দেখিয়ে ওই ঘরে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগে সেখানে বসবাসকারী এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তদন্তকারীদের ধারণা, হত্যার আগে শিশুটি যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকতে পারে। যেহেতু মামলাটিতে অপরাধমূলক অভিযোগ রয়েছে, তাই তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারিত হবে। তার মৃত্যু এক ভয়াবহ বার্তা দেয় যে, বিপদ সবসময় দূর-দূরান্ত বা অপরিচিত কোনো জায়গা থেকে আসে না। এমনকি এমন কোনো এলাকা বা আবাসিক কমপ্লেক্সেও- যেখানে বড়রা পরিবেশটিকে নিরাপদ মনে করেন সেখানেও একটি শিশু ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
কুমিল্লার ১৩ বছর বয়সী ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতীমের মৃত্যু আরেকটি সাম্প্রতিক ঘটনা যা মানুষকে গভীরভাবে শোকাহত করেছে।
পুলিশের তথ্যমতে, ২০২৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর মায়ের আইফোন দিয়ে ছবি তোলার উদ্দেশ্যে অপ্রতীম বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল। সে ফিরে না আসায় পরিবারের সদস্যরা তাকে খুঁজতে শুরু করেন এবং এ বিষয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। পরে লালমাই পাহাড়ের একটি অংশে তার মরদেহ পাওয়া যায়। এই অপরাধের ঘটনায় পুলিশ বেশ কয়েকজন তরুণকে আটক বা গ্রেপ্তার করেছে এবং জানিয়েছে যে প্রাথমিক তথ্যে ফোনটিই ঘটনার কারণ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে তদন্ত এখনো চলছে।
এই ঘটনাটি শিশু সুরক্ষার আরেকটি দিক উন্মোচন করে: শিশুরা এখন প্রায়শই দামি স্মার্টফোন ও অন্যান্য গ্যাজেট সঙ্গে রাখে, যা মাঝেমধ্যে তাদের ছিনতাই বা শোষণের ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। তবে, এসব অপরাধের জন্য শেষ পর্যন্ত অপরাধীরাই দায়ী; কোনো শিশুর কাছে ফোন থাকাটা তাদের ওপর সহিংসতা চালানোর কোনো অজুহাত হতে পারে না। এই ঘটনাগুলো একটি বৃহত্তর সমস্যার অংশ।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাইয়ের মধ্যে বাংলাদেশে ১৫,৭১৭টি শিশু নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। পুলিশের হিসাবমতে, এদের মধ্যে ২,০৩৮ জন তখনও নিখোঁজ ছিল এবং ১৩,৬৭৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে বা তারা পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে।
এছাড়া পুলিশ জানিয়েছে যে, শিশু নিখোঁজ হওয়ার কারণগুলো তাদের বয়স ও পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে।
‘আইন ও সালিশ কেন্দ্র’-এর একটি পৃথক তদন্ত অনুযায়ী, নিখোঁজ হওয়া শিশুদের মধ্যে অন্তত ৩৬ জনকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্টের মধ্যে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। এই পরিসংখ্যানগুলো নিখোঁজ শিশু সংক্রান্ত প্রতিটি অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা এবং দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
তবে এটি মনে রাখা জরুরি যে, নিখোঁজ শিশু বিষয়ক সব অভিযোগই অপহরণের ঘটনা নির্দেশ করে না। পথ হারিয়ে ফেলা, পারিবারিক কলহ, স্বেচ্ছায় বাড়ি থেকে চলে যাওয়া এবং অন্যান্য পরিস্থিতির কারণে যেসব শিশু নিখোঁজ হয়, তারাও পুলিশের রেকর্ডে অন্তর্ভুক্ত থাকে। তাই নিখোঁজ শিশুর সংখ্যার বিষয়টি সতর্কতার সাথে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
শিশুর কোনো ক্ষতি হলে সবসময়ই যে বাবা-মাকে দায়ী করতে হবে, তা নয়। কোনো বাবা-মাই সারাক্ষণ সন্তানের ওপর নজর রাখতে পারেন না এবং এমনকি সতর্ক পরিবারগুলোও অপরাধীদের খপ্পরে পড়তে পারে। এর পরিবর্তে, বাবা-মায়ের দায়িত্ব হলো যথাযথ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ছোটবেলা থেকেই বাবা-মা তাদের সন্তানদের নিরাপত্তার মৌলিক বিষয়গুলো শেখাতে পারেন, যেমন: কোনো বিশ্বস্ত প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিকে না জানিয়ে অপরিচিত কারো সঙ্গে কোথাও না যাওয়া; অনুমতি ছাড়া অপরিচিত কারো কাছ থেকে উপহার, গাড়িতে চড়ার প্রস্তাব বা কোনো আমন্ত্রণ গ্রহণ না করা; কেউ অস্বস্তিকর আচরণ করলে বা হুমকি দিলে সঙ্গে সঙ্গে বাবা-মা বা অভিভাবককে জানানো; এবং গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগের তথ্য মুখস্থ রাখা বা নিরাপদে সাথে রাখা।
ছোট শিশুদের ওপর কে নজর রাখছে এবং তারা কোথায় খেলছে, সে বিষয়ে বাবা-মায়ের সচেতন থাকা উচিত। বড় শিশুদের তাদের পরিকল্পনার কথা জানাতে উৎসাহিত করা গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে যখন তারা নতুন কোনো জায়গায় যাচ্ছে। শিশুদের অহেতুক আতঙ্কিত না করে পরিবারগুলোর উচিত নিরাপদ ও অনিরাপদ আচরণ সম্পর্কে আলোচনা করা। প্রযুক্তির ব্যবহারও এক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। জরুরি যোগাযোগের নম্বর সংরক্ষণ এবং কীভাবে সাহায্যের জন্য ডাকতে হয় তা শেখানোর পাশাপাশি, বাবা-মা বড় শিশুদের সাথে উপযুক্ত লোকেশন-শেয়ারিং বা অবস্থান জানানোর ব্যবস্থা করতে পারেন।
তবে, নজরদারি ও যোগাযোগের মূল দায়িত্বের বিকল্প হিসেবে নয় বরং প্রযুক্তিকে এই প্রক্রিয়াগুলোকে আরও উন্নত করার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা উচিত। কোনো শিশু নিখোঁজ হওয়ার পরবর্তী সময়টুকু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুটি হয়তো শীঘ্রই ফিরে আসবে-এমনটা ভেবে নিখোঁজের বিষয়টি জানানোর ক্ষেত্রে পরিবারের দেরি করা উচিত নয়। নিখোঁজ শিশুদের ঘটনাগুলো থেকে পাওয়া অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা এটি।
কোনো শিশু হঠাৎ নিখোঁজ হলে বাবা-মা বা অভিভাবকদের উচিত শিশুটির সর্বশেষ অবস্থান জানার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা, নির্ভরযোগ্য আত্মীয় ও বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ করা, প্রাসঙ্গিক ফোন বা ডিজিটাল তথ্য সংরক্ষণ করা এবং কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা। নিখোঁজ শিশুদের নিয়ে সাম্প্রতিক তদন্তগুলোতে দেখা গেছে যে সিসিটিভি ফুটেজ কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সেপ্টেম্বরে কাফরুলের ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে পুলিশ শরীয়তপুর থেকে সাত বছর বয়সী এক শিশুকে উদ্ধার করতে এবং তাকে অপহরণের সন্দেহে এক নারীকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছিল।
তবে দায়িত্ব কেবল বাবা-মায়ের নয়। যদিও বাবা-মায়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তবুও শিশুদের সুরক্ষার দায়িত্ব সবার। স্কুলে বয়সোপযোগী ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বিষয়ক শিক্ষা প্রদান করা উচিত এবং কোনো শিশু নিখোঁজ হলে বা তাকে খুঁজে না পাওয়া গেলে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সুনির্দিষ্ট কার্যপদ্ধতি থাকা প্রয়োজন। আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়েও প্রতিবেশী ও এলাকাবাসীর উচিত যেকোনো অস্বাভাবিক কার্যকলাপের ওপর নজর রাখা। প্রয়োজনে বাড়ির মালিক ও আবাসিক এলাকাগুলো সচল সিসিটিভি ক্যামেরা রক্ষণাবেক্ষণ এবং মৌলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে পারে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে: পরিবারগুলোর দ্রুত তথ্যের প্রয়োজন হয়, তদন্ত কার্যক্রম সঠিকভাবে সমন্বয় করতে হয় এবং নিখোঁজ শিশু সংক্রান্ত অভিযোগগুলো দ্রুততার সঙ্গে আমলে নিতে হয়। অবহেলা বা পদ্ধতিগত ত্রুটি প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা জরুরি।
মানবাধিকার সংস্থা ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্র’ একইভাবে দাবি জানিয়েছে যে, শিশুরা কীভাবে নিখোঁজ হলো, তাদের উদ্ধারে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল এবং অবহেলা বা সমন্বয়ের অভাব ফলাফলের ওপর কোনো প্রভাব ফেলেছিল কি না-তা নিয়ে যেন তদন্ত করা হয়।
প্রতিবার কোনো শিশু অপহৃত বা নিহত হলে জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি হওয়াটাই স্বাভাবিক। মানুষ চায় দোষীদের কঠোর শাস্তি হোক। কেবল শাস্তির মাধ্যমেই শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব নয়, তবে বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
প্রতিরোধের বিষয়টি অনেক বেশি জটিল। বাবা-মাকে তাদের সন্তানদের সাথে কথা বলতে হবে। স্কুলে নিরাপদ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। কমিউনিটিকে সতর্ক থাকতে হবে। পুলিশকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। নিখোঁজ শিশুদের বিষয়ক তথ্য হালনাগাদ ও নির্ভরযোগ্য রাখা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।
পাশাপাশি, সমাজকে এটি স্বীকার করতে হবে যে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগে ও পরে-উভয় সময়েই শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আরও একটি মর্মান্তিক ঘটনার পর, রামিসা ও অপ্রতীমের মৃত্যুকে কেবল দুটি নাম হিসেবে মনে রাখলেই চলবে না। তাদের এই পরিণতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, পরিবার, সমাজ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
একজন শিশু যখন খেলাধুলা, স্কুলে যাওয়া কিংবা ছবি তোলার মতো সাধারণ কোনো কাজে বাড়ির বাইরে যায়, তখন সেই স্বাভাবিক কার্যকলাপ যেন কোনোভাবেই জীবন-মরণের সংকটে পরিণত না হয়। এমন পরিবেশ গড়ে তোলা কেবল বাবা-মায়ের দায়িত্ব নয়, বরং তা সমগ্র সমাজেরই দায়িত্ব।



