Wednesday, May 22, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

বিচারহীনতার সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের ১০ বছর

রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিদের অনেক আশ্বাসের পরও এ খুনের বিচার হয়নি গত ১০ বছরে। শুধু সাংবাদিক সমাজ নয়, দেশের নাগরিকরাও উদ্বিগ্ন এ বিচারহীনতা নিয়ে

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০২২, ০৫:৫৭ পিএম

১১ ফেব্রুয়ারি সেই রক্তাত ক্ষণ। ২০১২ সালের এ দিন রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি নৃশংসভাবে খুন হন। ফ্ল্যাটে তাদের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ পাওয়া যায়।

সাগর সরওয়ার মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক ছিলেন। তার স্ত্রী মেহেরুন রুনি ছিলেন এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক। হত্যাকাণ্ডের সময় বাসায় ছিল তাদের সাড়ে চার বছরের ছেলে মাহির সরওয়ার মেঘ।

রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিদের অনেক আশ্বাসের পরও এ খুনের বিচার হয়নি গত ১০ বছরে। শুধু সাংবাদিক সমাজ নয়, দেশের নাগরিকরাও উদ্বিগ্ন এ বিচারহীনতা নিয়ে। অনেক মনে করেন, এই বিচারহীনতা দেশকে সাংবাদিকতা প্রতিকূল একটি ভূখণ্ড হিসেবে উপস্থাপন করে।

এ বছরের গত ২৪ জানুয়ারি সোমবার সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দিন ধার্য ছিল। কিন্তু র‍্যাবের পক্ষ থেকে সেদিনও আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়নি। আদালত আগামী ২৩ ফেব্রুয়ারি এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য নতুন তারিখ ধার্য করেছেন। এ মামলার বেলায় এটি নতুন কোনো ঘটনা নয়।

আদালতের নথিপত্রের তথ্য বলছে, এ নিয়ে এই আলোচিত মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার জন্য আদালত ৮৫ বার সময় দিয়েছেন।

মামলার ধাপ এগিয়েছে এভাবে। প্রথমে সাগর-রুনি হত্যার ঘটনায় রুনির ভাই নওশের আলম বাদী হয়ে রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। প্রথমে এ মামলা তদন্তের ভার পড়ে শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশের। চার দিন পর এই হত্যা মামলার তদন্তভার ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) কাছে হস্তান্তরিত হয়। তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার ৬২ দিনের মাথায় ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল হাইকোর্টে ব্যর্থতা স্বীকার করে ডিবি। এরপর আদালত র‍্যাবকে মামলা তদন্তের নির্দেশ দেন। তখন থেকে মামলাটির তদন্ত করছে র‍্যাব। এর মধ্যে ৭ বার বদল হয়েছে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা।

এ হত্যাকাণ্ডের পর পরই তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হত্যাকারীদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের কথা বলেছিলেন। সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক হাসান মাহমুদ খন্দকার তখন বলেছিলেন, “তদন্তে প্রণিধানযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।” ডিবির পক্ষ থেকে বলা হয়- “মোটিভ” নিশ্চিত হওয়া গেছে। তদন্ত-সংশ্নিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ আরও অনেকেই দ্রুত রহস্য উদঘাটনের আশ্বাস দেন। শুধু কথার কথা হয়েই থেকেছে এর সব কিছু।

সংবাদমাধ্যমে পাওয়া তদন্ত সূত্র থেকে জানা যায়, ২০১২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি মামলাটির তদন্তের জন্য প্রথম ডিবি উত্তরের পুলিশ পরিদর্শক মো. রবিউল আলম তদন্তভার নেন। এরপরে ২০১৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর, ২০১৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি, একই বছরের ৭ জুন, ২০১৬ সালের ২ অক্টোবর, ২০১৭ বছরের ২১ মার্চ তদন্ত অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। সর্বশেষ এ বছরের গত ২৪ জানুয়ারি সোমবার সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য ছিল। কিন্তু র‌্যাবের পক্ষ থেকে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়নি। আদালত আগামী ২৩ ফেব্রুয়ারি এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য নতুন তারিখ ধার্য করেছেন। ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালত এই তারিখ নির্ধারণ করেন। আদালতের নথিপত্রের তথ্য বলছে, এ নিয়ে এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য আদালত ৮৫ বারের মতো সময় দিলেন। তদন্ত অগ্রগতি সংক্রান্ত সব প্রতিবেদনে প্রায় একই ধরনের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্ত সূত্রে জানা যায়, মামলার আট আসামির দুই জন বাড়ির দারোয়ান পলাশ রুদ্র পাল ও কথিত বন্ধু তানভীর রহমান জামিনে আছেন। অপর ছয় আসামি মিন্টু ওরফে বারগিরা মিন্টু, বকুল মিয়া, কামরুল হাসান অরুন, রফিকুল ইসলাম, এনাম আহমেদ ও আবু সাঈদ কারাগারে আটক। এ মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার আটজনের কেউই এখন পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেনি। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে সাগর-রুনির ভাড়া বাসার নিরাপত্তা প্রহরী এনামুল হক ও পলাশ রুদ্র পাল ১৬১ ধারায় জবানবন্দি দেন।
 

সংবাদমাধ্যম সূত্রে আরও জানা যায়, এ মামলার তদন্তের নানা পর্যায়ের দুইশ ব্যক্তির সাক্ষ্য নেয়া হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরি, বঁটি, ছুরির বাট, সাগর-রুনির পরনের কাপড়, সাগরের হাত-পা যে কাপড় দিয়ে বাঁধা হয়েছিল সেই কাপড় ও রুনির পরনের টি-শার্ট পাঠানো হয় যুক্তরাষ্ট্রের ল্যাবরেটরিতে। এছাড়া সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ডিএনএ নমুনাও সেখানে পাঠানো হয়। এরই মধ্যে আলামতের রাসায়নিক ও ডিএনএ নমুনা পরীক্ষার প্রতিবেদন বাংলাদেশে এলেও সন্দেহাতীতভাবে আসামি শনাক্তে তা কাজে আসেনি।

শুরু থেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এই হত্যার পেছনে নানা সন্দেহের বিষয়ে ইঙ্গিত দেয়। কেউ কেউ এও বলছিলেন, চুরি করতে গিয়ে বাধা পেয়ে হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়েছিল। আলামত উদ্ধার করতে না পারায় বিষয়টি নিয়ে আর এগোয়নি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে অনেকেই বিশ্বাস করেন না, এটি নিছক চুরির ঘটনা।

সাংবাদিকতার শীর্ষ পর্যায়ে বিচরণকারী এই এ দম্পতির মৃত্যু রহস্য উদঘাটন অত্যন্ত জরুরি। তাদের হত্যার বিচার না হলে দেশের সাধারণ মানুষের জন্য বিচার ব্যবস্থা কী করছে এ প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। দ্বিধাবিভক্ত সাংবাদিক সংগঠনগুলো শুরু থেকে একত্রিতভাবে এ হত্যার বিচার চেয়েছে। কিন্তু কোনো কিছুতেই কিছু আসে যায়নি। প্রশ্ন হতে পারে, এমন কোন ক্ষমতাবান বা ক্ষমতাগোষ্ঠী এতে জড়িত যে তাদের নাম, পরিচয় পর্যন্ত উল্লেখ করা যায় না? বাংলাদেশে কি আইনের শাসন আছে? না কি এটি একটি মাফিয়া রাজত্ব? সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের বিচার হওয়ার সঙ্গে এ প্রশ্নের উত্তর সম্পৃক্ত।


লেখক ও ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হাসান শাওনের জন্ম, বেড়ে ওঠা রাজধানীর মিরপুরে। পড়াশোনা করেছেন মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি বাঙলা কলেজ, বাংলাদেশ সিনেমা ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে। ২০০৫ সাল থেকে তিনি লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। কাজ করেছেন সমকাল, বণিক বার্তা, ক্যানভাস ম্যাগাজিন ও আজকের পত্রিকায়।

২০২০ সালের ১৩ নভেম্বর হাসান শাওনের প্রথম বই “হুমায়ূনকে নিয়ে” প্রকাশিত হয়।


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রকাশিত লেখার জন্য ঢাকা ট্রিবিউন কোনো ধরনের দায় নেবে না।


About

Popular Links