Thursday, June 04, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

স্বপ্নের পাখি যে সৈয়দ আবুল মকসুদ

খুব ব্যাপকভাবে কেউ মনে করলেন না মকসুদ ভাইকে। কত সহজেই না আমরা ভুলে যাই কীর্তিমানদের

আপডেট : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০৩:১৬ পিএম

গতকাল ২৩ ফেব্রুয়ারি এক বছর পূর্ণ হয়েছে সাংবাদিক, লেখক, চিন্তাবিদ ও অ্যাক্টিভিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদের চলে যাওয়ার। হারানোর এই এক বছর অতিক্রম করার দিনে খুব ব্যাপকভাবে কেউ মনে করলেন না মকসুদ ভাইকে। কত সহজেই না আমরা ভুলে যাই কীর্তিমানদের!  

পত্রিকায় কন্ট্রিবিউটিং দিয়ে যাদের শুরু, তারা বিষয়টা বুঝবেন। কত সম্পূর্ণতা আর অপূর্ণতায় সজ্জিত এ পেশা। লেখা, ছবি আর ফুটেজ দিয়ে দিলেই কাজ শেষ হয় না। পাতার লেখকের লেখা আনা, লেখক সম্মানী দিতেও ছুটতে হয় কন্ট্রিবিউটরকে। এতে ক্ষতির চেয়ে লাভ বেশি। দেখা যায় নতুন মানুষ, প্রাজ্ঞ পুরুষ, তাদের ঘরোয়া জীবন, চায়ের সঙ্গে ক্লাস লেকচার শিটের চেয়ে জরুরি গল্পরাশি।

মকসুদ ভাইয়ের ধানমন্ডির বাসায় যতদিন গেছি, তিনি চা না খাইয়ে ফেরাননি একদিনও। শুধু ফটোশুট আর টিভি স্টুডিওতে নয়, সফেদ সেলাইহীন পোশাকে তাকে দেখেছি ঘরের কোণেও। প্রতিবারই কলবেলে দরজা খুলেছে অন্য কেউ। ড্রয়িংরুম লাগোয়া ডায়েনিং স্পেসের টেবিলে তিনি লিখছেন। লিখছেন আর লিখছেন। আমৃত্যু যা ছিল তার নেশা, পেশা আর প্রতিরোধের হিরন্ময় হাতিয়ার। এ লেখা ছিল জনতার কাতারে দাঁড়ানো এক বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মীর সাদা পাতায় অক্ষর বোনা।

একটু পর ড্রয়িংরুমে এসে বলতেন, ‘‘বসো।’’ এরপর চায়ের ইন্তেজাম।

বেশি শুনেছি মকসুদ ভাইয়ের কাছ থেকে। যদিও তিনি উন্মুখ থাকতেন তরুণ ভাবনা জানায়। একবার শুধু ‘‘রেজিম’’ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলাম। উনি তিন বাক্যে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘‘দেশ শেষ। আমাদের বন্ধুরাই এ কাজ করেছে। এখন তোমরাই ভরসা।’’

দেশের তারুণ্যের ওপর ভরসা রাখা এ মানুষটি শুধু তার কলামনিস্ট আর লেখকস্বত্ত্বা হয়ে বাঁচেননি। কোন অ্যাক্টিভিস্ট ভুলবে সড়কে নিরাপত্তার দাবিতে ঈদের দিনে তার অনশন? সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের পক্ষে শুধু লিখলেই কাজ শেষ হয় না। মকসুদ ভাইয়ের ধানমন্ডির ফ্ল্যাটটি তো সুশীতলই ছিল। তবু তিনি রোদে, ঘামে ভিজে রাজপথে দাঁড়িয়েছেন দিনের পর দিন বিভিন্ন দাবিতে। যে ধারাটি অনন্য। যে কারণে বুদ্ধিজীবী ও বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মীর ফারাক করা।

ক্যারিয়ারে পদোন্নতিতে মকসুদ ভাইয়ের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ কমে যায়। কিন্তু ফোনে কথা হয়েছে বহুবার। ২২শে শ্রাবণ কথা বলেছি রবীন্দ্রনাথ নিয়ে। ১৭ নভেম্বর মন্তব্য নিয়েছি মওলানা ভাসানীকে নিয়ে। ২৬ মার্চ বা ১৬ ডিসেম্বর মতামত নিয়েছি তার ‘‘অরণ্য বেতার: স্বাধীন বাংলা বেতার কর্মীদের প্রথম জবানবন্দি’’ নিয়ে। অল্প হলেও বাদ যায়নি মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী সম্পর্কিত কিছু। জেনেছি সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ভাবনাও। ঢাকার বুদ্ধদেব বসু পড়ে ভালোবাসার এই শহরকে চিনেছি অন্যভাবে। তার প্রজ্ঞাময় সমুদ্র থেকে এ হয়ত কয়েক ফোঁটা তোলা।

আমরা স্বার্থপর সংবাদকর্মী। শুধু ভেবেছি নিজেদের স্টোরি বা কন্টেন্ট নিয়ে। লেখার ঘোরে থাকা মানুষটিকে মুঠোফোন কতটা বিরক্ত করত তা ভাবিনি কোনোদিন।

গতকাল সন্ধ্যা নাগাদ এক বছর হয়ে গেল আজিমপুরে সমাহিত হওয়া আমাদের দেখা কিংবদন্তি সৈয়দ আবুল মকসুদ ভাইয়ের প্রয়াণের। ‘‘সংবাদমাধ্যম’’কে ‘‘গণমাধ্যম’’ বানাতে হলে যে রাষ্ট্র, সংবিধান, সমাজ বিনির্মাণ করতে হয় এ প্রকল্পই ঘুরত তার করোটিতে।

আমরা যেন শেষ শুভ্রতা হারিয়েছি। এই ফটকাবাজের দেশে এমন স্বপ্নের পাখি হারানোর শোক ব্যক্তি ছাপিয়ে তাই সামষ্টিক।


লেখক, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা হাসান শাওনের জন্ম, বেড়ে ওঠা রাজধানীর মিরপুরে। পড়াশোনা করেছেন মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি বাঙলা কলেজ, বাংলাদেশ সিনেমা ও টেলিভিশন ইনিস্টিটিউটে। ২০০৫ সাল থেকে তিনি লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। কাজ করেছেন সমকাল, বণিক বার্তা, ক্যানভাস ম্যাগাজিন ও আজকের পত্রিকায়।

২০২০ সালের ১৩ নভেম্বর হাসান শাওনের প্রথম বই “হুমায়ূনকে নিয়ে” প্রকাশিত হয়।


প্রকাশিত মতামত লেখকের ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন এর জন্য কোনো ধরনের দায় নেবে না।



   

About

Popular Links

x