Thursday, June 04, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

সারাবিশ্বে উন্মুক্ত অভিবাসন নীতি কেন নয়?

ঢাকা ট্রিবিউনের জন্য ড. বিওন লম্বোগের লেখা এই বিশেষ নিবন্ধে অভিবাসনের ফলে অভিবাসী ও গ্রহণকারী রাষ্ট্রের সুবিধা তুলে ধরা হয়েছে

আপডেট : ০৯ জুন ২০২৩, ১০:২৮ এএম

বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈশ্বিক বৈষম্য দূরকরণের জন্য উন্মুক্ত অভিবাসন নীতি চালু করা অত্যন্ত জরুরি। দরিদ্র দেশগুলোতে একজন স্বাস্থ্যকর্মী বছরে ১,৯০০ মার্কিন ডলার বেতন পান, বিপরীতে ধনী দেশেগুলোতে একই পেশার বার্ষিক আয় ৩২,০০০ ডলার। ভারতে কাজ করা একজন ম্যাকডোনাল্ডস কর্মীর চেয়ে একই পদে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করা কর্মীর আয় ১৬ গুণ বেশি। অর্থনীতির তত্ত্ব বলছে, বিশ্বের দরিদ্র দেশের মানুষেরা উন্নত দেশগুলোতে যাওয়ার সুযোগ পেলে তাদের উৎপাদনশীলতা বাড়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিও বাড়বে।

গবেষণা বলছে, বিশ্বে উন্মুক্ত অভিবাসন নীতি চালু হলে বৈশ্বিক জিডিপি ৫০-১৫০% বাড়তে পারে। এর ফলে দরিদ্র দেশগুলোর দুই বিলিয়নেরও বেশি কর্মী ধনী বিশ্বে স্থানান্তরিত হবে। তবে, ধনী বিশ্বের মূলধারার কোনো রাজনীতিবিদ নিজ দেশে অভিবাসীদের অবাধ চলাফেরার ডাক দেননি। কিন্তু পরিকল্পিত অভিবাসন নীতি বৈষম্য হ্রাস করে, যা ধনী এবং দরিদ্র উভয়পক্ষের জন্য ইতিবাচক।

বৈশ্বিক পরিস্থিতির বিবেচনায় কোন খাতে খরচ সবচেয়ে ফলপ্রসূ তা নির্ধারণ করতে বিগত বছরগুলোতে আমাদের কোপেনহেগেন কনসেনসাসের বিশেষজ্ঞরা বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতিবিদ ও নোবেল বিজয়ীদের সঙ্গে কাজ করছেন। 

বিশ্বনেতারা ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এই বছর আমরা এসডিজির অর্ধেক সময় পার করছি, তবে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অর্ধেকের থেকে অনেক বেশি পিছিয়ে। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে আরও ৫০ বছর লেগে যাবে। সেই জায়গা থেকে কিছুটা কার্যকর সমাধান পেতে আমাদের এই প্রচেষ্টা।

এখন নির্দিষ্ট বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া শুরু করতে হবে। যেহেতু আমরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, কিন্তু সবটা নির্দিষ্ট সময়ে বাস্তবায়ন করা সম্ভব না; তাই এখন আমাদের সবচেয়ে কার্যকর নীতিতে কাজ করতে হবে। কোপেনহেগেন কনসেনসাসের গবেষণায় এমন বারোটি বিষয় চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে মাঝারি মানের খরচের বিপরীতে বিশাল সুবিধা পাওয়া যেতে পারে। স্মার্ট মাইগ্রেশন সেরকমই একটি নীতি, যা বৈষম্য কমাতে অনন্য।

যেসব দেশে অধিক দক্ষ শ্রমের প্রয়োজন সেসব দেশে অভিবাসনের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব। একই সঙ্গে এর ফলে কমবে বৈষম্য। প্রচলিত অভিবাসন নীতির চেয়ে পরিকল্পিত অভিবাসন বেশি ফলপ্রসু, তাই গবেষণায় বিশ্বনেতাদের প্রতি এই নীতি বাস্তবায়নের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

আমাদের নতুন এই গবেষণায় অভিবাসনের ক্ষেত্রে চিকিৎসা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল এবং গণিত বিষয়ক পেশায় অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ৩ কোটি ৭০ লাখ দক্ষ অভিবাসী রয়েছে। যার মধ্যে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল এবং গণিত বিষয়ক পেশায় ৯০ লাখ এবং চিকিসংক প্রায় ১০ লাখ। বাস্তবতা হলো, সারাবিশ্বে মাত্র ১ কোটি ৩০ লাখ চিকিৎসক রয়েছেন, বাংলাদেশ চিকিৎসকের সংখ্যা প্রায় এক লাখ ১২ হাজার।

বিষয়টি কেমন হবে, যদি প্রতিটি সরকার তাদের রাষ্ট্রে ইতোমধ্যে বিদ্যমান দেশ থেকে আরও ১০% বেশি দক্ষ অভিবাসী গ্রহণ করে?

এর ফলে অভিবাসীরা নিজেরাই স্পষ্টতই উপকৃত হবে। উদাহরণস্বরূপ, একজন চিকিৎসক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ক্যারিবিয়ান বা মধ্য আমেরিকায় গেলে তার মজুরিতে নাটকীয় বৃদ্ধি পাবেন, যা প্রায় ১.৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ দক্ষ অভিবাসী গ্রহণকারী দেশগুলোও চিকিৎসক, নার্সসহ সংশ্লিষ্ট শূণ্যপদে কর্মী নিয়োগের মাধ্যমে উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখতে পারবে। এর মাধ্যমে গ্রহণকারী দেশের উন্নত প্রযুক্তির সঙ্গে কাজ করে অভিবাসীরা আরও দক্ষ হয়ে উঠবে, এর ফলে ওইসব দেশে ব্যয়বহুল শিক্ষার জন্য খরচ না করেও অভিবাসী প্রেরণকারী দেশটি একজন দক্ষ কর্মী পেতে পারে।

অভিবাসী গ্রহণকারী দেশগুলো খরচের তুলনায় সুবিধা বেশি পাবে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমরা অভিবাসনের মাধ্যমে “মেধা পাচার” এর দিকে জোর বেশি দিই, যা যেকোনো দেশকে একজন দক্ষ চিকিৎসক তৈরির জন্য অর্থ খরচে বাধ্য করে, অন্যদিকে অবশিষ্ট চিকিৎসকদের উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেয়।

কিন্তু আমাদের নতুন গবেষণায় দেখানো হয়েছে, দক্ষ অভিবাসীরা বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং উত্পাদনের নতুন দ্বার উন্মোচনের মাধ্যমে নিজ দেশের আয় বাড়িয়ে তুলতে পারে। অভিবাসীরা নিজ দেশে নিয়মিত রেমিট্যান্স পাঠাবে, যার মাধ্যমে তারা দেশে শিক্ষা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মতো ক্ষেত্রে ইতিবাচক অবদান রাখবে। এর মাধ্যমে প্রাপ্ত সুবিধা ওই অভিবাসীর পেছনে তার নিজ দেশের বিনিয়োগের তুলনায় ঢের বেশি।

সারাবিশ্বের ক্ষেত্রেই এই বাস্তবতা একই। এর মাধ্যমে পরবর্তী ২৫ বছরে ৫৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিপরীতে প্রবৃদ্ধি হবে প্রায় এক ট্রিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, এই খাতে খরচ করা প্রতি ডলারের বিপরীতে ১৮ ডলারের সামাজিক সুবিধা আসবে, যার বেশিরভাগই বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোতে প্রবাহিত হবে।

গবেষণায় দেখা গেছে, বৈশ্বিক পর্যায়ে দক্ষ অভিবাসন বৃদ্ধি বৈষম্য মোকাবিলার পাশাপাশি বৈশ্বিক উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। যখন আমরা এসডিজির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হচ্ছি তখন আমাদের সবচেয়ে স্মার্ট নীতি বেছে নেওয়া জরুরি। অবাধ দক্ষ অভিবাসন এই ধরনের একটি কার্যকর নীতি হতে পারে।


ড. বিওন লম্বোগ কোপেনহেগেন কনসেনসাসের প্রেসিডেন্ট এবং স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির হুভার ইনস্টিটিউশনের ভিজিটিং ফেলো।


এই নিবন্ধ ঢাকা ট্রিবিউনের জন্য জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. বিওন লম্বোগের লেখা বিশেষ সিরিজের পঞ্চম অংশ। সিরিজের আগের লেখাগুলো পড়ুন যথাক্রমে-

- বিশ্বের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য প্রয়োজন দ্বিতীয় সবুজ বিপ্লব

-  এসডিজি বাস্তবায়নে যে ভুলগুলো করেছে বিশ্ব

শিশু ও মাতৃমৃত্যু কমলে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়বে

-টিকাদানে আগ্রহী হওয়া উচিত যেসব কারণে

-দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ডিজিটাল সমাধান

-যক্ষ্মা নির্মূলের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে এখনও অনেক পথ বাকি

-এসডিজি অর্জনে অপুষ্টি মোকাবিলায় আর বেশি জোর দিতে হবে

-মুক্ত বাণিজ্যের ধারণা এখন অতীত?

-উন্নয়নের জন্য ভূমির মালিকানা নিশ্চিত করা জরুরি

-দীর্ঘস্থায়ী ম্যালেরিয়া মোকাবিলায় করণীয়

   

About

Popular Links

x