আজ আমরা এমন এক সমাজে বাস করি, যেখানে মানুষে মানুষে পার্থ্যকের কমতি নেই। কারও রাজনৈতিক মত আলাদা, কারও বিশ্বাস ভিন্ন। কেউ আর্থিকভাবে স্বচ্ছল, কেউ আবার নিত্যদিনের জীবন সংগ্রামে ক্লান্ত। চিন্তা, পরিচয়, দৃষ্টিভঙ্গি, সবকিছুতেই এই ভিন্নতার ছাপ স্পষ্ট।
কিন্তু মানুষ যখন সকল ভিন্নতা ভুলে একে অন্যের পাশে দাঁড়ায়, সহযোগিতার হাত বাঁড়ায় তখন সেখানে কেবল সহাবস্থান নয়, গড়ে ওঠে এক গভীর মানবিকতার মেলবন্ধন।
প্রশ্ন হলো, এমন বন্ধন কি নিজে নিজে তৈরি হয়? না, হয় না।
পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা আর শান্তির মতো মূল্যবোধগুলো আমাদের প্রতিনিয়ত চর্চা করতে হয়। পরিবারে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কর্মক্ষেত্রে, পাড়ায়-মহল্লায় সবক্ষেত্রেই মানুষকে শিখতে হয় যে ভিন্নমত মানেই শত্রুতা নয়। কেউ আমার মতো চিন্তা করে না বলেই আমাকে তার বিপক্ষে দাঁড়াতে হবে বা সে আমার শত্রু হয়ে যাবে বিষয়টা তা নয়।
ব্যক্তির গণ্ডি পেরিয়ে এমন চিন্তা ভাবনা যখন সামাজিক অভ্যাসে পরিণত হয়, তখন তা ধীরে ধীরে সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে। আর সংস্কৃতির হাত ধরেই সম্প্রীতির শিক্ষা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছে যায়।
কিন্তু বাস্তবতা হলো এই যে সংস্কৃতির হাত ধরে সম্প্রীতির শিক্ষা ছড়িয়ে দেওয়া এতো সহজ নয়।
দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনের ভারে মানুষ যখন একে অন্যের প্রতি আস্থা হারায়, সমাজ তখন বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে। ঠিক তখনই সম্প্রীতির বন্ধন ফিরিয়ে আনা হয়ে ওঠে সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
দীর্ঘ দিন ধরে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড জাস্টিস (সিপিজে) সমাজে সম্প্রীতির বন্ধন জাগিয়ে তুলতে নীরবে কাজ করে যাচ্ছে। শান্তি-সম্প্রীতির চর্চা কেবল বইয়ের পাতায় আটকে থাকা তাত্ত্বিক দর্শন নয়; বরং মানুষের প্রতিদিনের চেনা জীবনের গল্প। সমাজে মানুষ একসঙ্গে হাঁটে, গল্প করে, কখনো মতের অমিলে বিতর্কে জড়ায়। আবার দিনশেষে সব দ্বিধা পেছনে ফেলে একই ছাদের নিচে পাশাপাশি থাকার অঙ্গীকার করে।
এই বিশ্বাস থেকেই ২০১৪ সাল থেকে দেশে শান্তি বিনির্মাণের জন্য একটি কাঠামো নিয়ে কাজ করে আসছে সিপিজে। উদ্দেশ্য ছিল খুবই সহজ, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ; তা হলো মানুষ যেন নিজের মত প্রকাশ করতে পারে ও অন্যের কথা শুনতে শেখে।
অনেক সংঘাত শুরু হওয়ার আগেই থামানো সম্ভব যদি মানুষ একে অপরের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পায়। এই ভাবনা থেকেই পরবর্তীতে জন্ম নেয় সিপিজে’র একটি প্রশংসিত উদ্যোগ, ‘পিস ক্যাফে’।
নামে ‘ক্যাফে’ থাকলেও এটি সাধারণ কোনো ক্যাফে নয়। বরং এটি এমন এক উন্মুক্ত পরিসর, যেখানে মানুষ নিজের কথা বলতে পারে, অন্যের গল্প শুনতে পারে এবং উপলব্ধি করতে পারে।
শুরুর দিকে পিস ক্যাফে শুধু কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের জন্য এক ধরনের নির্ভরতার জায়গা ছিল। সমাজের নানা বৈষম্য, চাপ ও টানাপোড়েন নিয়ে তারা সেখানে মন খুলে কথা বলতেন। নিজেদের জীবনসংগ্রামের গল্প একেঅপরের সাথে ভাগ করতেন। এভাবেই কেউ কেউ অন্যের অভিজ্ঞতায় নিজের জীবনের ছায়া খুঁজে পেতেন। সেখানেই গড়ে উঠতো পারস্পরিক আস্থার এক অদৃশ্য সেতু।
পিস ক্যাফের প্রশিক্ষণ কাজে লাগিয়ে অনেক নারী সদস্য পরে নিজ নিজ এলাকায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কেউ হয়েছেন সামাজিক উদ্যোগের নেতা, কেউ শুনেছেন নিজের সম্প্রদায়ের মানুষের কথা, কেউ আবার সমস্যার সমাধানে এগিয়ে এসেছেন, আর কেউ অন্যদেরও সামনে এগিয়ে আসার সাহস জুগিয়েছেন।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই আয়োজনে তরুণরাও যুক্ত হয়েছেন। এতে সহাবস্থান, অধিকার ও আত্মপরিচয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে তরুণ তরুণীদের নেতৃত্বে সমাজের নানা স্তরের মানুষের সঙ্গে মুক্ত আলোচনার এক নতুন পরিসর তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবও ধীরে ধীরে সমাজের নানা কোণে নদীর স্রোতের মতো ছড়িয়ে পড়ছে।
বৃহৎ পরিসরে আইন ছাড়া জনজীবন পরিচালনা কড়া প্রায় অসম্ভব। তবে একজন মানুষের ভেতরে অন্য একজনকে আপন করে নেওয়ার যে শক্তি, তা কোনো আইন দিয়ে তৈরি করা যায় না। সেই শক্তির জন্ম হয় কথা বলার মধ্য দিয়ে। একে অপরের অনুভূতি শোনার মধ্য দিয়ে।
নিজের চেয়ে আলাদা একজন মানুষকে তার প্রাপ্য সম্মান দেওয়ার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে সম্প্রীতির বীজ। আর সবচেয়ে বড় কথা, নিজের অবস্থান থেকে এক কদম এগিয়ে অন্যের জন্য হৃদয়ে একটু জায়গা করে দেওয়ার সাহস থেকেই জন্ম নেয় সত্যিকারের মানবিকতা।
সিপিজে’র চলমান এই ভাবনাকেই আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে দিতে বর্তমানে চলছে ‘পিস এন্ড হারমোনি এনহান্সমেন্ট থ্রু লারনিং এন্ড এসেসমেন্ট (পহেলা-PAHELA)’ প্রকল্প। প্রকল্পের মূল দর্শনই হলো - শান্তি গড়ে ওঠে প্রাণবন্ত সংলাপ, যৌথ অভিজ্ঞতা এবং তৃণমূলের মানুষের আন্তরিক অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে।
মাঠপর্যায়ের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আর মানুষের ভালোবাসাকে ভিত্তি করে ‘পহেলা’ প্রকল্প সিপিজে’র পিস ক্যাফের চেতনাকে আরও বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে দিচ্ছে। এর মাধ্যমে চট্টগ্রাম বিভাগের ১১টি জেলা থেকে ১২০ জন স্বপ্নবাজ তরুণ-তরুণীকে প্রশিক্ষিত করা হচ্ছে, যারা নিজ নিজ এলাকায় তথা জেলায় শান্তি এবং সম্প্রীতির দূত হিসেবে কাজ করবেন, এবং গড়ে তুলবেন নতুন নতুন ‘পিস ক্যাফে’।
‘নাগরিকতা: সিভিক এনগেজমেন্ট ফান্ড’ কর্মসূচির সহায়তায় পরিচালিত এই উদ্যোগে সিপিজে, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে স্থানীয় সহযোগী হিসেবে রয়েছে চট্টগ্রামের যুব সংগঠন ‘সার্জ বাংলাদেশ’। তরুণদের সঙ্গে নিয়ে তারা স্থানীয় বাস্তবতা গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করছে, যাতে তৃণমূলের মানুষের অংশগ্রহণে টেকসই শান্তির একটি মজবুত ভিত্তি গড়ে তোলা যায়।
অল্প সময়েই এই আয়োজন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে বেড়ে ওঠা তরুণদের এক মোহনায় এনে সম্মিলিত করেছে। এখানে তারা শিখছে বহুত্ববাদ, মানবাধিকার, নেতৃত্ব, আর সংকটের মুখেও মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে পথচলার কৌশল। বইয়ের শিক্ষার পাশাপাশি সমাজের মানুষের কথা শোনা, দলগত আলোচনা সঞ্চালনা এবং গবেষণার মতো বাস্তবমুখী বিষয়েও তারা হাতে-কলমে শিখছে।
কাগুজে নিয়মকানুন দিয়ে মানুষের মনের দেয়াল ভাঙা প্রায় অসম্ভব। এই দেয়াল ভাঙে আন্তরিক সংলাপ আর বৃহৎ কল্যাণের স্বার্থে বিপরীত মেরুর মানুষের হাত শ্রদ্ধার সাথে ধরার সাহসে। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সিপিজে, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় মানুষে মানুষে সেতুবন্ধনের কাজ করছে।
কারণ, আজকের পরিবর্তনশীল বাংলাদেশের বাস্তবতায় বিভেদ ভুলে একই উঠোনে, টেবিলে বা বেঞ্চিতে আলোচনার জন্য পাশাপাশি বসার প্রয়াস আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জরুরি।
ফয়সাল আল ইসলাম, জুনিয়র রিসার্চ এসোসিয়েট, সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড জাস্টিস (সিপিজে), ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়



