Tuesday, June 25, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

রেমিট্যান্স, অর্থপাচার ও হুন্ডির ব্যাখ্যা এবং তাৎপর্য বিশ্লেষণ

সম্প্রতি বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়ের জন্য গ্রাহকরা হুন্ডির ব্যবহার বাড়িয়ে দেওয়ায় হুন্ডি নেটওয়ার্কের সংখ্যাও বেড়েছে। ফলে হুন্ডি বাজার প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠছে এবং সব মিলিয়ে হুন্ডি পদ্ধতি আরও কার্যকর হয়ে উঠছে। আর গ্রাহকের এই হুন্ডি নির্ভরতা বেড়েছে মূলত বাংলাদেশ ব্যাংকের বিধি নিষেধের কারণে

আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০২২, ০৬:৪৮ পিএম

বাংলাদেশ থেকে অর্থপাচার  হওয়া নিয়ে প্রচুর লেখালেখি ও আলোচনা হয়। তবে আদতে যে প্রক্রিয়ায় অর্থপাচার হয় তা কখনও ভালো করে ব্যাখ্যা করা হয় না। রেমিট্যান্স প্রবাহ নিয়েও অনেক আলোচনা হয়। এছাড়া আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেওয়া ব্যালেন্স অফ পেমেন্ট, যার ওপর সরকারের আর্থিক নীতিমালা অনেকাংশে নির্ভরশীল সেটি নিয়েও আলোচনা হয়। তবে এই সব বিষয় নিয়েই সাধারণত ভুলভাবে আলোচনা করা হয় এবং অর্থনীতির চিত্রকেও ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়।

এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য হলো রেমিট্যান্স ও অর্থপাচারের আসল প্রক্রিয়াটা তুলে ধরা এবং এটা কিভাবে কাজ করে তা বোঝানো। এই আলোচনায় আমরা ব্যালেন্স অফ পেমেন্টেরও একটি ভিন্ন চিত্র দেখতে পাবো।

হুন্ডি ব্যবসা

হুন্ডি ব্যবসা কীভাবে কাজ করে, সে বিষয়ে অনেকেরই স্পষ্ট ধারণা নেই। একটি উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি বোঝা যাক। ধরুন, আসলাম সাহেব একজন ধনী ব্যবসায়ী। তিনি ভাবছেন কোনো একটি উন্নত দেশে গিয়ে একটু আয়েশ করে জীবনযাপন করবেন। তিনি অস্ট্রেলিয়াকে বেছে নিলেন। সেখানে তিনি এক লাখ মার্কিন ডলার মূল্যের একটি বাড়ি কিনতে চান। বিষয়টি তিনি একটি হুন্ডি নেটওয়ার্কের দালালকে জানালেন। দালাল তাকে ৯০ লাখ (১ ডলার = ৮৫ টাকা ধরে নেওয়া যাক) টাকা দিতে বললেন, যার মধ্যে হুন্ডি নেটওয়ার্কের ফিও অন্তর্ভুক্ত। দালালকে ৯০ লাখ টাকা দেওয়ার কিছুদিন পর আসলাম সাহেব দেখলেন যে তার সিঙ্গাপুরের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ১ লাখ মার্কিন ডলার জমা হয়ে গেছে। এবার সেটা তিনি নির্বিঘ্নে সিঙ্গাপুর থেকে অস্ট্রেলিয়ায় পাঠিয়ে দিলেন।

এই টাকা তাহলে কোথা থেকে এসেছে? হুন্ডি নেটওয়ার্কের দালালরা আসলে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাংলাদেশিদের কাছ থেকে ডলার কিনে নেয় অপেক্ষাকৃত কম মূল্যে (ধরুন, ১ ডলার = ৮২ টাকা)।

এবার চলুন আরেকটি দৃশ্যে যাওয়া যাক। কুমিল্লার প্রত্যন্ত গ্রামের বাসিন্দা তায়েব আলী দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে কর্মরত। তার অনেকদিনের স্বপ্ন মফস্বলে একটি পাকা বাড়ি করার। সেই লক্ষ্যে তিনি উদয়াস্ত খেটে কিছু টাকা জমিয়েছেন। এই টাকা তিনি বাড়িতে পাঠালে তার স্ত্রী সাবেরা বাড়ি তৈরি করার কাজ শুরু করতে পারবেন। এখন টাকাটা সাবেরার কাছে পাঠানোর দুটি উপায় রয়েছে। প্রথম উপায় হলো, তিনি টাকাটা সৌদি আরবের কোনো ব্যাংকে জমা দিবেন। ওই ব্যাংক তার অর্জিত সৌদি রিয়ালকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা মার্কিন ডলারে রূপান্তরিত করে বাংলাদেশের যে ব্যাংকে সাবেরার অ্যাকাউন্ট রয়েছে, সেখানে পাঠিয়ে দিবে। বাংলাদেশের এই ব্যাংক নিজেদের ফি রেখে ডলারপ্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নির্ধারিত টাকা হিসেব করে সাবেরাকে দিয়ে দিবে। তবে এই ব্যাংক থেকে টাকা পেতে হলে সাবেরাকে ব্যাংকের নিকটস্থ শাখায় গিয়ে নির্দিষ্ট নিয়ম কানুন মেনে টাকাটা তুলতে হবে, যা ক্ষেত্র বিশেষে কিছুটা জটিলও বটে।

সাবেরার কাছে টাকা পাঠানোর দ্বিতীয় উপায় হলো হুন্ডি। তায়েব আলী হুন্ডি নেটওয়ার্কের সৌদি প্রতিনিধিকে টাকা দিলে, হুন্ডি নেটওয়ার্ক তায়েব আলীর দেওয়া অর্থ আসলাম সাহেবের অ্যাকাউন্টে জমা করে দিলেন। এদিকে হুন্ডি নেটওয়ার্কের বাংলাদেশ প্রতিনিধি আসলাম সাহেবের কাছ থেকে নেওয়া টাকা সাবেরাসহ আরও কয়েকজন প্রবাসীর পরিবারকে দিয়ে দিলেন।

এখানে লক্ষণীয় যে, হুন্ডি থেকে টাকা পাওয়ার জন্য সাবেরাকে কোথাও যেতে হচ্ছে না। হুন্ডি নেটওয়ার্কের প্রতিনিধিই তার বাড়িতে এসে টাকা দিয়ে যাচ্ছে। সেইসঙ্গে, তাকে কোনো কাগজপত্রের ঝামেলার মধ্য দিয়েও যেতে হচ্ছে না। আরেকটি বিষয় এখানে স্পষ্ট যে, স্বাভাবিকভাবে ব্যাংকের তুলনায় হুন্ডি নেটওয়ার্ক বেশি এক্সচেঞ্জ রেট বা বিনিময় হার দিয়ে থাকে। অর্থাৎ ব্যাংক যদি ডলারপ্রতি সাবেরাকে ৮৫ টাকা দেয়, তাহলে হুন্ডি হয়তো দিবে ৮৬ টাকা কিংবা আরেকটু বেশি। এই অতিরিক্ত টাকা দিয়েই প্রধানত হুন্ডি নেটওয়ার্কগুলো তাদের গ্রাহকদের আকৃষ্ট করে।

অবশ্য প্রবাসীদেরকে হুন্ডি ব্যবহার থেকে বিরত রাখতে সরকারও বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজ চালু করেছে। যেমন ব্যাংকের মতো বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠালে বাংলাদেশ ব্যাংক ডলারপ্রতি নির্ধারিত টাকার সঙ্গে অতিরিক্ত ২.৫% বোনাস দেয়। অর্থাৎ কোনো প্রবাসী ব্যাংকের মাধ্যমে ১ লক্ষ টাকা রেমিট্যান্স পাঠালে তার পরিবার ব্যাংক থেকে তুলতে পারবেন ১ লক্ষ আড়াই হাজার টাকা। কিন্তু হুন্ডি নেটওয়ার্ক এসব প্রণোদনার সঙ্গে খুব দ্রুতই সমন্বয় করে গ্রাহকের জন্যে আরও বেশি বিনিময় হারের ব্যবস্থা করে। এছাড়াও ব্যাংকে গিয়ে লাইন ধরে যাবতীয় কাগজপত্র পূরণ করে টাকা তুলতে হয়। বিপরীতে হুন্ডি প্রতিনিধি নিজেই গিয়ে গ্রাহকের হাতে টাকা পৌঁছে দেন। এ বিষয়টিও প্রবাসী ও তাদের পরিবারকে হুন্ডি ব্যবহারে উৎসাহিত করে।


হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অপেক্ষারত প্রবাসী বাংলাদেশি/ সৈয়দ জাকির হোসেন/ঢাকা ট্রিবিউন


মোদ্দাকথা, আসলাম সাহেব বাংলাদেশ ব্যাংকের বিধি নিষেধ থাকা সত্ত্বেও অস্ট্রেলিয়ায় তার কাঙ্ক্ষিত বাড়িটি কিনতে পারছেন এবং সাবেরাও কোনোরকম ঝামেলা ছাড়া তার স্বামীর পাঠানো টাকা হাতে পেয়ে যাচ্ছেন। যেহেতু আসলাম সাহেবের কাছ থেকে নেওয়া বাংলাদেশি মুদ্রা সাবেরাকে দেওয়া হয়েছে এবং তায়েব আলীর কাছ থেকে নেওয়া মার্কিন ডলার আসলাম সাহেবের অস্ট্রেলিয়ান অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়েছে, দেশ থেকে আসলে কোনো টাকাই বাইরে যাচ্ছে না। দেশের কোনো ব্যাংকে লেনদেনের কোনো রেকর্ড নেই। বিদেশের ব্যাংকগুলো হয়তো টাকার উৎস জানতে চাইতে পারে যদি সেটা অনেক হয়; কিন্তু তাও হয়তো করবে না যদি টাকার পরিমাণ তেমন না হয়।

এবার খানিকটা ভিন্ন প্রসঙ্গে আসা যাক। প্রায়ই দেখা যায়, অনেকে হুন্ডি নেটওয়ার্কের বিস্তারে বিকাশসহ বিভিন্ন মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস বা এমএফএস সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করে থাকেন। একটু চিন্তা করলেই বোঝার কথা যে হুন্ডি বাজারের সঙ্গে এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোর আসলে কোনো সম্পর্কই নেই। উপরের উদাহরণে দেখা যায়, আসলাম সাহেবের কিছু টাকা সাবেরার হাতে গেছে। এই অভ্যন্তরীণ লেনদেনে হুন্ডি প্রতিনিধি সশরীরে গিয়েও টাকাটা দিয়ে আসতে পারেন, কিংবা তিনি এমএফএস ব্যবহার করতে পারেন। অর্থাৎ এমএফএস-কে অভ্যন্তরীণ লেনদেনের একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে; যে কেউ সেটা করতেই পারে। কিন্তু তার জন্য এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোকে কোনোভাবেই হুন্ডি কারবারে জড়িত বলে দায়ী করা যুক্তিসম্মত নয়।

সম্প্রতি বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়ের জন্য গ্রাহকরা হুন্ডির ব্যবহার বাড়িয়ে দেওয়ায় হুন্ডি নেটওয়ার্কের সংখ্যাও বেড়েছে। ফলে হুন্ডি বাজার প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠছে এবং সব মিলিয়ে হুন্ডি পদ্ধতি আরও কার্যকর হয়ে উঠছে। আর গ্রাহকের এই হুন্ডি নির্ভরতা বেড়েছে মূলত বাংলাদেশ ব্যাংকের বিধি নিষেধের কারণে। একজন জাপানী নাগরিক আসলাম সাহেবের মতো অস্ট্রেলিয়ায় একটি বাড়ি কেনার জন্য ১ লাখ ডলার পাঠাতে চাইলে খুব সহজেই তা করতে পারেন। কিন্তু বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাধারণত এ ধরনের লেনদেনের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে। সম্প্রতি বিভিন্ন শিল্পের বিকাশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিদেশে টাকা পাঠাবার পাশাপাশি সম্পদ কেনার অনুমতি মিললেও মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা এখনো যথেষ্ট কঠোর।

হুন্ডি বাজারে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ

দেশে আসা রেমিট্যান্সের পরিমাণ নির্ভর করে প্রবাসীদের সংখ্যা, বিদেশে তাদের আয় এবং সর্বোপরি দেশে তাদের পাঠানো টাকার পরিমাণের উপর। রেমিট্যান্সের এই অর্থ আবার ব্যাংকিং ও হুন্ডি চ্যানেলে কীভাবে ভাগ হবে, তা নির্ভর করে হুন্ডির ক্রমবর্ধমান চাহিদার ওপর। পরিহাস হলো, হুন্ডিই এখানে প্রধান ভূমিকায় রয়েছে। হুন্ডি নেটওয়ার্কগুলোর ছেড়ে দেওয়া অংশটাই মূলত ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে আসে। হুন্ডি ব্যবস্থার বিস্তার রোধে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক সবসময় বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করলেও বাস্তবে সেগুলো কোনো কাজে আসছে না। হুন্ডি নেটওয়ার্কগুলো মুদ্রা বিনিময়ের হার নিজেরাই নির্ধারণ করে বিধায় এটি রেমিট্যান্স প্রবাহের পরিমাণ, সরকারের দেওয়া প্রণোদনা ও মুদ্রা বিনিময়ের চাহিদার সঙ্গে সবসময় সমন্বয় করতে পারে। মাঝে মাঝে হুন্ডি নেটওয়ার্কগুলোর লাভ খানিকটা কমে গেলেও খুব দ্রুতই তারা বিনিময় হার সমন্বয় করে নিজেদের লভ্যাংশ বাড়িয়ে নিতে সক্ষম হয়।

প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের কতোটা ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে আসে আর কতোটা হুন্ডি পদ্ধতির মাধ্যমে আসে তা দেখার জন্য পরিচালিত সমীক্ষা অনুযায়ী, গড়ে ৫৫% রেমিট্যান্সই আসছে হুন্ডির মাধ্যমে। ব্যাংকিং চ্যানেলে আসছে মাত্র ৪৫%। 

২০১৯-২০ অর্থবছরে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স এসেছিল ১,৬৫০ কোটি ডলার। উল্লিখিত % অনুযায়ী, ওই বছর হুন্ডির রেমিট্যান্স হবার কথা ২,৪০০ কোটি ডলার। ২০২১-২২ অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত হুন্ডিতে আসা রেমিট্যান্সের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২,০০০ কোটি ডলার। এই হিসেব থেকে আমরা ধারণা করতে পারি, হুন্ডিতে আসা বৈদেশিক মুদ্রার পরিমাণ সর্বনিম্ন ১,৭০০ কোটি থেকে সর্বোচ্চ ২,৩০০ কোটি ডলার।


বৈদেশিক বাণিজ্যের আড়ালে টাকা পাচার/ মাহমুদ হোসেন অপু/ঢাকা ট্রিবিউন


হুন্ডির চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে যে কারণে

হুন্ডির সবচেয়ে বড় চাহিদা আসে আমদানিকৃত পণ্যের দাম কমিয়ে দেখানো বা আন্ডার ইনভয়েসিং-এর জন্যে। দ্বিতীয় বৃহত্তম চাহিদা তৈরি হয় বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশী কর্মীদের কারণে, যারা তাদের বেতনের একটা বড় অংশ দেশে পাঠানোর জন্যে হুন্ডি ব্যবহার করেন। এরপরই রয়েছে ভারতীয় পণ্য, যার মূল্য অনেকাংশেই শোধ করা হয় হুন্ডির মাধ্যমে। এছাড়াও এদেশের বিপুল পরিমাণ মানুষ শিক্ষা, চিকিৎসা বা পর্যটনের জন্য ভারতে যান এবং সেখানে তাদের প্রয়োজনীয় অর্থ তারা দেশ থেকে নিয়ে যান হুন্ডির মাধ্যমেই। এসব কারণে দেশে হুন্ডি নেটওয়ার্কগুলো শুধু টিকেই থাকছে না, বরং দিন দিন তাদের চাহিদা বাড়ছে।

উপরের কারণগুলো খানিকটা ব্যাখ্যা করতে গেলে দেখা যায় যে, চীন ও ভারত থেকে বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে আন্ডার ইনভয়েসিং করা হচ্ছে। এমনকি জাপান থেকে গাড়িসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ আমদানির ক্ষেত্রেও তার দাম কম দেখানো হয়। আন্ডার ইনভয়েসিং করা হয় মূলত আমদানির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য উচ্চ শুল্ক ফাঁকি দিতে, যার মধ্যে সাধারণ আমদানি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক, ভ্যাট, অ্যাডভান্সড ইনকাম ট্যাক্স ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত। ভোগ্যপণ্য আমদানিতে এই শুল্কের হার ৪০%। এই বিরাট শুল্কের বোঝা এড়াতে আমদানিকারকরা পণ্যের দাম কমিয়ে দেখান। দেশের আমদানিকারকদের বড় একটি অংশ তাদের আমদানি করা পণ্যের মূল্যের কিছু অংশ পরিশোধ করেন লেটার অফ ক্রেডিট (এলসি) দিয়ে এবং বাকি অংশ ব্যাঙ্ক ট্রান্সফারের মাধ্যমে। এলসি হলো আমদানির মূল সরকারি দলিল, যা আমদানি করা পণ্যের মূল্য পরিশোধের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের অনুমোদন দেয়। অন্যদিকে, ব্যাংক ট্রান্সফার পরিচালিত হয় হুন্ডি নেটওয়ার্কগুলোর মাধ্যমে। ফলে এই লেনদেনের ব্যাপারে জানা বাংলাদেশ ব্যাংক ও কাস্টমসের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। অর্থাৎ ঋণপত্রের মাধ্যমে পরিশোধিত মূল্যই আমদানিকৃত পণ্যের প্রকৃত মূল্য হিসেবে দেখানো হয় এবং সেই অনুযায়ীই আমদানিকারকরা সরকারকে শুল্ক প্রদান করেন।

এই দুর্নীতি ঠেকাতে সরকার কাস্টমস প্রি-শিপমেন্ট ইন্সপেকশন (পিএসআই) সংস্থাগুলোকে নিয়োগ করেছিল। তাদের তদন্তে আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের ব্যাপক আলামত ধরা পড়ে। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই আলামত কখনোই সামষ্টিক অর্থনীতির সঠিক চিত্র পেতে ব্যবহার করা হয়নি। আনুষ্ঠানিকভাবে বলা হয়েছে এটা খুব একটা জরুরি নয়। অথচ পিএসআই তথ্য অনুযায়ী, চীন থেকে আমদানির প্রকৃত পরিমাণ রেকর্ডকৃত আমদানির চেয়ে ৫০%; এবং ভারতের ক্ষেত্রে ৩০% বেশি। শুধু ২০১৮-১৯ অর্থবছরেই এ দুই দেশ থেকে সরকারি রেকর্ডের বাইরে ৯০০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করা হয়েছে। আর সব মিলিয়ে মোট আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের পরিমাণ প্রায় ১,৩০০ কোটি ডলার। পিএসআই সংস্থাগুলো নিযুক্ত থাকাকালীন তাদের সংশোধন করা আমদানি মূল্য অনুযায়ীই কর ধার্য করতো এনবিআর। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে আমদানি মূল্য হিসেবে কোম্পানিগুলোর ঘোষণা করা মূল্যে পরিবর্তন আনা হয়নি কখনোই।

হুন্ডির দ্বিতীয় বৃহত্তম চাহিদা তৈরি হয় দেশে কর্মরত বিদেশী কর্মীদের নিজ নিজ দেশে অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে। এদের বেশিরভাগই টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক শিল্পে কাজ করেন। এই বিদেশী কর্মীদের বেতন তাদের দেশে নিয়ে গেলে তার প্রভাব বাংলাদেশের ব্যালেন্স অফ পেমেন্টে দেখতে পাওয়ার কথা। বাংলাদেশে কর্মরত ভারতীয় কর্মীদের রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রায় কোনো হিসেবই নেই। বিদেশী কর্মীদের নিজ নিজ দেশে পাঠানো মোট রেমিট্যান্সের পরিমাণ বেশ আলোচিত একটি বিষয়। প্রচলিত ধারণামতে, এর পরিমাণ বছরে প্রায় ৩০০ কোটি ডলার। তবে এটি সম্ভবত সর্বনিম্ন অংক।

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যের বিষয়টি অনুমান করা খুবই কঠিন। যদিও এ ধরনের বাণিজ্যের অস্তিত্ব ও প্রক্রিয়া সর্বজনবিদিত। ধারণা করা যায়, ভারত থেকে বাংলাদেশে বছরে গড়ে প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি হয়। বিভিন্ন সমীক্ষা অনুযায়ী আমদানি-রপ্তানির পরিমাণ ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি ডলার বলে অনুমান করা যায়।

বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর বহুসংখ্যক মানুষ শিক্ষা, চিকিৎসা ও পর্যটনের জন্য ভারতে যান। শুধু ২০১৯ সালেই প্রায় ২৬ লক্ষ বাংলাদেশি ভারতে গিয়েছিলেন। সেখানে তাদের প্রয়োজনীয় ভারতীয় রুপির বিশাল একটি অংশ তারা পেয়েছেন হুন্ডির মাধ্যমে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এই খাতে মোট ১৭০ কোটি ডলারের চাহিদা ছিল বলে আমাদের অনুমান।

সব মিলিয়ে ২০১৮-১৯ সালে দেশের হুন্ডি বাজারে মোট ২,১০০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ মুদ্রা বিনিময়ের চাহিদা চিহ্নিত করেছি। আমাদের ধারণা, এ চাহিদার পরিমাণ ১,৮০০ থেকে ২,৫০০ কোটি ডলারের মধ্যে ওঠানামা করে।

এই আলোচনার ভিত্তিতে চার ধরনের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়। বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতে আমাদের ধারণা, হুন্ডির মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিরা বছরে গড়ে প্রায় ২,০০০ কোটি ডলার সমপরিমাণ টাকা পাঠান। তবে এই অর্থের পরিমাণ সর্বনিম্ন ১,৭০০ কোটি থেকে সর্বোচ্চ ২,৩৬০ কোটি ডলারও হতে পারে। অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে বাইরে যায় বছরে গড়ে প্রায় ২,১০০ কোটি ডলার। তবে এই পরিমাণ ১,৮০০-২,৫০০ কোটি ডলারের মধ্যে ওঠানামা করতে পারে।

১। উল্লিখিত টাকার পরিমাণ থেকে বোঝা যায় যে, হুন্ডির মাধ্যমে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ তুলনামূলক কম। এখানে বলে রাখা ভালো যে আমদানি করা মূলধনী পণ্যের ওভার ইনভয়েসিং করাও টাকা পাচারের বড় একটি মাধ্যম, তবে সেক্ষেত্রে হুন্ডি খুব একটা ব্যবহৃত হয় না। তবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী, আইনজীবী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও সরকারি কর্মকর্তাসহ সচ্ছল বাংলাদেশিদের একটা বড় অংশই হুন্ডির মাধ্যমে অর্থপাচার করে থাকেন। এই পাচার করা অর্থের পরিমাণ বছরে ৬০ কোটি থেকে ১০০ কোটি ডলার। অর্থাৎ ধরে নেওয়া যায় ১৫ থেকে ২০ হাজার মানুষ প্রতি বছর ৫০,০০০ ডলার করে পাঠান।

২। করোনাভাইরাস মহামারির প্রাদুর্ভাবের ফলে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের তুলনায় ২০১৯-২০ অর্থবছরে ঋণপত্রের হিসেবে আমদানি ব্যয় কমেছে ৫৩০ কোটি ডলার। এ সময় বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে ১৮০ কোটি ডলার। আমদানি ব্যয় কমার কারণে আন্ডার ইনভয়েসিং হ্রাস পেয়েছে, হ্রাস পেয়েছে হুন্ডির চাহিদাও। ফলে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরেও আমদানি ছিল ২০১৮-১৯ অর্থবছরের তুলনায় ২৭০ কোটি ডলার কম। একই বছর বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে ৭৬০ কোটি ডলার। আমদানি কমে যাওয়ার সঙ্গে রেমিট্যান্সের ঊর্ধ্বগতির আপাতভাবে কোনো সম্পর্ক নেই। তবে এই পরিবর্তন দিয়ে হুন্ডির মাধ্যমে অর্থপাচার  হ্রাসের বিষয়টি বোঝা যায়। সম্ভবত করোনাকালীন বিধি-নিষেধের কারণে আমদানি কমার কারণে হুন্ডি নেটওয়ার্কগুলোর জন্য কাজ করা কঠিন হয়ে গিয়েছিল। হুন্ডি ব্যবস্থার এই দুর্বলতার জন্যে রেমিট্যান্স খাতে ব্যাংকিং ব্যবস্থা শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এছাড়া, করোনাকালে দেশের সাধারণ মানুষের আর্থিক অবস্থা নাজুক হয়ে গিয়েছিল, যে কারণে হয়তো বিদেশে থাকা তাদের স্বজনরা রেমিট্যান্স পাঠানো বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। অর্থাৎ অর্থনীতির বিচারে ২০২০-২১ অর্থবছর ছিল একটি অস্বাভাবিক সময়।

৩। ব্যালেন্স অফ পেমেন্টের সামগ্রিক চিত্রের ওপর হুন্ডির প্রভাব অবশ্যম্ভাবী। আমদানি ব্যয় ও রেমিট্যান্সের অনানুষ্ঠানিক পরিমাণও মোট হিসেবে যুক্ত করা গেলে তা চলতি হিসেবে খুব একটা পরিবর্তন আনবে না এবং ব্যালেন্স  অফ পেমেন্টের একই রকম অবস্থা থাকবে। তবে অনানুষ্ঠানিক হিসেব যোগ করলে আমদানি ব্যয় যথেষ্ট বৃদ্ধি পাবে। তাতে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ বেড়ে যাবে। প্রবাসীদের দেশে পাঠানো টাকার একটি অংশ তাদের পরিবারের দৈনন্দিন খাওয়া-পরা, শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদি খাতে ব্যয় হয়, একটি অংশ বিভিন্নভাবে জমা করা হয়, এবং আরেকটি অংশ জমিয়ে তা কোনো সম্পদ কিনতে ব্যয় করা হয় (জমি কেনা বা বাড়ি তৈরি)। দৈনন্দিন ব্যয় ও বিনিয়োগ খাতে বাংলাদেশ ব্যুরো অফ স্ট্যাটিস্টিকসের (বিবিএস) দেওয়া হিসেবকে সঠিক ধরে নিলে অতিরিক্ত আমদানি ব্যয় সরাসরি জিডিপির অংককে কমিয়ে দেবে। যেমন, এই হিসেব ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জিডিপিকে ৩% কমিয়ে দেবে। অবশ্য জিডিপি কমে যাওয়ার মানে প্রবৃদ্ধির হার কমে যাওয়া নয়। কারণ তাতে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জিডিপিও কমে যাবে। কারণ সে সময় আমদানিকৃত বহু পণ্যকে দেশজ উৎপাদন হিসেবে ধরা হয়েছিল।

৪। আমাদের ধারণা, ২০২১-২২ অর্থবছর ও ২০২২-২৩ অর্থবছরের রেমিট্যান্স প্রবাহ উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাবে। কারণ পুনরায় আমদানি বৃদ্ধি পাওয়ায় আন্ডার ইনভয়েসিংও বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দিন শেষে হুন্ডি ব্যবস্থাকে আগের মতো গতিশীল করেছে। ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে বৈধ চ্যানেলে আসা রেমিট্যান্সের পরিমাণ আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৩০০ কোটি ডলার কম ছিল। আমদানির পরিমাণ বৃদ্ধি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও টাকার মান কমে যাওয়ার ফলে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাবে; সেইসঙ্গে আন্ডার ইনভয়েসিংও বৃদ্ধি পাবে।


বাংলাদেশ ব্যাংক ফাইল ছবি/ঢাকা ট্রিবিউন


হুন্ডি ব্যবস্থা কি উপকারী?

এখানে একটি বিষয় ব্যাখ্যা করে বিচারের ভার পাঠকের হাতে ছেড়ে দিচ্ছি। বৈশ্বিক বাজার ব্যবস্থাপনার বিশাল একটি অংশ বিভিন্ন কারণে হুন্ডির ওপর নির্ভরশীল। হুন্ডির অবর্তমানে এই বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বাভাবিকভাবেই নমনীয়তা কমে যাবে। যেমন, ভারতে প্রচুর বাংলাদেশী যাওয়ায় এবং দুই দেশের মধ্যকার অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যের ফলে দুই দেশের বহু মানুষ নানাভাবে লাভবান হচ্ছেন।

হুন্ডি ব্যবস্থা না থাকলে দেশের তৈরি পোশাক শিল্পে ভারতীয় বিশেষজ্ঞদেরকে নিয়োগ দেওয়া ব্যয়বহুল হয়ে যাবে এবং কমে যাবে। তখন তাদের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা যুক্তি দেখাতে পারেন যে, দেশে উচ্চতর দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীর সংখ্যা হাতেগোনা বিধায় ভারতীয় বিশেষজ্ঞদেরকে নিয়োগ করা গোটা শিল্পের টিকে থাকার জন্যই জরুরি।

দেশের শুল্ক ব্যবস্থা শুধু অভ্যন্তরীণ বাজারের জন্যই উৎপাদন করতে উৎসাহিত করে এবং রপ্তানি শিল্পে বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করে। হুন্ডি ব্যবস্থায় খরচ শুল্কহারের তুলনায় কম হওয়ায় তা সরকারি বাণিজ্য নীতির তোয়াক্কা না করে উদ্যোক্তাদেরকে রপ্তানি বাণিজ্যে উৎসাহিত করতে পারে। কেউ যদি বিশ্বাস করেন যে দেশের দ্রুত অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জনের জন্য রপ্তানি ভিত্তিক বাণিজ্য জরুরি এবং রাজনৈতিকভাবে সরকারের রপ্তানি বিরোধী বাণিজ্য নীতি পরিবর্তন করা অসম্ভব, তাহলে তার উচিৎ হুন্ডি ব্যবস্থাকে রপ্তানি ভিত্তিক প্রবৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে মেনে নেওয়া। হুন্ডি ব্যবস্থার আশ্রয় নিয়ে বেশ খানিকটা শুল্ক ফাঁকি দেওয়ার আরেকটা সুবিধা হলো, এর মাধ্যমে আমদানি করা পণ্যের দাম বৈধভাবে আমদানিকৃত পণ্যের দামের চেয়ে কম হয়। ফলে তৃণমূল পর্যায়ের ভোক্তারাও কম দামে পণ্য কিনতে পারেন। এতে তাদেরও উপকার হয়। তবে হুন্ডি ব্যবস্থা সরকারের রাজস্ব আয় ব্যাপকভাবে (জিডিপির ০.৭৫-১.০% পর্যন্ত) কমিয়ে দেয়।

এবার পাঠক দুটি ফলাফলের তুলনামূলক বিচার করে দেখতে পারেন। এক, হুন্ডি ব্যবস্থাকে সংকুচিত করার ফলে সরকারি ব্যয় ও দ্রব্যমূল্য– দুটোই বৃদ্ধি পাবে। দুই, হুন্ডি ব্যবস্থাকে আরও বড় হওয়ার সুযোগ দেওয়ার ফলে সরকারি ব্যয় ও দ্রব্যমূল্য– দুটোই কমে যাবে।

সরাসরি পাচার: উপরে বলেছিলাম যে হুন্ডির মাধ্যমে সরাসরি পাচার হওয়া টাকার পরিমাণ খুবই নগণ্য (বছরে ৬০-১০০ কোটি ডলার)। কারণ সরাসরি অর্থপাচার না করলেও হুন্ডি ব্যবস্থার চাহিদা ও যোগান দুটোই ভারসাম্যাবস্থায় থাকে।

এবার চলুন অর্থ পাচারের বিভিন্ন উপায় নিয়ে কথা বলা যাক।

১। প্রতারণা: ধরা যাক, বাংলাদেশের একটি কোম্পানি বিদেশের একটি কোম্পানির কাছ থেকে কোনো পণ্য আমদানি করবে এই মর্মে এলসি বা ঋণপত্র খোলা হলো। কিন্তু বাস্তবে এই দুটো কোম্পানির কোনটিরই অস্তিত্ব নেই। ব্যাংক ঋণপত্র অনুযায়ী বিদেশের সেই ভুয়া কোম্পানিকে টাকা পাঠিয়ে দিলে প্রতারক আমদানিকারক বড় অংকের ঋণের বোঝা ব্যাংকের ঘাড়ে চাপিয়ে লাপাত্তা হয়ে যায়। স্বস্তির বিষয় হলো, এ ধরনের প্রতারণার সংখ্যা এখনো যথেষ্ট কম।

২। মূলধনী পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেখানো বা ওভার ইনভয়েসিং: বহু মূলধনী পণ্যের ওপর কোনো আমদানি শুল্ক নেই। থাকলেও তা নামমাত্র। এছাড়া মূলধনী পণ্য অনেক বেশি পরিমাণে আসে না তাই তার প্রকৃত দাম নিরূপণ করা কাস্টমসের পক্ষে প্রায়ই সম্ভব হয় না। সে কারণে আমদানি করা মূলধনী পণ্যের ইনভয়েসে অতিরিক্ত দাম দেখানোর পরও কাস্টমস খুব একটা সন্দেহ করে না। অবশ্য সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিবছর ৫০০ কোটি মূলধনী পণ্য আমদানি করার সীমা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রকৃত দামের তুলনায় গড়ে ২৫% ওভার ইনভয়েসিং উচ্চ সীমা বলে ধরে নেওয়া যায়। সেই হিসেবে এইভাবে অর্থ পাচারের পরিমাণ ১২৫ কোটি ডলারের বেশি নয়।

৩। তৈরি পোশাক রপ্তানিতে আন্ডার ইনভয়েসিং: ধরা যাক, বাংলাদেশের একটি পোশাক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে “ক” নামে তাদের একটি শাখা স্থাপন করলো। যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক ক্রেতা প্রয়োজনীয় অর্ডারের জন্য ক-এর সঙ্গে চুক্তি করলো। অর্ডারের জন্য “ক” বাংলাদেশী একটি পোশাক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করলো। এই উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান আসলে “ক”-এরই মূল প্রতিষ্ঠান। তবে এই “ক” তার মূল প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যে দামে চুক্তি করেছে, তা যুক্তরাষ্ট্রের মূল ক্রেতার সঙ্গে চুক্তি করা দামের চেয়ে কম। এই চুক্তির আমদানি-রপ্তানি ও যাবতীয় লেনদেন শেষে দেখা গেলো যে একটি নির্দিষ্ট অংকের অর্থ “ক”-এর অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছে। অর্থাৎ উৎপাদনকারী মূল প্রতিষ্ঠান তার আয়ের একটা অংশ কৌশলে যুক্তরাষ্ট্রে জমা করেছে। অবশ্য দেশের বেশিরভাগ পোশাক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশ অত্যন্ত সীমিত হওয়ায় অর্থ পাচারের এই পদ্ধতি খুব একটা কার্যকর না। তবে এই পদ্ধতির ব্যাপক ব্যবহার খুবই দ্রুত দেশের তৈরি পোশাক শিল্পে ধস নামাতে পারে।

সংক্ষেপে এই চারটি মাধ্যম ও পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ সাজালে দেখা যায়-

১। সরাসরি হুন্ডির মাধ্যমে অর্থপাচার বছরে ৬০ থেকে ১০০ কোটি ডলার।

২। মূলধনী পণ্যের ওভার ইনভয়েসিংয়ের পরিমাণ বছরে ১২৫ কোটি ডলার।

৩। দুটি ভুয়া কোম্পানির মধ্যে লেনদেন দেখিয়ে অর্থপাচার করা। মোট পাচারকৃত অর্থের তুলনায় এই মাধ্যমে পাচার করা অর্থের পরিমাণ যথেষ্ট কম বলেই আমাদের বিশ্বাস।

৪। তৈরি পোশাক রপ্তানিতে আন্ডার ইনভয়েসিং। এই মাধ্যমে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণও সীমিত।

অর্থাৎ সব মিলিয়ে পাচার করা অর্থের পরিমাণ সম্ভবত বছরে ২০০ থেকে ৩০০ কোটির বেশি নয়।

অর্থপাচার রোধে করণীয়

১। আমদানি করা মূলধনী পণ্যের চালান আসার আগেই পিএসআই সংস্থাগুলোর মাধ্যমে সেসব পণ্যের প্রকৃত দাম সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া।

২। ইনভয়েসে উল্লিখিত বিদেশী ক্রেতার ব্যাপারে নিশ্চিত হতে বিজিএমইএর কাছ থেকে সেই ক্রেতার ব্যাপারে প্রত্যয়নপত্র নেওয়া এবং নির্ভরযোগ্য ডাটাবেজের সঙ্গে রপ্তানি করা পণ্যের দাম মিলিয়ে যাচাই করে নেওয়া। এছাড়া পিএসআই সংস্থাগুলোরও ক্রেতা প্রতিষ্ঠানকে যাচাই করার সক্ষমতা রয়েছে।

তবে বাস্তবতা হলো ৫০ হাজার কোটি ডলারের অর্থনীতি থেকে বছরে ০.৫% বা ২৫০ কোটি ডলার পাচার ঠেকানো বেশ কঠিন কাজই বটে।


ফরেস্ট কুকসন একজন অর্থনীতিবিদ যিনি বাংলাদেশ আমেরিকান চেম্বার অব কমার্সের (AmCham) প্রথম সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছেন।


মূল লেখা:

Remittances, hundi market, and capital flight

Explaining the significance of the hundi market

About

Popular Links